ঢাকা, বাংলাদেশ। , বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মনিরামপুরে নতুন আলোচনায় কামরুজ্জামান শাহিন

বিএনপির অভ্যন্তরে তুমুল চাপ-ক্ষোভ; পাঁচ আসনে বিরোধ

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর: 
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ১১:২৭:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৩৫ বার পঠিত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা, ক্ষোভ ও চাপ দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটির সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম সম্প্রতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় বিএনপি; শুধু যশোর–৫ (মনিরামপুর) আসনটি জোটীয় সমীকরণের কারণে এখনো শূন্য রয়েছে। তবে তালিকা ঘোষণার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পাঁচটি আসনের চারটিতেই তীব্র বিরোধ, হতাশা, পৃথক শোডাউন ও প্রার্থীপক্ষের প্রকাশ্য বক্তব্য পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। দীর্ঘদিন আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত, মামলা–গ্রেফতার ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের চাপে থাকা যশোর বিএনপি এই অবস্থায় নির্বাচনের আগে এক নতুন ধাক্কার মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড মাঠপর্যায়ের তথ্য, পূর্বের নির্বাচন বিশ্লেষণ, সাংগঠনিক শক্তি, গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনা করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করেছে। গত দুই বছর ধরে যশোর বিএনপি কাঠামোগত পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে; বিশেষ করে গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্যেকটি আসনেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের বলয় শক্ত করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা, শোডাউন, জনসংযোগ—সব কিছুই জোরদার হয়। কিন্তু কেন্দ্র ঘোষিত তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন আসনে বহুদিনের জমে থাকা অসন্তোষ প্রকাশ্য রূপ পায়।
যশোর–১ (শার্শা) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য মফিকুল হাসান তৃপ্তির নাম ঘোষণার পর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির, সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধু ও সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের সঙ্গে কাজ করা এই নেতারা মনে করছেন, তাঁদের মূল্যায়ন করা হয়নি। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, শার্শায় বিএনপির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে এই বিভাজন দ্রুত না মেটালে নির্বাচনী মাঠে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তৃণমূলের কয়েকজন নেতা বলেন, “সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মাঠের বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়নি। আমরা কাজ করছি, কিন্তু সিদ্ধান্তে আমাদের মতামত নেই।”
যশোর–২ (ঝিকরগাছা–চৌগাছা) আসনে সম্ভাব্য নারী প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নীকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে জোরালো প্রতিযোগিতা। তাঁর বিরুদ্ধে সংগঠন পরিচালনায় দুর্বলতার অভিযোগ তুলে স্থানীয় কয়েকজন নেতা কেন্দ্রীয় দপ্তরে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন। সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খানের মোটরসাইকেল শোডাউন এলাকার রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ এনে দেয়। তাঁর অনুসারীরা দাবি করছেন, বছরের পর বছর মাঠে কাজ করার পর তাঁকে বাদ দেওয়া তৃণমূলে অসন্তুষ্টি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে মুন্নীর সমর্থকেরা বলছেন, এলাকায় নারী প্রার্থী হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে এবং তিনি ইতোমধ্যে বেশ কিছু এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “বিএনপি যদি এখানে অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোসলেহউদ্দিন ফরিদ এই পরিস্থিতির সুবিধা নিতে পারেন।”
