ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
তাজা খবর
“কানাডার এমপি নির্বাচনে জয়ী ডলি বেগমকে গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র অভিনন্দন
উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হলো ১৪৪ তম খুলনা দিবস!
চট্রগ্রামের জব্বারের বলি খেলায় হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন হোমনার বাঘা শরীফ
কৃষকের ন্যায্য মূল্য কোথায় যায়?
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত
ছদ্মবেশী অস্ত্র ‘পেনগান’
ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট
যশোরে কৃত্রিম তেল সংকটে দিশেহারা চালক ও সাধারণ মানুষ
জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার তেল শোধনাগারে ভয়াবহ আগুন
ফুয়েল পাস নিতে নিবন্ধনের নিয়ম
শহীদ আকরাম—স্বাধীনতার স্বপ্নে জীবন উৎসর্গ নির্ভীক নায়ক

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:১০:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ৭৪ বার পঠিত

মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ ইতিহাসে অসংখ্য বীরের নাম যেমন অমর হয়ে আছে, তেমনি যশোরের মণিরামপুরের মাটিতেও লুকিয়ে আছে এক অবিচল সাহসী তরুণের রক্তগাঁথা—শহীদ আকরাম। তার নাম উচ্চারিত হলে এখনও মণিরামপুরের আকাশে-বাতাসে ভেসে ওঠে দেশপ্রেমের অদৃশ্য সুর, কারণ তিনি ছিলেন সেই সকল তরুণদের একজন, যারা দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারাকে জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন বলে বিশ্বাস করতেন। তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন প্রস্তুতি ছিল দেশের জন্য ঘাম, শ্রম আর শেষ পর্যন্ত রক্ত ঢেলে দেওয়ার। যুদ্ধের দিনগুলোতে তিনি ছিলেন নির্ভীক, লোভ-লালসাহীন, কেবল স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস ও জাতির মুক্ত ভবিষ্যতের স্বপ্নই ছিল তার শক্তি।
শহীদ আকরামের বেড়ে ওঠা ছিল এই জনপদের সহজ-সাদামাটা পরিবেশের মাঝেই। ধীরে ধীরে যখন পাকিস্তানি শোষণের ছায়া ঘনিয়ে আসে, তখন তার ভেতরে জন্ম নেয় তীব্র ক্ষোভ। দেশের মানুষের ওপর অমানবিক নিপীড়ন, রাজপথে নিরস্ত্র মানুষের রক্ত ঝরা, রাজনৈতিক নেতৃত্বদের বন্দিত্ব আর গ্রামে-গঞ্জে শত্রুদের তাণ্ডব তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং তার বুকের ভেতর যে দেশপ্রেমের আগুন ছিল, তা আরও প্রজ্বালিত হয়। স্বাধীনতার ডাক যখন চারদিকে জ্বালাময়ী শ্লোগানের মতো ছড়িয়ে পড়ল, তখন তিনি আর ঘরে থাকেননি; অস্ত্র হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তার দ্বিধাহীন সিদ্ধান্তই বলে দেয়, দেশের প্রতি ভালোবাসা তার কাছে ছিল ব্যক্তিগত জীবন, আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা পারিবারিক বন্ধনের চেয়েও অনেক উঁচুতে।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই আকরাম স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন গোপন অপারেশন এবং গ্রাম-আশপাশে শত্রুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করেন। সে সময় মণিরামপুর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগমুখী এলাকা, যার মাধ্যমে পাকবাহিনী সহজে যশোর শহরের দিকে অগ্রসর হতে পারত। এই অঞ্চলকে নিরাপদ রাখতে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি ছোট-ছোট দলকে নিয়মিত টহল, হামলা, তথ্য সংগ্রহ এবং শত্রুপক্ষের রসদ পরিবহন ব্যাহত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে হতো। সেইসব ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে আকরাম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। সহযোদ্ধারা বলেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথার, দৃঢ় মনোভাব সম্পন্ন, এবং ভয়কে ভয় না করা একজন সত্যিকারের যোদ্ধা।
অপারেশনগুলোর এক পর্যায়ে তিনি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। সহযোদ্ধাদের নিরাপদে ফিরে আসার সুযোগ করে দিতে গিয়ে তিনি অনেক সময় নিজেকে শত্রুর সরাসরি সামনে উন্মুক্ত করে দিতেন। তার লক্ষ্য ছিল শুধু একটাই—দেশকে স্বাধীন দেখতে হবে। যুদ্ধের বিভীষিকায় মৃত্যু ছিল প্রতিনিয়ত সঙ্গী, কিন্তু তিনি কখনো নিজের প্রাণ নিয়ে ভাবেননি। বরং সহযোদ্ধাদের মনোবল শক্ত রাখতে, গ্রামের মানুষদের আস্থা ধরে রাখতে তিনি সর্বদা চেষ্টা করতেন। বহু বয়োজ্যেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা এখনও স্মরণ করেন সেই তরুণের অটুট ইচ্ছাশক্তি ও অনন্য সাহস; তারা বলেন, ‘আকরামের চোখে ছিল স্বাধীনতার দীপ্তি, তার কথায় ছিল আগুন।’
যুদ্ধের এক কঠিন সময়ে শত্রুর গুলিতে তিনি শহীদ হন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো মণিরামপুর শোকের ছায়ায় ডুবে যায়। পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করে পথচেনা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই ভেঙে পড়ে। কিন্তু সেই শোকের মাঝেও তার প্রতি শ্রদ্ধা আরো গভীর হয়, কারণ তারা উপলব্ধি করেন—আকরাম নিজের জীবনের বিনিময়ে এই জনপদের মানুষকে, এই দেশকে উপহার দিয়ে গেলেন স্বাধীনতার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তার আত্মত্যাগ কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়, বরং একটি জাতির জন্মের প্রক্রিয়ায় অমূল্য রক্তসাক্ষ্য।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও শহীদ আকরামের নাম মণিরামপুরবাসীর কাছে এখনও তেমনি গর্বমাখা, তেমনি সম্মানের। তার স্মৃতিতে প্রতিবছর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রজন্মকে তার বীরত্বগাঁথা শোনায়, আর বয়োজ্যেষ্ঠরা তার জীবনাদর্শ নিয়ে গল্প করেন। নতুন প্রজন্মের যুবকেরা মনে করে—এই দেশকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসতে হলে আকরামের মতো সাহসী হতে হবে, দেশের প্রয়োজনে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। তার জীবন তাদের শেখায়, দেশপ্রেম কেবল মুখের বুলি নয়, বরং আত্মত্যাগে, দায়িত্ববোধে এবং সময়ের দাবি মেনে দাঁড়াবার নামই দেশপ্রেম।
শহীদ আকরাম যেন এ জনপদের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দিশারী। তার ছায়া আজও অটুটভাবে বিরাজমান মণিরামপুরবাসীর চেতনায়। সবশেষে হয়তো এটাই বলা যায়—একজন আকরাম জন্ম নিলে হাজারো মানুষ সাহস পায়, একটি জাতি শক্তি পায়; স্বাধীনতার স্বপ্ন পূর্ণতা পায়। তার বীরোচিত জীবনগাঁথা তাই বাঙালির হৃদয়ে চিরঅমর হয়ে থাকবে, সময়ের পরিক্রমায় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
আরও পড়ুন:














