শেখ রিফান আহমেদ : একটি দেশের অর্থনীতির শক্তি নির্ভর করে তার আর্থিক ব্যবস্থার ওপর, আর সেই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো ব্যাংকিং খাত। সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তর, শিল্প ও ব্যবসার অর্থায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভূমিকা অপরিসীম। তাই ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই নয়, বরং পুরো জাতীয় অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের ব্যাংকিং খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, দুর্বল সুশাসন, অনিয়ম, জবাবদিহির অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক কেলেঙ্কারি সাধারণ মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে আমানত সংগ্রহ ব্যাহত হয়, ঋণ বিতরণে সংকোচন দেখা দেয় এবং বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ওঠানামা এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ ব্যাংকগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতার নতুন পরীক্ষা নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের বিকল্প নেই। ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, ঝুঁকি মূল্যায়নে পেশাদারিত্ব, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ এবং আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা ও সক্ষমতা আরও বাড়ানো জরুরি, যাতে তারা রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবমুক্ত থেকে কার্যকর তদারকি করতে পারে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন গ্রাহকসেবা সহজ করেছে, তেমনি নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করেছে। তাই প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করতে হবে।
ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। আর সেই আস্থাই হবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি।
একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা মানে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি। তাই স্বল্পমেয়াদি সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন করতে হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে এটাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
-লেখক : সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা

শেখ রিফান আহমেদ 












