ঢাকা, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220

কেউ সুখ খুঁজে পান সহজেই, আবার কারও জীবনে সুখ যেন কেবলই অধরা এক স্বপ্ন।

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{"transform":2},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":true,"containsFTESticker":false}

মোঃ আল-আমিন

প্রায় ৩০ বছর আগে স্বামীকে নিয়ে স্বপ্নের সংসার গড়েছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের পূর্ব তালতলী গ্রামের জাহেদা খাতুন। সংসারে ছিল স্বচ্ছলতা না থাকলেও ছিল ভালোবাসা, ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্নে হঠাৎই নেমে আসে অন্ধকার।
দ্বিতীয় সন্তান তখন মায়ের গর্ভে মাত্র তিন মাস। এর মধ্যেই এক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারান জাহেদা খাতুন। স্বামীর কোনো সম্পদ না থাকায় সন্তানদের নিয়ে ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়িতে।
বাবার কাছ থেকে পাওয়া সামান্য জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।
দুই সন্তানকে বড় করতে গিয়ে জীবনের প্রতিটি দিন কেটেছে অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। একসময় সন্তানরা বড় হয়। বড় ছেলে জীবিকার তাগিদে চলে যান ঢাকায়। আর ছোট ছেলে জমির উদ্দিনকে নিয়ে জাহেদার সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
জমির উদ্দিন অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। বিয়ে করেন। ঘর আলো করে আসে ফুটফুটে কন্যাসন্তান মেহজাবিন।
তখন হয়তো জাহেদা খাতুন ভেবেছিলেন—জীবনের দীর্ঘ কষ্টের দিনগুলো বুঝি এবার শেষ হতে চলেছে।
কিন্তু ২০২২ সালের একটি দুর্ঘটনা আবারও সবকিছু ওলটপালট করে দেয়।
অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন জমির উদ্দিন। গুরুতর আহত হয়ে তার মেরুদণ্ড ও দুই পা অবশ হয়ে যায়।
সুস্থতার আশায় ছেলেকে নিয়ে একের পর এক হাসপাতালে ছুটেছেন জাহেদা খাতুন। চিকিৎসার পেছনে বিক্রি করেছেন সঞ্চয়, অটোরিকশা, এমনকি জমিও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলেকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে পারেননি।
এরই মধ্যে দুর্ঘটনার প্রায় দুই মাস পর জমির উদ্দিনের স্ত্রী অসুস্থ স্বামী ও ছোট্ট মেয়েকে রেখে বাবার বাড়িতে চলে যান—এমনটাই জানিয়েছেন পরিবারটি।
ফলে অসুস্থ ছেলে এবং ছোট্ট নাতনির দায়িত্বও এসে পড়ে জাহেদা খাতুনের কাঁধে।

মাত্র সাত বছরের মেহজাবিন। ছোটবেলা থেকেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিকভাবে ভাত খেতে পারে না; বিভিন্ন খাবারের ওপর নির্ভর করেই কাটছে তার দিন।
মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত মেহজাবিন এখন বাবাকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে।
মায়ের কথা মনে পড়লে বাবাকেই ‘মা’ বলে ডাকে সে।
যে বয়সে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে মেহজাবিনকে বাবার হুইলচেয়ার ঠেলে চলতে হয়।

পরিবারটির কষ্ট এখানেই শেষ নয়।
ছেলের চিকিৎসার জন্য সর্বস্ব হারানোর পর এখন তিন বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে জাহেদা খাতুনের পরিবারের জন্য।
এরই মধ্যে জাহেদা খাতুন নিজেই আক্রান্ত হয়েছেন ক্যান্সারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও অর্থের অভাবে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।
নিজের অসুস্থতার কথা ভুলে ছেলে ও নাতনির মুখের দিকে তাকিয়ে এখনও লড়াই করে যাচ্ছেন এই নারী।
একজন মা, একজন অসুস্থ সন্তান আর একজন ছোট্ট শিশু—তিনজন মানুষ, অথচ তিনজনের জীবনই নানা সংকটে জর্জরিত।
তবে এই কঠিন সময়ে কিছুটা আশার আলো হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন তেলিহাটি ইউনিয়নের মানবিক ব্যক্তি ইঞ্জিনিয়ার মোস্তাফিজুর রহমান।
পরিবারটির দুরবস্থার কথা জানতে পেরে প্রায় দুই বছর ধরে তিনি চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করে আসছেন।
কিন্তু খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজন চিকিৎসা। প্রয়োজন ওষুধ। প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আর সেখানেই সবচেয়ে বড় সংকট—অর্থের অভাব।

মেহজাবিনের বয়স এখন সাত বছর। তার চোখে অন্য শিশুদের মতোই স্বপ্ন—বাবার হাত ধরে হাঁটা, বাবার সঙ্গে স্কুলে যাওয়া, মায়ের আদর পাওয়া।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম।
বাবা যখন হুইলচেয়ারে বন্দি, তখন সেই হুইলচেয়ারের হাতল ধরেই মেয়েটিকে এগিয়ে যেতে হয়।

জীবন যে কতটা কঠিন হতে পারে, জাহেদা খাতুনের পরিবার যেন তারই এক নির্মম উদাহরণ।
আজ তাদের প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়—প্রয়োজন চিকিৎসা, খাবার এবং বেঁচে থাকার জন্য সামান্য সহযোগিতা।
সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষগুলো যদি যার যার অবস্থান থেকে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ান, তাহলে হয়তো জাহেদা খাতুনের দীর্ঘ সংগ্রামের পথে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।

Share this news as a Photo Card

সম্পর্কিত খবর :
12 October 2026

দুপচাঁচিয়ায় ট্যাপেন্টাডল-সহ রনি নামের মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

