শেখ রিফান আহমেদ : বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে প্রকৃতির পালাবদল আর ঋতুভিত্তিক ফল উৎসব। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের পর জ্যৈষ্ঠের হাত ধরে যে ‘মধুমাস’-এর সূচনা হয়েছিল, আষাঢ় পেরিয়ে জুলাইয়ের এই প্রারম্ভে এসে তার আনুষ্ঠানিক সমাপন ঘটে। তবে মধুমাস শেষ হলেও প্রকৃতি আমাদের জন্য রেখে যায় পুষ্টির এক বিপুল সমাহার। ০১ জুলাই জাতীয় ফল দিবস। দেশীয় ফলের স্বাদ, বৈচিত্র্য এবং অনন্য পুষ্টিগুণকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং ফলদ বৃক্ষ রোপণে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে এই দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম।
আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, লটকনÑএসব ফলের নাম শুনলেই জিভে জল আসে না, এমন বাঙালি মেলা ভার। জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ়ের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে লিচু বা তরমুজের মতো কিছু ফল বাজার থেকে বিদায় নিলেও, জুলাইয়ের এই সময়ে আম ও কাঁঠালের রসালো স্বাদ পূর্ণতা পায়। সেই সঙ্গে বাজারে দেখা মেলে লটকন, তালশাঁস, পেয়ারা, জামরুল, আমড়াসহ হরেক রকমের পুষ্টিকর দেশীয় ফলের। কৃত্রিম বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের চেয়ে প্রকৃতির এই দান অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত ও খাঁটি।
আমাদের দেশীয় ফলগুলো শুধু স্বাদেই অতুলনীয় নয়, বরং ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের এক অভাবনীয় উৎস। আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল কেবল পুষ্টির দিক থেকেই সমৃদ্ধ নয়, এর প্রতিটি অংশই মানবদেহের জন্য উপকারী। কাঁঠালের উচ্চ আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং এর ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অন্যদিকে, ফলের রাজা আম-এ রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, যা চোখের জ্যোতি বাড়াতে সাহায্য করে। লটকন ও আমড়ার টক-মিষ্টি স্বাদ আমাদের শরীরে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি পূরণ করে এবং বর্ষাকালীন সর্দি-কাশি থেকে রক্ষা করে। জামের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। বিদেশি ফলের চটকদার বিজ্ঞাপনের ভিড়ে আমাদের অবহেলিত এই দেশীয় ফলগুলোই আসলে স্বাস্থ্যের আসল সুরক্ষাকবচ।
বাংলাদেশ এখন ফল উৎপাদনে বিশ্বে এক উদীয়মান নাম। কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় এবং আম উৎপাদনে সপ্তম স্থানে রয়েছে আমাদের দেশ। ফল চাষ এখন কেবল পারিবারিক চাহিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার এক বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শিক্ষিত তরুণ সমাজ এখন বাণিজ্যিকভাবে আম, ড্রাগন ফল, লটকন ও পেয়ারা চাষে ঝুঁকছেন, যা দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে বড় ভূমিকা রাখছে। জাতীয় ফল দিবস উদযাপনের মাধ্যমে যদি আমরা দেশীয় ফলের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক করতে পারি, তবে পুষ্টি নিরাপত্তার পাশাপাশি রপ্তানি আয়ের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
জাতীয় ফল দিবসের মূল চেতনা কেবল ফল খাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ফলদ বৃক্ষের চারা রোপণ করাও এর অন্যতম বড় লক্ষ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে ছাদ-বাগান, বাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশে বা পতিত জমিতে দেশীয় ফলের গাছ লাগালে তা একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে, অন্যদিকে আমাদের পুষ্টির চাহিদাও মেটাবে।
দেশীয় ফল আমাদের সংস্কৃতির অংশ, আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক। মধুমাসের এই সমাপনে দাঁড়িয়ে আমাদের অঙ্গীকার হোকÑবিদেশি ও রাসায়নিকযুক্ত ফলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ দেশীয় ফলকে আপন করে নেওয়া। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিটি ঘরে ঘরে ফলের বার্তা পৌঁছে যাক। রসালো, সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর ফলের জয়গানে সফল হোক জাতীয় ফল দিবস ২০২৬!
প্রধান কার্যালয়: ৫০/এফ, ইনার সার্কুলার (ভিআইপি) রোড, নয়াপল্টন, পল্টন মডেল থানা, ঢাকা-১০০০।
হটলাইন: 09643-230220, মুঠোফোন: 01915-708187, মেইল: info.nagorikvabna@gmail.com
@Copyright & reserved by NAGORIK BHABNA