কুমিল্লা বিভাগ ঘোষণার জন্য দাবি জানাতে হবে- এটাই তো লজ্জার

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৮:৫৯:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫
- / ৪৪৪ বার পঠিত

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন:
বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ইতিহাসে একটি নাম বারবার উঠে আসে কুমিল্লা। শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, অর্থনীতিতে, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও এই অঞ্চলের অবদান অপরিসীম। অথচ আজও কুমিল্লাকে বিভাগ ঘোষণার দাবিতে পথে নামতে হয়, মানববন্ধন করতে হয়, মিছিল-মিটিং করতে হয়! এ যেন এক অপ্রত্যাশিত লজ্জা, জাতির আত্মমর্যাদায় আঘাতের মতোই।
কুমিল্লা প্রাচীন সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল। ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী থেকে শুরু করে লালমাই-ময়নামতি, শালবন বৌদ্ধবিহার, কোটবাড়ির প্রত্ননগরী, নবাব ফয়জুন্নেছা, কাজী নজরুল ইসলামের পদচিহ্ন- সব মিলিয়ে কুমিল্লা বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার ধারক ও বাহক। এখান থেকেই বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার উন্নয়ন মডেলের সূচনা হয়েছিল “কুমিল্লা মডেল” নামে, যা পরবর্তীতে সারাদেশে দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন ঐতিহ্যবাহী জনপদ আজও জেলা পর্যায়ে আটকে আছে- এটা কেবল প্রশাসনিক নয়, মানসিক বঞ্চনাও।
কুমিল্লা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মধ্যবর্তী অবস্থানে থেকে এটি দেশের শিল্প ও
বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর অন্যতম সংযোগস্থল। কুমিল্লায় অবস্থিত ইপিজেড, হাইটেক পার্ক, গ্যাসফিল্ড, সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র, শিল্পকারখানা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক- সবই প্রমাণ করে এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা ও বিভাগীয় মর্যাদার অভাবে এখানকার উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর- এই ছয় জেলার ভৌগোলিক অবস্থান একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী এই অঞ্চলটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বহু বছর ধরে বিকশিত হয়েছে। বর্তমানে এই ছয়টি জেলায় ২ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের আবাসস্থল, যা দেশের অনেক বিদ্যমান বিভাগের চেয়েও জনবহুল। এই অঞ্চলের জনগণের প্রশাসনিক সেবা পেতে চট্টগ্রাম বা ঢাকায় ছুটে যেতে হয়, যা সময়, অর্থ ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি স্বতন্ত্র “কুমিল্লা বিভাগ” গঠিত হলে এই সমস্যা অনেকাংশে নিরসন হবে এবং উন্নয়ন হবে দ্রুততর ও ন্যায্য। এদিকে বৃহত্তর নোয়াখালীর তিনটি জেলা- নোয়াখালী, লক্ষীপুর ও ফেনী যদি প্রস্তাবিত কুমিল্লা বিভাগে না আসে, তবুও কুমিল্লা বিভাগ ঘোষণা করতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর- এই তিনটি জেলা নিয়েই “কুমিল্লা বিভাগ” ঘোষণা করা যায়। এই তিন জেলার সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষাধিক, যা ইতিমধ্যে ঘোষিত অনেক বিভাগের চেয়েও বেশি। জনসংখ্যার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন ও অবকাঠামোগত দিক থেকেও কুমিল্লা আলাদা বিভাগ হিসেবে গড়ে ওঠার সম্পূর্ণ যোগ্যতা রাখে।
বিভাগ মানে শুধু মানচিত্রে নতুন দাগ টানা নয়; বিভাগ মানে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উন্নয়নের ত্বরান্বিত ধারা, জনগণের সেবাপ্রাপ্তির সহজলভ্যতা। কুমিল্লার মানুষ সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শুধুমাত্র ঘোষণার অভাবে। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই কুমিল্লা বিভাগ গঠনের বিষয়টি আলোচনায় আছে- কখনও বাস্তবায়নের আশ্বাস, কখনও শুধু প্রতিশ্রুতির ফাঁকা বুলি।
একটি নতুন বিভাগ গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া। কুমিল্লা বিভাগের দাবি কোনো আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা নয়, এটি প্রশাসনিক বাস্তবতা ও ন্যায্যতার প্রতিফলন। যে অঞ্চলের মানুষ দেশের অর্থনীতিতে, সংস্কৃতিতে ও মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রেখেছে, তাদের আজও নিজেদের ন্যায্য দাবি তুলতে হয়- এটাই তো লজ্জাজনক!
সরকারের উচিত, এই দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে কুমিল্লাকে পূর্ণাঙ্গ বিভাগ ঘোষণা করা। কারণ সময় এসেছে সরকারকে প্রতিশ্রুতির চৌহদ্দি পেরিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার। আর অপেক্ষা নয়- কুমিল্লা বিভাগ এখন সময়ের দাবি, জনগণের
দাবি, ন্যায্য দাবি।




