যশোর–৪ (বাঘারপাড়া–অভয়নগর) আসনে ইঞ্জিনিয়ার টি এস আইয়ুবকে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ফারাজী মতিয়ার রহমান এখনো তাঁর সমর্থন ঘোষণা করেননি। গত কয়েক বছর ধরে এলাকায় নিয়মিত সাংগঠনিক কাজ করায় মতিয়ারের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। তাঁর অনুসারীরা স্পষ্টই জানিয়ে দিচ্ছেন যে তাঁরা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মানতে সময় নিতে চান। এলাকার রাজনৈতিক হাওয়ায় এখনো শোনা যাচ্ছে—এই আসনে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ঐক্যবদ্ধ না হলে নির্বাচনে জোটবদ্ধ প্রচারণা ব্যাহত হতে পারে।
যশোর–৬ (কেশবপুর) আসনে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষিত হলেও তাঁর প্রতি স্থানীয় নেতাদের আস্থার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মনোনয়ন না পাওয়া কেন্দ্রীয় নেতা অমলেন্দু দাস অপু এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন আজাদের সমর্থকেরা এখনো শ্রাবণের পক্ষে মাঠে নামেননি। শ্রাবণের সমর্থকেরা অবশ্য জোর দাবি করছেন যে তিনি এলাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গত কয়েক সপ্তাহের গণসংযোগে ভালো সাড়া পাচ্ছেন। তাঁদের ভাষায়, “শ্রাবণই নতুন রাজনীতির বার্তা দিচ্ছেন।”
জেলার মধ্যে তুলনামূলক স্বস্তিকর চিত্র দেখা যাচ্ছে যশোর–৩ (সদর) আসনে। এখানে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষিত হওয়ার পর তেমন কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। তাঁর পিতা তরিকুল ইসলামের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব এবং সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের কারণে অমিতকে কেন্দ্র করে কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, যশোর–৩ আসনে বিএনপি এবার ভালো অবস্থানে আছে।
এদিকে সর্বাধিক আলোচনায় থাকা যশোর–৫ (মনিরামপুর) আসনটি এখনো শূন্য রাখা হয়েছে। জোটীয় রাজনীতির হিসাব–নিকাশে এই আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মাওলানা রশিদ আহমদকে বিবেচনা করা হতে পারে—এমন গুঞ্জনে এলাকার রাজনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় তিন প্রার্থী—উপজেলা সভাপতি শহিদ মোহাম্মদ ইকবাল, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টু ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা ইফতেখার সেলিম অগ্নি—নিজ নিজ অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাঁরা নিয়মিত গণসংযোগ করছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন এবং নিজেদের প্রার্থী হিসেবে প্রকাশ্যে উপস্থাপন করছেন।
তবে মনিরামপুরের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সবচেয়ে বেশি সরগরম সদ্যপ্রয়াত জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুছার বড় ছেলে কামরুজ্জামান শাহিনকে নিয়ে। বাবার অকাল মৃত্যু এলাকায় এক ধরনের আবেগী পরিবেশ তৈরি করে। মুছা ছিলেন মনিরামপুরে তৃণমূলের কাছে একজন জনপ্রিয় এবং দীর্ঘদিনের মাঠ রাজনীতির পরিণত নেতা। তাঁর মৃত্যুর পর এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের আবহ থাকলেও রাজনীতির মাঠে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন শাহিন। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, তাঁর দীর্ঘদিনের সেবা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি নিবিড় সম্পর্ক এখন শাহিনের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
কামরুজ্জামান শাহিন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে ব্যাপক জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মুছার অনুসারী শত শত নেতাকর্মী তাঁকে নিয়ে গ্রাম–হাট–বাজার চষে বেড়াচ্ছেন। একাধিক ইউনিয়নে গণসংযোগে দেখা গেছে, শাহিনের পথসভায় সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়ছে। কয়েকটি ইউনিয়নে বাবার নামে থাকা সামাজিক সংগঠনের সদস্যরাও তাঁকে সমর্থন জানাচ্ছেন। মণিরামপুরের এক প্রবীণ নেতা বলেন, “মুছা চেয়ারম্যান যখন বেঁচে ছিলেন, কোনো দরিদ্র মানুষ বিপদে পড়লে তাঁর দরজায় যেত। এখন তাঁর ছেলে আসছে—মানুষ সেই আস্থাটাই খুঁজে পাচ্ছে।”
এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করে স্থানীয় শিক্ষক নাসির উদ্দিন বলেন, “মনিরামপুরে যে আবেগ সৃষ্টি হয়েছে, তা পুরোপুরি রাজনৈতিক হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। মুছা ছিলেন মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া নেতা। তাঁর মৃত্যুর পর শাহিনের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে। বিএনপি যদি নিজস্ব প্রার্থী দেয়, শাহিন নিশ্চয়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।”
মনিরামপুর উপজেলার সতেরটি ইউনিয়নের মধ্যে কমপক্ষে বারোটিতে শাহিনের গণসংযোগ সাড়া ফেলেছে—এমন দাবি তাঁর অনুসারীদের। স্থানীয়দের মতে, তিনি বাবা-ছেলের মিলিত রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠছেন। ফলে জোটীয় সমীকরণে এই আসন ছেড়ে দেওয়া হলে বিএনপির একটি শক্তিশালী স্থানীয় বলয় অসন্তুষ্ট হতে পারে।
জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেরুল হক সাবু বলেন, “এটি কেবল প্রাথমিক তালিকা। চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। যেসব জায়গায় ক্ষোভ আছে, আমরা আলোচনা করে মিটিয়ে ফেলব। নির্বাচন সামনে রেখে সবাই ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবে।” তবে তিনি স্বীকার করেন, দীর্ঘ আন্দোলনের ধকল ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে নতুন–পুরোনো বলয়ের মধ্যে কিছু জায়গায় সংঘাত তৈরি হয়েছে, যা সমন্বয় ছাড়া মেটানো কঠিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যশোরে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অভ্যন্তরীণ ঐক্য গড়ে তোলা। সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় বিদ্রোহ, ক্ষোভ ও বিভাজন দ্রুত না কমাতে পারলে নির্বাচনী মাঠে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে বহু বছর ধরে সংগঠনে শ্রম দেওয়া নেতারা মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে না পারলে তৃণমূলে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে।
তবুও তৃণমূলের অনেক কর্মী আশাবাদী। তাঁদের ভাষায়, “চূড়ান্ত তালিকা এলেই সবাই একসঙ্গে কাজ করবে।” জেলার এক প্রবীণ বিএনপি নেতা বলেন, “বিএনপি এখনো সংগঠনের শক্তিতে টিকে আছে। সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে যশোরের সবগুলো আসনেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি সম্ভব।”

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

মনিরামপুরে নতুন আলোচনায় কামরুজ্জামান শাহিন

বিএনপির অভ্যন্তরে তুমুল চাপ-ক্ষোভ; পাঁচ আসনে বিরোধ

সর্বশেষ পরিমার্জন: ১১:২৭:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা, ক্ষোভ ও চাপ দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটির সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম সম্প্রতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় বিএনপি; শুধু যশোর–৫ (মনিরামপুর) আসনটি জোটীয় সমীকরণের কারণে এখনো শূন্য রয়েছে। তবে তালিকা ঘোষণার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পাঁচটি আসনের চারটিতেই তীব্র বিরোধ, হতাশা, পৃথক শোডাউন ও প্রার্থীপক্ষের প্রকাশ্য বক্তব্য পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। দীর্ঘদিন আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত, মামলা–গ্রেফতার ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের চাপে থাকা যশোর বিএনপি এই অবস্থায় নির্বাচনের আগে এক নতুন ধাক্কার মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড মাঠপর্যায়ের তথ্য, পূর্বের নির্বাচন বিশ্লেষণ, সাংগঠনিক শক্তি, গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনা করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করেছে। গত দুই বছর ধরে যশোর বিএনপি কাঠামোগত পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে; বিশেষ করে গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্যেকটি আসনেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের বলয় শক্ত করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা, শোডাউন, জনসংযোগ—সব কিছুই জোরদার হয়। কিন্তু কেন্দ্র ঘোষিত তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন আসনে বহুদিনের জমে থাকা অসন্তোষ প্রকাশ্য রূপ পায়।
যশোর–১ (শার্শা) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য মফিকুল হাসান তৃপ্তির নাম ঘোষণার পর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির, সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধু ও সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের সঙ্গে কাজ করা এই নেতারা মনে করছেন, তাঁদের মূল্যায়ন করা হয়নি। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, শার্শায় বিএনপির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে এই বিভাজন দ্রুত না মেটালে নির্বাচনী মাঠে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তৃণমূলের কয়েকজন নেতা বলেন, “সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মাঠের বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়নি। আমরা কাজ করছি, কিন্তু সিদ্ধান্তে আমাদের মতামত নেই।”
যশোর–২ (ঝিকরগাছা–চৌগাছা) আসনে সম্ভাব্য নারী প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নীকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে জোরালো প্রতিযোগিতা। তাঁর বিরুদ্ধে সংগঠন পরিচালনায় দুর্বলতার অভিযোগ তুলে স্থানীয় কয়েকজন নেতা কেন্দ্রীয় দপ্তরে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন। সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খানের মোটরসাইকেল শোডাউন এলাকার রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ এনে দেয়। তাঁর অনুসারীরা দাবি করছেন, বছরের পর বছর মাঠে কাজ করার পর তাঁকে বাদ দেওয়া তৃণমূলে অসন্তুষ্টি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে মুন্নীর সমর্থকেরা বলছেন, এলাকায় নারী প্রার্থী হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে এবং তিনি ইতোমধ্যে বেশ কিছু এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “বিএনপি যদি এখানে অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোসলেহউদ্দিন ফরিদ এই পরিস্থিতির সুবিধা নিতে পারেন।”
যশোর–৪ (বাঘারপাড়া–অভয়নগর) আসনে ইঞ্জিনিয়ার টি এস আইয়ুবকে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ফারাজী মতিয়ার রহমান এখনো তাঁর সমর্থন ঘোষণা করেননি। গত কয়েক বছর ধরে এলাকায় নিয়মিত সাংগঠনিক কাজ করায় মতিয়ারের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। তাঁর অনুসারীরা স্পষ্টই জানিয়ে দিচ্ছেন যে তাঁরা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মানতে সময় নিতে চান। এলাকার রাজনৈতিক হাওয়ায় এখনো শোনা যাচ্ছে—এই আসনে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ঐক্যবদ্ধ না হলে নির্বাচনে জোটবদ্ধ প্রচারণা ব্যাহত হতে পারে।
যশোর–৬ (কেশবপুর) আসনে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষিত হলেও তাঁর প্রতি স্থানীয় নেতাদের আস্থার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মনোনয়ন না পাওয়া কেন্দ্রীয় নেতা অমলেন্দু দাস অপু এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন আজাদের সমর্থকেরা এখনো শ্রাবণের পক্ষে মাঠে নামেননি। শ্রাবণের সমর্থকেরা অবশ্য জোর দাবি করছেন যে তিনি এলাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গত কয়েক সপ্তাহের গণসংযোগে ভালো সাড়া পাচ্ছেন। তাঁদের ভাষায়, “শ্রাবণই নতুন রাজনীতির বার্তা দিচ্ছেন।”
জেলার মধ্যে তুলনামূলক স্বস্তিকর চিত্র দেখা যাচ্ছে যশোর–৩ (সদর) আসনে। এখানে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষিত হওয়ার পর তেমন কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। তাঁর পিতা তরিকুল ইসলামের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব এবং সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের কারণে অমিতকে কেন্দ্র করে কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, যশোর–৩ আসনে বিএনপি এবার ভালো অবস্থানে আছে।
এদিকে সর্বাধিক আলোচনায় থাকা যশোর–৫ (মনিরামপুর) আসনটি এখনো শূন্য রাখা হয়েছে। জোটীয় রাজনীতির হিসাব–নিকাশে এই আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মাওলানা রশিদ আহমদকে বিবেচনা করা হতে পারে—এমন গুঞ্জনে এলাকার রাজনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় তিন প্রার্থী—উপজেলা সভাপতি শহিদ মোহাম্মদ ইকবাল, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টু ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা ইফতেখার সেলিম অগ্নি—নিজ নিজ অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাঁরা নিয়মিত গণসংযোগ করছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন এবং নিজেদের প্রার্থী হিসেবে প্রকাশ্যে উপস্থাপন করছেন।
