ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
তাজা খবর
“কানাডার এমপি নির্বাচনে জয়ী ডলি বেগমকে গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র অভিনন্দন
উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হলো ১৪৪ তম খুলনা দিবস!
চট্রগ্রামের জব্বারের বলি খেলায় হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন হোমনার বাঘা শরীফ
কৃষকের ন্যায্য মূল্য কোথায় যায়?
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত
ছদ্মবেশী অস্ত্র ‘পেনগান’
ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট
যশোরে কৃত্রিম তেল সংকটে দিশেহারা চালক ও সাধারণ মানুষ
জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার তেল শোধনাগারে ভয়াবহ আগুন
ফুয়েল পাস নিতে নিবন্ধনের নিয়ম
আবু মুছার গোপন কৌশল উন্মোচিত
মনিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি প্রতারণার নেটওয়ার্ক

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ১১:১৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
- / ৭৭ বার পঠিত

যশোরের মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা প্রতারণার মেঘ অবশেষে ছিন্ন হতে শুরু করেছে। নীরবে–নিভৃতে বছরের পর বছর ধরে সরকারি চাকরির লোভ দেখিয়ে যিনি অসংখ্য পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছেন—তিনি আর কেউ নন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেরই একজন সাধারণ ড্রাইভার, আবু মুছা। একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী কীভাবে প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে এমন এক ‘নিয়োগকারীর ক্ষমতা’ অর্জন করলেন, যার সামনে সাধারণ মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ সঁপে দিতেও প্রস্তুত ছিল—এই প্রশ্ন এখন পুরো অঞ্চলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর অবাধ যোগাযোগ, অফিসের কাগজপত্র হাতে নিয়ে রুমে–রুমে প্রবেশ, রাজনৈতিক পরিচয়ের গল্প এবং সবচেয়ে বড় অস্ত্র—অসাধারণ আত্মবিশ্বাস। এই সবকিছু মিলিয়ে তিনি নিজের চারপাশে এমন এক ভরসার বলয় তৈরি করতে সক্ষম হন, যা সাধারণ মানুষের চোখে তাঁকে প্রায় ক্ষমতাবান কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের করিডোরে তাঁর প্রতিদিনের উপস্থিতি অনেকের কাছে যেন চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তাই ছিল। আর সেই ভুল ধারণাই তাঁকে প্রতারণার বিশাল খেলায় নেমে আসার সুযোগ করে দেয়।
তদন্তে উঠে আসে ভয়াবহ সব অভিজ্ঞতা। প্রতিবন্ধী ইসমাঈল হোসেন, খানপুরের তরিকুল, মনোহরপুরের বাশার, কালীবাড়ির আবু বক্কার—এমন আরও বহু মানুষের গল্প যেন একই চিত্রনাট্যের কপি। কারও হাতে এসেছে স্ট্যাম্পে লেখা ‘নিয়োগ নিশ্চিত’ চুক্তিপত্র, কারও কাছে রয়েছে কথোপকথনের অডিও, কারও কাছে ব্যাংক লেনদেনের কাগজ। অনেকেই বলেছেন, প্রথমদিকে আবু মুছা তাঁদের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন যোগাযোগ করতেন। চাকরি হয়ে গেছে—এমন আশ্বাস একাধিকবার দিয়েছেন। “ফাইল ঢাকায় গেছে”, “সই–সিল হলেই হবে”, “আগামী সপ্তাহেই জয়েন”—এই কথাগুলো তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছিল জীবনের স্বপ্ন পূরণের প্রথম সিঁড়ি। কিন্তু সেই সিঁড়িই ছিল প্রতারণার গভীর গর্তের মুখ।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও আলোচিত অভিযোগ এসেছে মনিরামপুরের এক যুবক ইয়াসিনের কাছ থেকে। তাঁর কথায় ব্যথা, ক্ষোভ, আর বিশ্বাসভঙ্গের তীব্র যন্ত্রণা—সবই একসঙ্গে মিশে আছে। ইয়াসিন জানান—
“চাকরি করে পরিবারের হাল ধরব—এমন আশায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। বলেছিল কিছুদিনের মধ্যেই নিয়োগপত্র হাতে পাব। এখন ফোনই ধরে না। আমি যেন বোকাও, ক্ষতিগ্রস্তও।”
ইয়াসিনের কাছে থাকা ভিডিও–অডিও রেকর্ড, হাতে লেখা কাগজ, চুক্তিপত্র—সবই এখন এই বিশাল নেটওয়ার্ক উন্মোচনের সম্ভাব্য প্রমাণ।
ভুক্তভোগীদের এইসব প্রমাণ বিশ্লেষণে দেখা যায়—প্রতারণার কৌশল ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে সাজানো। প্রথমে মানুষের বিশ্বাস অর্জন, তারপর চাকরির স্বপ্ন দিয়ে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ, এরপর টাকার লেনদেন, সর্বশেষে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন—এটা যেন তাঁর প্রতারণার আলগোরিদম।
এ ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তদারককারীদের নীরবতা নিয়ে। ঘটনা চলার সময়কার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ফাইয়াজ আহমেদ ফয়সালের নামে অভিযোগ উঠেছে—দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা চললেও তিনি কোনো সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেননি। সাংবাদিক হিসেবে বারবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তাঁর এই নীরবতা স্থানীয়দের মধ্যে আরও সন্দেহ বৃদ্ধি করেছে। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন—একজন সাধারণ ড্রাইভার যদি এভাবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সজুড়ে দাপিয়ে বেড়াতে পারেন, তবে সেখানে প্রশাসনিক তদারকি কোথায়?
অনুসন্ধানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে—আবু মুছার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই চেক জালিয়াতির মামলা রয়েছে। অর্থাৎ প্রতারণা তাঁর পুরনো অভ্যাস। স্থানীয়দের ভাষায়—“কেউ না কেউ নিশ্চয়ই তাকে আড়াল করেছে। তা না হলে এভাবে বছরের পর বছর প্রতারণা করে বেড়ানো সম্ভব নয়।”
যাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে, তাদের অধিকাংশই দিনমজুরের পরিবার থেকে আসা, কেউ কেউ বছরের সঞ্চয় তুলে দিয়েছেন, কেউ আবার ধার–কর্জ করে টাকা জোগাড় করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের গল্পেই একই ব্যথা—“চাকরি পাব ভেবে সব দিয়েছি, এখন সব হারিয়ে শূন্য।”
একজন ভুক্তভোগী ভাঙা গলায় বললেন—
“টাকা হারানো কষ্টের, কিন্তু প্রতারিত হওয়ার লজ্জাটা আরও ভয়ংকর। মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারি না।”
মনিরামপুরজুড়ে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরছে—এই প্রতারণার দায় নেবে কে? আবু মুছা কি একাই এই নেটওয়ার্ক চালাতেন, নাকি তাঁর পেছনে ছিল আরও শক্তিশালী হাত? কারা জানত, কারা দেখেও চুপ ছিল? কেন ভুক্তভোগীদের অভিযোগ নেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়নি?
বিশ্লেষকরা বলছেন—প্রতারণা কখনোই একা একজনের হাতে টিকে থাকে না। এটি টিকে থাকে সমাজের নীরবতা, প্রশাসনের চোখ বন্ধ করে থাকা, আর ভুক্তভোগীদের অসহায় অবস্থার ওপর ভর করে। মনিরামপুরের এই ঘটনা তাই কেবল একজন ড্রাইভারের অপরাধ নয়; এটি একটি ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
ভুক্তভোগীরা সামনে আসছেন, প্রমাণ দিচ্ছেন, নীরবতা ভাঙছেন।
এখন চোখ সকলের প্রশাসনের দিকে—
এই নেটওয়ার্ক কি ভাঙবে? নাকি আরও বড় কোনো অন্ধকারের নিচে চাপা পড়ে যাবে সব সত্য?
আরও পড়ুন:














