ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তাজা খবর
জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার তেল শোধনাগারে ভয়াবহ আগুন
ফুয়েল পাস নিতে নিবন্ধনের নিয়ম
গ্রামীণ আবহ আর কারুপণ্যের সম্ভার নিয়ে চলছে বৈশাখী মেলা
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে মারা গেছেন
বরেণ্য গীতিকবি,সুরকার,লেখক ও সংগীত গুরু ইউনুস আলী মোল্লার
স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে মাদারীপুরে ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ
গণধর্ষেণের শিকার ৬-বছরের শিশু ও ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী: গ্রেফতার-১
জাল টাকার কারখানায় অভিযান, আটক-১
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম
ক্রুশের বেদনা পেরিয়ে পুনরুত্থানের আলো
ইস্টার সানডে ও মানবতার নবজাগরণের চিরন্তন বার্তা

জেমস আব্দুর রহিম রানা
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:১৫:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
- / ৬৬ বার পঠিত

।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।। মানব সভ্যতার ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যা কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধ উৎসব নয়। বরং এই দিনগুলো মানবতার নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোকে গভীরভাবে উজ্জীবিত করে। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য ইস্টার সানডে বা পবিত্র রবিবার এমনই একটি দিন। এটি কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি একটি চিরন্তন প্রতীক, যা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনের বিজয়কে চিত্রিত করে এবং মানুষকে আশা, মানবিকতা ও পুনর্জাগরণের পথে অনুপ্রাণিত করে।
ইস্টারের মূল বার্তা স্মরণ করায় যীশু খ্রিস্টের পুনরুত্থানের ঘটনা, যা খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের বিজয়ের প্রতীক। তবে ইস্টারের তাৎপর্য শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের জন্য এক গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা, যা ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ক্ষমা, আত্মত্যাগ এবং ন্যায়বিচারের গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে। পবিত্র বাইবেল এবং পবিত্র কোরআনের আলোচনায় আমরা দেখতে পাই, যীশু খ্রিষ্ট বা ঈসা (আ.) মানবতার জন্য নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।
খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, যীশু খ্রিস্ট মানবজাতির পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন। তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, যা মানব ইতিহাসে আত্মত্যাগের গভীর প্রতীক। তবে খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের আসল শক্তি নিহিত রয়েছে তাঁর পুনরুত্থানে, যা মৃত্যুকে পরাজিত করে জীবনের চিরন্তন বিজয়কে প্রতিফলিত করে।
পবিত্র বাইবেলের নতুন নিয়মে বলা হয়েছে— “তিনি এখানে নেই; তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন, যেমন তিনি বলেছিলেন।” (মথি ২৮:৬)
এই পুনরুত্থানের ঘোষণা খ্রিস্টানদের কাছে মৃত্যুর পর জীবনের বিজয়ের এক চিরন্তন প্রমাণ। যোহন ১১:২৫-এ বলা হয়েছে— “আমি পুনরুত্থান ও জীবন। যে আমার ওপর বিশ্বাস করে, সে যদি মৃত্যুবরণও করে তবু সে বেঁচে থাকবে।”
এখানে পুনরুত্থানকে কেবল শারীরিক জীবনের প্রত্যাবর্তন হিসেবে নয়, বরং আত্মিক পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলা আদর্শ কখনো মুছে যায় না; বরং তা যুগে যুগে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
ইস্টারের শিক্ষা মূলত ভালোবাসা, ক্ষমা এবং আত্মত্যাগ। যীশু খ্রিস্ট তাঁর জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে দেখিয়েছেন কীভাবে প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসতে হয় এবং কীভাবে ঘৃণার পরিবর্তে ক্ষমার পথ বেছে নিতে হয়। পবিত্র বাইবেলে লেখা আছে— “তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো।” (মার্ক ১২:৩১)
এই শিক্ষার মধ্যেই মানব সমাজে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তি নিহিত রয়েছে। ইস্টারের পুনরুত্থান শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে, মানুষকে নিজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিভার সঙ্গে যুক্ত করে।
ইসলাম ধর্মেও ঈসা (আ.) অত্যন্ত সম্মানিত নবী। পবিত্র কোরআনে তাঁর জন্ম, নবুয়ত এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের কথা বহু স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আন-নিসা ৪:১৭১-এ বলা হয়েছে— “নিশ্চয়ই মারইয়ামের পুত্র ঈসা আল্লাহর একজন রাসূল।”
