
এম.জে.এ মামুন:
তথ্য জানা নাগরিকের অধিকার, আর জনগণকে প্রয়োজনীয় ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুশাসন ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার এই মৌলিক ধারণাকে সামনে রেখে আজ ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস।
এ বছর দিবসটির আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘Upholding Information Integrity in the Digital Age: The role of access to Information in addressing Information Disorder’। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ডিজিটাল যুগে তথ্যের অখণ্ডতা রক্ষা: তথ্যের বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় তথ্যের অধিকারের ভূমিকা।’ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এবারের দিবসের আলোচনায় শুধু তথ্য পাওয়ার সুযোগ নয়, সেই তথ্য যেন সময়োপযোগী, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয় তার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তথ্য অধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ:
গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড, সরকারি সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট, জনসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য থাকা প্রয়োজন। তথ্যের সুযোগ থাকলে নাগরিক সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারেন এবং জবাবদিহি দাবি করতে পারেন।
জাতিসংঘের মতে, সর্বজনীন তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং সুস্থ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্ঞানভিত্তিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি।
বিশ্বব্যাপী এ অধিকারের গুরুত্ব ক্রমেই বেড়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এসডিজি ১৬.১০.২ সূচকে সাংবিধানিক, আইনগত বা নীতিগতভাবে জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা রয়েছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করে ইউনেস্কো। ২০২৫ সালের ইউনেস্কো জরিপে ১৪১টি দেশ ও অঞ্চলে তথ্যপ্রাপ্তির আইনগত নিশ্চয়তা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১২৩টি দেশ ও অঞ্চল জরিপে অংশ নেয়।
বাংলাদেশের আইনি ভিত্তি:
বাংলাদেশে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ প্রণয়ন করা হয়। ইউনেস্কোর বাংলাদেশ-সংক্রান্ত জরিপেও ‘Right to Information Act, 2009’-কে দেশে তথ্যপ্রাপ্তির আইনগত ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য কমিশন বাংলাদেশের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আইন অনুযায়ী, নাগরিকরা নির্ধারিত পদ্ধতিতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কাঙ্ক্ষিত তথ্য চাইতে পারেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করার বিধান রয়েছে।
এ আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাগরিককে সব তথ্যের জন্য অপেক্ষা করে আবেদন করতে হবে, এমন নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট তথ্য স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশের ব্যবস্থাও রয়েছে। তথ্য কমিশন এ বিষয়ে পৃথক নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে।
আবেদন থেকে কমিশনে অভিযোগ:
তথ্য চাওয়ার পর কোনো নাগরিক আইন অনুযায়ী তথ্য না পেলে বা তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধার মুখে পড়লে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। তথ্য কমিশন বাংলাদেশের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কমিশনে মোট ৫ হাজার ৮০৪টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৬৭১টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। নিষ্পত্তির মধ্যে ৩ হাজার ২৩৩টি অভিযোগ শুনানির মাধ্যমে এবং ২ হাজার ৪৩৮টি বিভিন্ন ধরনের পরামর্শের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।
এই পরিসংখ্যান থেকে বাংলাদেশের তথ্য অধিকার ব্যবস্থায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং তথ্য না পাওয়ার অভিযোগের একটি চিত্র পাওয়া যায়। তবে তথ্য অধিকার কার্যকর হওয়ার বিষয়টি শুধু আইন থাকা বা অভিযোগ নিষ্পত্তির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; বাস্তবে কতটা সহজে, দ্রুত ও কার্যকরভাবে নাগরিক তথ্য পাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বে আইন আছে, বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা:
ইউনেস্কোর তথ্য বলছে, তথ্যপ্রাপ্তির আইনগত নিশ্চয়তা বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ২০২২ সালের জরিপে অংশ নেওয়া ১২৩টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১১৪টি অর্থাৎ ৯৩ শতাংশ দেশ ও অঞ্চলে সাংবিধানিক, আইনগত বা নীতিগতভাবে তথ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকার কথা জানানো হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর প্রয়োগব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ, তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ আইন প্রণয়ন হলেও শেষ ধাপ হচ্ছে সেই আইন বাস্তবে কার্যকর করা। তথ্যের আবেদন সহজ করা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সময়মতো তথ্য দেওয়া, আপিল ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং সরকারি তথ্য ডিজিটাল মাধ্যমে সহজলভ্য করা—সবই এর অংশ।
ডিজিটাল যুগে নতুন সংকট:
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্য পাওয়ার সুযোগকে অভূতপূর্বভাবে বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি।
ফলে বর্তমান সময়ে শুধু ‘তথ্য পাওয়া’ যথেষ্ট নয়; কোন তথ্য সত্য, কোনটি অসম্পূর্ণ, কোনটি বিভ্রান্তিকর এবং কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে তা যাচাই করার সক্ষমতাও জরুরি।
জাতিসংঘের ২০২৬ সালের দিবসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ, গণমাধ্যম ও তথ্য-সাক্ষরতা, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-উপাত্ত এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি একটি স্বাস্থ্যকর তথ্য পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তথ্য অধিকার গুরুত্বপূর্ণ:
তথ্য অধিকার সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি প্রকল্পের ব্যয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি, বরাদ্দ, উপকারভোগীর সংখ্যা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে নথিভিত্তিক তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে।
তবে তথ্য অধিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনে নির্ধারিত অন্যান্য সংরক্ষিত তথ্যের সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখতে হয়। তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং অন্যান্য বৈধ স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত।
সামনে যে প্রশ্ন:
তথ্য অধিকার দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সবার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রশ্ন হলো নাগরিকের প্রয়োজনীয় তথ্য কতটা সহজে পাওয়া যাচ্ছে? সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বপ্রণোদিতভাবে তথ্য প্রকাশ করছে? তথ্য চেয়ে আবেদন করলে কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে উত্তর মিলছে? আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া বিপুল তথ্যের মধ্যে নির্ভরযোগ্য তথ্য চেনার সক্ষমতা কতটা তৈরি হয়েছে?
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ২০২৬ সালের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুও মূলত এখানেই তথ্যের অধিকারকে শুধু তথ্য পাওয়ার অধিকার হিসেবে নয়, বরং নির্ভরযোগ্য ও অখণ্ড তথ্যভিত্তিক সমাজ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা।
তথ্য যখন নাগরিকের অধিকার, তখন সেই তথ্যের সহজলভ্যতা, নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সচেতন নাগরিকের হাতে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক সমাজের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

নাগরিক ডেস্ক রিপোর্ট 