বিস্তারিত লিংক কমেন্টে |
nagorikbhabna.com
nagorikbhabna

কেউ সুখ খুঁজে পান সহজেই, আবার কারও জীবনে সুখ যেন কেবলই অধরা এক স্বপ্ন।

সর্বশেষ পরিমার্জন : ০৭:৩১:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোঃ আল-আমিন

প্রায় ৩০ বছর আগে স্বামীকে নিয়ে স্বপ্নের সংসার গড়েছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের পূর্ব তালতলী গ্রামের জাহেদা খাতুন। সংসারে ছিল স্বচ্ছলতা না থাকলেও ছিল ভালোবাসা, ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্নে হঠাৎই নেমে আসে অন্ধকার।
দ্বিতীয় সন্তান তখন মায়ের গর্ভে মাত্র তিন মাস। এর মধ্যেই এক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারান জাহেদা খাতুন। স্বামীর কোনো সম্পদ না থাকায় সন্তানদের নিয়ে ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়িতে।
বাবার কাছ থেকে পাওয়া সামান্য জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।
দুই সন্তানকে বড় করতে গিয়ে জীবনের প্রতিটি দিন কেটেছে অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। একসময় সন্তানরা বড় হয়। বড় ছেলে জীবিকার তাগিদে চলে যান ঢাকায়। আর ছোট ছেলে জমির উদ্দিনকে নিয়ে জাহেদার সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
জমির উদ্দিন অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। বিয়ে করেন। ঘর আলো করে আসে ফুটফুটে কন্যাসন্তান মেহজাবিন।
তখন হয়তো জাহেদা খাতুন ভেবেছিলেন—জীবনের দীর্ঘ কষ্টের দিনগুলো বুঝি এবার শেষ হতে চলেছে।
কিন্তু ২০২২ সালের একটি দুর্ঘটনা আবারও সবকিছু ওলটপালট করে দেয়।
অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন জমির উদ্দিন। গুরুতর আহত হয়ে তার মেরুদণ্ড ও দুই পা অবশ হয়ে যায়।
সুস্থতার আশায় ছেলেকে নিয়ে একের পর এক হাসপাতালে ছুটেছেন জাহেদা খাতুন। চিকিৎসার পেছনে বিক্রি করেছেন সঞ্চয়, অটোরিকশা, এমনকি জমিও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলেকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে পারেননি।
এরই মধ্যে দুর্ঘটনার প্রায় দুই মাস পর জমির উদ্দিনের স্ত্রী অসুস্থ স্বামী ও ছোট্ট মেয়েকে রেখে বাবার বাড়িতে চলে যান—এমনটাই জানিয়েছেন পরিবারটি।
ফলে অসুস্থ ছেলে এবং ছোট্ট নাতনির দায়িত্বও এসে পড়ে জাহেদা খাতুনের কাঁধে।

মাত্র সাত বছরের মেহজাবিন। ছোটবেলা থেকেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিকভাবে ভাত খেতে পারে না; বিভিন্ন খাবারের ওপর নির্ভর করেই কাটছে তার দিন।
মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত মেহজাবিন এখন বাবাকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে।
মায়ের কথা মনে পড়লে বাবাকেই ‘মা’ বলে ডাকে সে।
যে বয়সে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে মেহজাবিনকে বাবার হুইলচেয়ার ঠেলে চলতে হয়।

পরিবারটির কষ্ট এখানেই শেষ নয়।
ছেলের চিকিৎসার জন্য সর্বস্ব হারানোর পর এখন তিন বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে জাহেদা খাতুনের পরিবারের জন্য।
এরই মধ্যে জাহেদা খাতুন নিজেই আক্রান্ত হয়েছেন ক্যান্সারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও অর্থের অভাবে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।
নিজের অসুস্থতার কথা ভুলে ছেলে ও নাতনির মুখের দিকে তাকিয়ে এখনও লড়াই করে যাচ্ছেন এই নারী।
একজন মা, একজন অসুস্থ সন্তান আর একজন ছোট্ট শিশু—তিনজন মানুষ, অথচ তিনজনের জীবনই নানা সংকটে জর্জরিত।
তবে এই কঠিন সময়ে কিছুটা আশার আলো হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন তেলিহাটি ইউনিয়নের মানবিক ব্যক্তি ইঞ্জিনিয়ার মোস্তাফিজুর রহমান।
পরিবারটির দুরবস্থার কথা জানতে পেরে প্রায় দুই বছর ধরে তিনি চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করে আসছেন।
কিন্তু খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজন চিকিৎসা। প্রয়োজন ওষুধ। প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আর সেখানেই সবচেয়ে বড় সংকট—অর্থের অভাব।

মেহজাবিনের বয়স এখন সাত বছর। তার চোখে অন্য শিশুদের মতোই স্বপ্ন—বাবার হাত ধরে হাঁটা, বাবার সঙ্গে স্কুলে যাওয়া, মায়ের আদর পাওয়া।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম।
বাবা যখন হুইলচেয়ারে বন্দি, তখন সেই হুইলচেয়ারের হাতল ধরেই মেয়েটিকে এগিয়ে যেতে হয়।

জীবন যে কতটা কঠিন হতে পারে, জাহেদা খাতুনের পরিবার যেন তারই এক নির্মম উদাহরণ।
আজ তাদের প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়—প্রয়োজন চিকিৎসা, খাবার এবং বেঁচে থাকার জন্য সামান্য সহযোগিতা।
সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষগুলো যদি যার যার অবস্থান থেকে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ান, তাহলে হয়তো জাহেদা খাতুনের দীর্ঘ সংগ্রামের পথে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।

Share this news as a Photo Card