এছাড়াও সূরা মারইয়াম ১৯:৩০-এ উল্লেখ আছে— “তিনি বললেন: আমি তো আল্লাহর বান্দা; তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন।”
যদিও ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে— “তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধও করেনি; বরং বিষয়টি তাদের কাছে তেমনই মনে হয়েছিল।” (সূরা আন-নিসা ৪:১৫৭)
এই ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও একটি বিষয় স্পষ্ট—যীশু বা ঈসা মানবতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তাঁদের জীবন ও শিক্ষা মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, ভালোবাসা এবং মানবিকতার বোধ জাগিয়ে তোলে।
পবিত্র কোরআনেও ন্যায়বিচার এবং সত্য উদঘাটনের গুরুত্বের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। একটি আয়াতে বলা হয়েছে— “আর স্মরণ কর, যখন তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে এবং এ বিষয়ে একে অপরের ওপর দোষারোপ করছিলে; কিন্তু তোমরা যা গোপন করছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দেন।” (সূরা আল-বাকারা ২:৭২)
এটি মানুষকে শেখায় যে কোনো অন্যায় চিরদিন গোপন থাকে না। সত্য প্রকাশিত হয় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ইস্টারের পুনরুত্থানের গল্পের সঙ্গে এই শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যীশু খ্রিস্টের জীবন, আত্মত্যাগ এবং পুনরুত্থান মানুষকে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে চলার প্রেরণা দেয়।
আজকের বিশ্বে, যেখানে সহিংসতা, বৈষম্য, নৈতিক সংকট এবং বিভাজন ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে ইস্টারের বার্তা নতুনভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি মানুষকে স্মরণ করায় যে অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, আলোর সম্ভাবনা কখনো শেষ হয় না।
বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় দেশে, যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্য রচনা করেছে, ইস্টার কেবল খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উৎসব নয়। এটি ধর্মীয় সহনশীলতা, সামাজিক ঐক্য এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছার প্রতীক।
দেশের বিভিন্ন গির্জায় প্রার্থনা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং আনন্দঘন আয়োজনের মাধ্যমে এই দিনটি উদযাপিত হয়। খ্রিস্টান সম্প্রদায় নতুন পোশাক পরে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে। অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য ধর্মের মানুষও শুভেচ্ছা জানিয়ে অংশগ্রহণ করে। এই পারস্পরিক সম্মান ও মানবিকতা সমাজের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং একে একত্রিত রাখে।
তাই ইস্টার কেবল একটি ধর্মীয় স্মরণ দিবস নয়; এটি মানবতার গভীর আধ্যাত্মিক প্রতীক। এটি শেখায় যে মৃত্যু বা হতাশা কখনো শেষ কথা নয়। প্রতিটি সমাপ্তির মধ্যেই নতুন সূচনার সম্ভাবনা নিহিত থাকে। যীশু খ্রিস্টের পুনরুত্থানের বার্তা মানুষকে অনুপ্রাণিত করে—হতাশার ভেতরেও আশা খুঁজে নিতে, ঘৃণার ভেতরেও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত করতে এবং বিভাজনের ভেতরেও মানবতার পথকে শক্তিশালী করতে।
ইস্টারের প্রকৃত শিক্ষা এখানেই—জীবন শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, আর মানবতার আলো কখনো নিভে যায় না। এই বার্তা কেবল খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য নয়; এটি মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা। মানবিক দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা এবং আশা—এগুলোই আমাদের জীবনের ভিত্তি। ইস্টারের পুনরুত্থান সেই চিরন্তন আলো, যা প্রতিটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে জীবনের অন্ধকারে আলোর খোঁজ করতে, ক্ষতির ভেতরেও ভালোবাসার শক্তি স্থাপন করতে এবং বিভাজিত পৃথিবীতে মানবিকতার পথ দৃঢ় করতে।
ইস্টার আমাদের শেখায়, প্রতিটি সমাপ্তির মধ্যে নতুন সূচনা নিহিত, প্রতিটি হতাশার ভেতরেও আশা জাগে, আর প্রতিটি অন্ধকার মুহূর্তের মধ্যেও আলোর সম্ভাবনা কখনো নিভে যায় না। এই শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানবতার পথ চলা অব্যাহত থাকে।
লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা
(খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ববিদ, সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট)
আরও পড়ুন:
জেমস আব্দুর রহিম রানা




















