
অরবিন্দ রায়: ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন গোলয়া পাগল নাথের মেলা। যুগের পর যুগ ধরে এ মেলাকে ঘিরে জেগে ওঠে মানুষের আবেগ, ভক্তি ও ভালোবাসা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা মেলার আয়োজন শুধু একটা ধর্মীয় মেলার নয়, গ্রামীন বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্যের জীবন প্রতিচ্ছবি।
গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলা গোলয়া গ্রামে পাগল নাথের মেলার উল্লেখযোগ্য দিক হলো মানুষ মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন। ধর্ম – বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে এ আয়োজনে মানুষের মিলন ঘটে। স্হানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূর – দুরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরাও মেলার আনন্দে অংশ গ্রহণ করেন।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাগল নাথের এ মেলা চলে আসছে। গোলয়া গ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ১৬৪ তম পাগল নাথের মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার দিনব্যাপী গোলয়া দূর্গা মন্দির প্রাঙ্গনে এ মেলা সম্প্রীতির বন্ধন অনুষ্ঠিত হয় । পালল নাথের মেলা বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী মেলা গুলোর একটি। পাগল নাথের মেলা আমাদের লোক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এ মেলা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মনে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও মানবতার বার্তা দিয়ে আসে ।শত শত মানুষের আগমনে পাগল নাথের মেলা হয়ে উঠেছে উৎসবমুখর।
এক সময় বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্হা, চিকিৎসা ব্যবস্হা, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্হা ও জীবন যাএা উন্নত ছিল না। দেশে
দেশের বেশির ভাগ মানুষ ছিল কৃষি নির্ভর। গ্রামীন জনগোষ্টী মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত ছিল। কার্তিক মাস থেকে হালকা শীত পড়া শুরু করে । কার্তিক মাসের পর থেকে শীত বাড়তে থাকে । তখন আবহাওয়া পরিবর্তনের কারনে মানুষ বিভিন্ন ধরনের রোগ ব্যাধি দেখা দিত। যেহেতু তখনকার সময় চিকিৎসা সেবা উন্নত ছিল না সেই কারনে মানুষ রোগ ব্যাধি থেকে বাঁচতে বিভিন্ন নিয়ম কানুন পালন করত। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেক মানুষ মাছ মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকত।
আজ থেকে ১ শত ৬৪ বছর আগে চিকিৎসা ব্যবস্হা উন্নত ছিল না। কার্তিক মাস থেকে শুরু করে শীতের দিনে বিভিন্ন রোগে মানুষ মারা যেত বেশি। তাই গোলয়া গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করতো বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পেতে পাগল নাথের মেলা শুরু করে। এ গ্রামের বংশক্রমানুসারে মানুষ পাগল নাথের মেলা পালন করে আসছেন।
প্রতি বছর কার্তিক মাসে ১ তারিখ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত গোলয়া গ্রামের মানুষ নিরামিষ খেয়ে থাকে। প্রতিরাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রামের মানুষ নাম কীর্তন করে থাকে । সপ্তম দিন সারাদিন কীর্তন, পাগল নাথ গান ও ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরন করা হয় ।
ড. চিওরঞ্জন রায় জানান, এক সময় গোলয়া গ্রামের প্রধান উৎসব ছিল পাগল নাথের মেলা। এ মেলায় ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি । এ মেলা গোলয়া গ্রামের সম্প্রীতির এক অপূর্ব বন্ধন। আমরা পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য আজও রক্ষা করে চলেছি। গ্রামে এখন দুর্গাপূজা, অষ্টপ্রহর, স্বরস্বতী পূজা সহ বিভিন্ন উৎসব পালন করা হয়। আধুনিকতার ছোঁয়া এ গ্রামেও লেগেছে। পূর্ব পুরুষদের বিশ্বাস কে ধরে রেখে আজও আমরা প্রতি বছর পাগল নাথে উৎসব পালন করে থাকি ।
কিশোর কুমার রায় জানান, পাগল নাথের মেলা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, এ মেলা আত্নীয় – স্বজন ও পরিচিতদের মিলন মেলা।
শিক্ষক খুশীমোহন রায় জানান,পাগল নাথের মেলায় মনের প্রশান্তি অনুভব করি। বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে প্রতি বছর মেলার জন্য অপেক্ষা করি। পাগল নাথ আমাদের সকল দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। তাই আমাদের মনের গভীরে বিশ্বাসে পাগল নাথ আছে।
কালের বিবর্তনে সাথে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। আধুনিক যুগে ওয়ানটাইম প্লেট, গ্লাস সহ বিভিন্ন জিনিসপএ বের হয়েছে। তারপরও পাগল নাথের প্রসাদ কলা পাতায় প্রসাদ বিতরণ করে ঐতিহ্য রক্ষা করা হচ্ছে। ভক্তদের মাঝে সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে প্রসাদ বিতরনের জন্য সবুজ রায়, আকাশ রায়, স্বপন রায়, তপন রায়, ভবেন রায়, রাজন রায়, কনক রায়, তাপস রায় সহ ৫০ সদস্য বিশিষ্ট প্রসাদ বিতরন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পাগল নাথের মেলার দিন স্হানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা এসে সনাতন ধর্মের মানুষের সাথে মতবিনিময় করতে আসেন । এলাকায় সকল ধর্মের মানুষের উপস্হিতিতে মেলা হয়ে উঠে উৎসবমুখর। এ মেলা সম্প্রীতির রক্ষার এক অনন্য মিলন বন্ধন। এ মেলাকে ঘিরে আশে পাশের এলাকায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। এটি শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এক মিলন মেলায় পরিনত হয়েছে। গোলয়া গ্রামে বিরাজ করছে আনন্দমুখর পরিবেশ।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম বাংলার অনেক প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গোলয়া পাগল নাথের মেলা আজও মানুষের অংশগ্রহণ ও ভালোবাসায় টিকে আছে। স্হানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্হাপনার মাধ্যমে এ ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছেও তুলে ধরা হবে। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গোলয়া পাগল নাথের মেলা আজও মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে আছে। ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধারণ করে এ মেলা যেন বারবার মনে করিয়ে দেয় – ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির সেতু বন্ধন গড়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম।

অরবিন্দ রায় 