তবে মনিরামপুরের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সবচেয়ে বেশি সরগরম সদ্যপ্রয়াত জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুছার বড় ছেলে কামরুজ্জামান শাহিনকে নিয়ে। বাবার অকাল মৃত্যু এলাকায় এক ধরনের আবেগী পরিবেশ তৈরি করে। মুছা ছিলেন মনিরামপুরে তৃণমূলের কাছে একজন জনপ্রিয় এবং দীর্ঘদিনের মাঠ রাজনীতির পরিণত নেতা। তাঁর মৃত্যুর পর এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের আবহ থাকলেও রাজনীতির মাঠে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন শাহিন। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, তাঁর দীর্ঘদিনের সেবা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি নিবিড় সম্পর্ক এখন শাহিনের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
কামরুজ্জামান শাহিন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে ব্যাপক জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মুছার অনুসারী শত শত নেতাকর্মী তাঁকে নিয়ে গ্রাম–হাট–বাজার চষে বেড়াচ্ছেন। একাধিক ইউনিয়নে গণসংযোগে দেখা গেছে, শাহিনের পথসভায় সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়ছে। কয়েকটি ইউনিয়নে বাবার নামে থাকা সামাজিক সংগঠনের সদস্যরাও তাঁকে সমর্থন জানাচ্ছেন। মণিরামপুরের এক প্রবীণ নেতা বলেন, “মুছা চেয়ারম্যান যখন বেঁচে ছিলেন, কোনো দরিদ্র মানুষ বিপদে পড়লে তাঁর দরজায় যেত। এখন তাঁর ছেলে আসছে—মানুষ সেই আস্থাটাই খুঁজে পাচ্ছে।”
এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করে স্থানীয় শিক্ষক নাসির উদ্দিন বলেন, “মনিরামপুরে যে আবেগ সৃষ্টি হয়েছে, তা পুরোপুরি রাজনৈতিক হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। মুছা ছিলেন মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া নেতা। তাঁর মৃত্যুর পর শাহিনের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে। বিএনপি যদি নিজস্ব প্রার্থী দেয়, শাহিন নিশ্চয়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।”
মনিরামপুর উপজেলার সতেরটি ইউনিয়নের মধ্যে কমপক্ষে বারোটিতে শাহিনের গণসংযোগ সাড়া ফেলেছে—এমন দাবি তাঁর অনুসারীদের। স্থানীয়দের মতে, তিনি বাবা-ছেলের মিলিত রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠছেন। ফলে জোটীয় সমীকরণে এই আসন ছেড়ে দেওয়া হলে বিএনপির একটি শক্তিশালী স্থানীয় বলয় অসন্তুষ্ট হতে পারে।
জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেরুল হক সাবু বলেন, “এটি কেবল প্রাথমিক তালিকা। চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। যেসব জায়গায় ক্ষোভ আছে, আমরা আলোচনা করে মিটিয়ে ফেলব। নির্বাচন সামনে রেখে সবাই ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবে।” তবে তিনি স্বীকার করেন, দীর্ঘ আন্দোলনের ধকল ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে নতুন–পুরোনো বলয়ের মধ্যে কিছু জায়গায় সংঘাত তৈরি হয়েছে, যা সমন্বয় ছাড়া মেটানো কঠিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যশোরে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অভ্যন্তরীণ ঐক্য গড়ে তোলা। সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় বিদ্রোহ, ক্ষোভ ও বিভাজন দ্রুত না কমাতে পারলে নির্বাচনী মাঠে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে বহু বছর ধরে সংগঠনে শ্রম দেওয়া নেতারা মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে না পারলে তৃণমূলে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে।
তবুও তৃণমূলের অনেক কর্মী আশাবাদী। তাঁদের ভাষায়, “চূড়ান্ত তালিকা এলেই সবাই একসঙ্গে কাজ করবে।” জেলার এক প্রবীণ বিএনপি নেতা বলেন, “বিএনপি এখনো সংগঠনের শক্তিতে টিকে আছে। সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে যশোরের সবগুলো আসনেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি সম্ভব।”