শেখ রিফান আহমেদ : একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন কেবল জ্ঞান বিতরণের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির জন্ম ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মুক্তিসংগ্রামের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়, তখন তা আর কেবল প্রতিষ্ঠান থাকে না; হয়ে ওঠে একটি ভূখণ্ডের আত্মপরিচয়। দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক তেমনই এক অনন্য বাতিঘর। ১৯২১ সালের ১ জুলাই যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজ ২০২৬ সালেও তা শতবর্ষের গৌরবময় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে বাঙালির মেধা ও মননের আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ দেখাচ্ছে।
বিশ শতকের শুরুর দিকে পূর্ব বাংলার অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ১৯১২ সালের নাথান কমিটির সুপারিশ এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ১৯২১ সালে তিনটি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান ও আইন), ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক এবং ৮৪৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। শুরু থেকেই মুক্তবুদ্ধির চর্চা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবধারার এক অপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয় এই ক্যাম্পাস। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, রমেশচন্দ্র মজুমদার, মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিতদের পদচারণায় মুখরিত এই বিদ্যাপীঠ দ্রুতই বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুসংহত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল শিক্ষা প্রসারের ইতিহাস নয়, এটি বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের মহাকাব্য। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা থেকেই শুরু হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক মিছিল। এরপর ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। ২ মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের বটতলায় প্রথম উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই আইন বিভাগের ছাত্র। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বর্বরতম গণহত্যা চালায়। অধ্যাপক ড. জি সি দেব, অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাসহ বহু শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশের জন্য তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেন। এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল স্থানে বসিয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানচর্চার মূল নেতৃত্ব তৈরি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, লেখক, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের এক বিশাল অংশ এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই সৃষ্টি। শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, নাসার মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকতা ও গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা মেধার স্বাক্ষর রাখছেন।
শতবর্ষ পেরিয়ে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ এক নতুন যুগে পদার্পণ করেছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—বিশ্বমানের গবেষণার পরিধি বাড়ানো, শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে সম্মানজনক স্থান সুনিশ্চিত করা। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, বরং বাজারমুখী ও বাস্তবমুখী শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশে শিক্ষকদের আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করা। একই সাথে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন এবং লাইব্রেরি সুবিধা আরও উন্নত করা সময়ের দাবি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের কিছু ভবন কিংবা ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়; এটি বাঙালির আবেগ, অহংকার ও আত্মোপলব্ধির প্রতীক। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি অন্ধকার দূর করে আলোর মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে। শতবর্ষের সেই গৌরবময় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগামী দিনেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং একটি প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রধান কারিগর হিসেবে চিরকাল উচ্চশিক্ষার বাতিঘর হয়ে পথ দেখাবে-এটাই আজ সমগ্র জাতির প্রত্যাশা।
-লেখক : সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা

শেখ রিফান আহমেদ 










