ঢাকা, বাংলাদেশ। , শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

বিজয়ের আবাহনে ফুলের রাজ্য

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ১০:৫৬:২৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ২৩ বার পঠিত

শীতের কুয়াশা ভেদ করে রঙ, সৌরভ আর স্বপ্নে জেগে ওঠা বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী।

যশোরের ঝিকরগাছার গদখালী—বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী নামে পরিচিত এই জনপদ শীতের ভোরেই তার আলাদা পরিচয় ঘোষণা করে দেয়। কুয়াশার সাদা আবরণ যখন ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করে, তখনই চোখে পড়ে রঙের বিস্ফোরণ, নাকে আসে মিষ্টি সৌরভ আর কানে ভেসে আসে মানুষের কর্মব্যস্ততার শব্দ। সামনে মহান বিজয় দিবস। জাতীয় গৌরবের এই সময়টাকে ঘিরে গদখালীর ফুলের বাজারে বইছে এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য। এটি শুধু ফুল কেনাবেচার গল্প নয়, বরং মাটি আর মানুষের দীর্ঘদিনের সাধনা, সংগ্রাম ও স্বপ্নের এক জীবন্ত দলিল।

কাকডাকা ভোর থেকেই যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের দু’পাশে জমে ওঠে ফুলের হাট। শীতের কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে ফুলচাষিরা বাইসাইকেল, ভ্যান কিংবা মোটরসাইকেলের পেছনে বোঝাই করে নিয়ে আসেন টাটকা গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস, রজনীগন্ধা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া ও নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফুল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের হাঁকডাক, দর কষাকষি আর ফুলের তীব্র সুবাসে বাতাস হয়ে ওঠে ভারী। এই দৃশ্য কেবল একটি বাজারের নয়, বরং দেশের প্রতিটি জাতীয় দিবস, সামাজিক অনুষ্ঠান ও উৎসবকে ঘিরে ফুল সরবরাহের এক বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রতিচ্ছবি।

বিজয় দিবস ঘিরে গদখালীর এই ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানমঞ্চ, স্কুল-কলেজের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি—সবখানেই প্রয়োজন ফুল। আর সেই ফুলের বড় অংশই আসে এই গদখালী থেকে। লাল-সবুজের পতাকার সঙ্গে এখানকার গোলাপ, গাঁদা আর গ্ল্যাডিওলাসের রঙ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। জাতীয় গর্বের দিনে ফুলের মাধ্যমে নিজেদের শ্রম আর ভালোবাসা দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিতে পেরে গদখালীর চাষিরাও গর্ববোধ করেন।
দীর্ঘ কয়েক বছর লোকসান, বাজারের অনিশ্চয়তা আর উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সামলাতে হয়েছে এই অঞ্চলের ফুলচাষিদের। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো শীতের তীব্রতা, কখনো রোগবালাই—প্রতিটি মৌসুমেই ছিল নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে চলতি মৌসুমের শুরুতেই তারা দেখতে পাচ্ছেন আশার আলো। ফুলের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও তুলনামূলক ভালো যাচ্ছে। এতে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন এই অঞ্চলের পাঁচ হাজারের বেশি ফুলচাষি। অনেকের ভাষায়, গত বছরের তুলনায় এবছর বাজার অনেকটাই সন্তোষজনক। বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই চাহিদা যদি ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তবে আগের ক্ষতির বড় একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তবে এই উজ্জ্বল ছবির আড়ালেও রয়েছে বাস্তবতার কঠিন দিক। চাষিরা বলছেন, ফুলের দাম ভালো থাকলেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। সার, কীটনাশক, বীজ, সেচ আর শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি। তার ওপর আবহাওয়ার বিরূপতা ও নানা রোগবালাইয়ের কারণে অনেক ক্ষেতেই ফলন আশানুরূপ হয়নি। এক সময় যেখানে এক বিঘা জমি থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাপ বা গাঁদা পাওয়া যেত, সেখানে এখন সেই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ফলে বাজারে দাম কিছুটা বেশি পাওয়া গেলেও প্রকৃত লাভের অঙ্ক খুব বড় নয়—এমন বাস্তবতার কথাও উঠে আসে চাষিদের কণ্ঠে।
গদখালী শুধু একটি বাজার বা উৎপাদন কেন্দ্র নয়, এটি একটি বিস্তীর্ণ জনপদ। যশোর শহর থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার বিস্তৃত এলাকায় গড়ে উঠেছে এই ফুলের রাজ্য। এক সময়ের ধান ও সবজিনির্ভর কৃষিপ্রধান এই অঞ্চল আজ পুরোপুরি ফুলচাষ নির্ভর হয়ে উঠেছে। প্রায় চার হাজার বিঘা জমিতে সারাবছর ফুল চাষ করেন হাজার হাজার কৃষক পরিবার। এসব জমি থেকে প্রতিবছর উৎপাদিত হয় কয়েক কোটি টাকার ফুল, যা দেশের ফুলের বাজারের একটি বড় অংশের চাহিদা পূরণ করে।
গদখালীতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক জগৎ। রাস্তার দু’পাশে বিস্তৃত মাঠজুড়ে রঙিন ফুলের সমারোহ। লাল, হলুদ, সাদা, গোলাপি, বেগুনি আর নীল—প্রকৃতি যেন নিজের সব রঙ উজাড় করে দিয়েছে এই জনপদে। এখানে ফুল কোনো সৌখিন শখের বিষয় নয়, ফুলই জীবন ও জীবিকার প্রধান ভিত্তি। ধান বা অন্যান্য ফসলের বদলে ফুলই এখানকার মানুষের ভরসা।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় চাষিদের কর্মব্যস্ততা। কেউ ফুল কাটছেন, কেউ বাছাই করছেন, কেউ ডালি বাঁধছেন। মাঠে মাঠে দেখা যায় রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস, জারবেরা, জিপসি, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া সহ নানা জাতের ফুল। বাতাসে ভেসে বেড়ায় ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ, মৌমাছির গুঞ্জন আর প্রজাপতির উড়াউড়ি—সব মিলিয়ে এক মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা যে কাউকে মুগ্ধ করে।
এই সৌন্দর্যই গদখালীকে শুধু অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয়, বরং পর্যটন আকর্ষণেও পরিণত করেছে। যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক থেকে গদখালীর দিকে মোড় নিলেই চোখে পড়ে ফুলের স্বর্গরাজ্য। ভ্রমণপিপাসু মানুষ, শিক্ষার্থী, প্রকৃতিপ্রেমীরা প্রতিদিনই ভিড় করেন এই এলাকায়। কেউ ছবি তোলেন, কেউ ঘুরে ঘুরে ফুলের ক্ষেত দেখেন, কেউ আবার স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ফুল কিনে নেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও বাড়তি গতি আসে।
গদখালীর ফুল প্রতিদিন ভোর থেকে ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে চলে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে। জাতীয় দিবস, ধর্মীয় উৎসব, বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় আয়োজনে এখানকার ফুলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস এলেই এই অঞ্চলের বাজারে ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। শুধু বিজয় দিবস উপলক্ষেই কয়েক কোটি টাকার ফুল বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুরো মৌসুম মিলিয়ে এই অঞ্চলে কয়েকশ কোটি টাকার ফুলের লেনদেন হতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে।
ফুলচাষিদের এই যাত্রায় পাশে থাকার কথা জানাচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোগবালাই ও ছত্রাকজনিত সমস্যা মোকাবিলায় চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উন্নত জাতের চারা, আধুনিক চাষপদ্ধতি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তাদের আশা, বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে মৌসুমের শেষে গদখালীর চাষিরা শুধু আর্থিকভাবে লাভবানই হবেন না, বরং দেশের প্রতিটি উৎসব ও আনন্দের মুহূর্তে নিজেদের শ্রমের সুবাস আরও দৃঢ়ভাবে ছড়িয়ে দিতে পারবেন।
গদখালীর ফুলচাষিদের কাছে ফুল কেবল আয়ের উৎস নয়, এটি তাদের পরিচয়, গর্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। অনেক কৃষক ধান বা অন্যান্য ফসল ছেড়ে ফুল চাষে এসে স্বাবলম্বী হয়েছেন, বদলেছে তাদের জীবনমান। সন্তানদের লেখাপড়া, ঘরবাড়ি নির্মাণ, সামাজিক অবস্থান—সবকিছুতেই ফুলচাষের অবদান রয়েছে।
বিজয়ের আবহে গদখালীর এই ব্যস্ততা তাই কেবল অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি পরিশ্রমী মানুষের অধ্যবসায়, সংগ্রামের ভেতর থেকেও আশার আলো খুঁজে নেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শীতের কুয়াশা ভেদ করে ফুলে ফুলে সাজানো এই জনপদ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে বিজয়ের রঙ, সৌরভ আর ভালোবাসা—যা দেশের প্রতিটি কোণকে করে তুলছে আরও উজ্জ্বল, আরও বর্ণিল।
আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিজয়ের আবাহনে ফুলের রাজ্য

সর্বশেষ পরিমার্জন: ১০:৫৬:২৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

শীতের কুয়াশা ভেদ করে রঙ, সৌরভ আর স্বপ্নে জেগে ওঠা বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী।

যশোরের ঝিকরগাছার গদখালী—বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী নামে পরিচিত এই জনপদ শীতের ভোরেই তার আলাদা পরিচয় ঘোষণা করে দেয়। কুয়াশার সাদা আবরণ যখন ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করে, তখনই চোখে পড়ে রঙের বিস্ফোরণ, নাকে আসে মিষ্টি সৌরভ আর কানে ভেসে আসে মানুষের কর্মব্যস্ততার শব্দ। সামনে মহান বিজয় দিবস। জাতীয় গৌরবের এই সময়টাকে ঘিরে গদখালীর ফুলের বাজারে বইছে এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য। এটি শুধু ফুল কেনাবেচার গল্প নয়, বরং মাটি আর মানুষের দীর্ঘদিনের সাধনা, সংগ্রাম ও স্বপ্নের এক জীবন্ত দলিল।

কাকডাকা ভোর থেকেই যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের দু’পাশে জমে ওঠে ফুলের হাট। শীতের কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে ফুলচাষিরা বাইসাইকেল, ভ্যান কিংবা মোটরসাইকেলের পেছনে বোঝাই করে নিয়ে আসেন টাটকা গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস, রজনীগন্ধা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া ও নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফুল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের হাঁকডাক, দর কষাকষি আর ফুলের তীব্র সুবাসে বাতাস হয়ে ওঠে ভারী। এই দৃশ্য কেবল একটি বাজারের নয়, বরং দেশের প্রতিটি জাতীয় দিবস, সামাজিক অনুষ্ঠান ও উৎসবকে ঘিরে ফুল সরবরাহের এক বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রতিচ্ছবি।

বিজয় দিবস ঘিরে গদখালীর এই ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানমঞ্চ, স্কুল-কলেজের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি—সবখানেই প্রয়োজন ফুল। আর সেই ফুলের বড় অংশই আসে এই গদখালী থেকে। লাল-সবুজের পতাকার সঙ্গে এখানকার গোলাপ, গাঁদা আর গ্ল্যাডিওলাসের রঙ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। জাতীয় গর্বের দিনে ফুলের মাধ্যমে নিজেদের শ্রম আর ভালোবাসা দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিতে পেরে গদখালীর চাষিরাও গর্ববোধ করেন।
দীর্ঘ কয়েক বছর লোকসান, বাজারের অনিশ্চয়তা আর উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সামলাতে হয়েছে এই অঞ্চলের ফুলচাষিদের। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো শীতের তীব্রতা, কখনো রোগবালাই—প্রতিটি মৌসুমেই ছিল নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে চলতি মৌসুমের শুরুতেই তারা দেখতে পাচ্ছেন আশার আলো। ফুলের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও তুলনামূলক ভালো যাচ্ছে। এতে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন এই অঞ্চলের পাঁচ হাজারের বেশি ফুলচাষি। অনেকের ভাষায়, গত বছরের তুলনায় এবছর বাজার অনেকটাই সন্তোষজনক। বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই চাহিদা যদি ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তবে আগের ক্ষতির বড় একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তবে এই উজ্জ্বল ছবির আড়ালেও রয়েছে বাস্তবতার কঠিন দিক। চাষিরা বলছেন, ফুলের দাম ভালো থাকলেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। সার, কীটনাশক, বীজ, সেচ আর শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি। তার ওপর আবহাওয়ার বিরূপতা ও নানা রোগবালাইয়ের কারণে অনেক ক্ষেতেই ফলন আশানুরূপ হয়নি। এক সময় যেখানে এক বিঘা জমি থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাপ বা গাঁদা পাওয়া যেত, সেখানে এখন সেই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ফলে বাজারে দাম কিছুটা বেশি পাওয়া গেলেও প্রকৃত লাভের অঙ্ক খুব বড় নয়—এমন বাস্তবতার কথাও উঠে আসে চাষিদের কণ্ঠে।
গদখালী শুধু একটি বাজার বা উৎপাদন কেন্দ্র নয়, এটি একটি বিস্তীর্ণ জনপদ। যশোর শহর থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার বিস্তৃত এলাকায় গড়ে উঠেছে এই ফুলের রাজ্য। এক সময়ের ধান ও সবজিনির্ভর কৃষিপ্রধান এই অঞ্চল আজ পুরোপুরি ফুলচাষ নির্ভর হয়ে উঠেছে। প্রায় চার হাজার বিঘা জমিতে সারাবছর ফুল চাষ করেন হাজার হাজার কৃষক পরিবার। এসব জমি থেকে প্রতিবছর উৎপাদিত হয় কয়েক কোটি টাকার ফুল, যা দেশের ফুলের বাজারের একটি বড় অংশের চাহিদা পূরণ করে।
গদখালীতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক জগৎ। রাস্তার দু’পাশে বিস্তৃত মাঠজুড়ে রঙিন ফুলের সমারোহ। লাল, হলুদ, সাদা, গোলাপি, বেগুনি আর নীল—প্রকৃতি যেন নিজের সব রঙ উজাড় করে দিয়েছে এই জনপদে। এখানে ফুল কোনো সৌখিন শখের বিষয় নয়, ফুলই জীবন ও জীবিকার প্রধান ভিত্তি। ধান বা অন্যান্য ফসলের বদলে ফুলই এখানকার মানুষের ভরসা।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় চাষিদের কর্মব্যস্ততা। কেউ ফুল কাটছেন, কেউ বাছাই করছেন, কেউ ডালি বাঁধছেন। মাঠে মাঠে দেখা যায় রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস, জারবেরা, জিপসি, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া সহ নানা জাতের ফুল। বাতাসে ভেসে বেড়ায় ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ, মৌমাছির গুঞ্জন আর প্রজাপতির উড়াউড়ি—সব মিলিয়ে এক মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা যে কাউকে মুগ্ধ করে।
এই সৌন্দর্যই গদখালীকে শুধু অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয়, বরং পর্যটন আকর্ষণেও পরিণত করেছে। যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক থেকে গদখালীর দিকে মোড় নিলেই চোখে পড়ে ফুলের স্বর্গরাজ্য। ভ্রমণপিপাসু মানুষ, শিক্ষার্থী, প্রকৃতিপ্রেমীরা প্রতিদিনই ভিড় করেন এই এলাকায়। কেউ ছবি তোলেন, কেউ ঘুরে ঘুরে ফুলের ক্ষেত দেখেন, কেউ আবার স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ফুল কিনে নেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও বাড়তি গতি আসে।
গদখালীর ফুল প্রতিদিন ভোর থেকে ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে চলে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে। জাতীয় দিবস, ধর্মীয় উৎসব, বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় আয়োজনে এখানকার ফুলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস এলেই এই অঞ্চলের বাজারে ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। শুধু বিজয় দিবস উপলক্ষেই কয়েক কোটি টাকার ফুল বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুরো মৌসুম মিলিয়ে এই অঞ্চলে কয়েকশ কোটি টাকার ফুলের লেনদেন হতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে।
ফুলচাষিদের এই যাত্রায় পাশে থাকার কথা জানাচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোগবালাই ও ছত্রাকজনিত সমস্যা মোকাবিলায় চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উন্নত জাতের চারা, আধুনিক চাষপদ্ধতি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তাদের আশা, বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে মৌসুমের শেষে গদখালীর চাষিরা শুধু আর্থিকভাবে লাভবানই হবেন না, বরং দেশের প্রতিটি উৎসব ও আনন্দের মুহূর্তে নিজেদের শ্রমের সুবাস আরও দৃঢ়ভাবে ছড়িয়ে দিতে পারবেন।
গদখালীর ফুলচাষিদের কাছে ফুল কেবল আয়ের উৎস নয়, এটি তাদের পরিচয়, গর্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। অনেক কৃষক ধান বা অন্যান্য ফসল ছেড়ে ফুল চাষে এসে স্বাবলম্বী হয়েছেন, বদলেছে তাদের জীবনমান। সন্তানদের লেখাপড়া, ঘরবাড়ি নির্মাণ, সামাজিক অবস্থান—সবকিছুতেই ফুলচাষের অবদান রয়েছে।
বিজয়ের আবহে গদখালীর এই ব্যস্ততা তাই কেবল অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি পরিশ্রমী মানুষের অধ্যবসায়, সংগ্রামের ভেতর থেকেও আশার আলো খুঁজে নেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শীতের কুয়াশা ভেদ করে ফুলে ফুলে সাজানো এই জনপদ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে বিজয়ের রঙ, সৌরভ আর ভালোবাসা—যা দেশের প্রতিটি কোণকে করে তুলছে আরও উজ্জ্বল, আরও বর্ণিল।