ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তাজা খবর
জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার তেল শোধনাগারে ভয়াবহ আগুন
ফুয়েল পাস নিতে নিবন্ধনের নিয়ম
গ্রামীণ আবহ আর কারুপণ্যের সম্ভার নিয়ে চলছে বৈশাখী মেলা
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে মারা গেছেন
বরেণ্য গীতিকবি,সুরকার,লেখক ও সংগীত গুরু ইউনুস আলী মোল্লার
স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে মাদারীপুরে ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ
গণধর্ষেণের শিকার ৬-বছরের শিশু ও ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী: গ্রেফতার-১
জাল টাকার কারখানায় অভিযান, আটক-১
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম
স্বতন্ত্রের আড়ালে পুরোনো রাজনীতির প্রত্যাবর্তন
সাবেক আ’লীগ নেতার প্রার্থিতা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক তোলপাড়

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:৫৬:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৮২ বার পঠিত

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর: যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সাবেক আওয়ামী লীগ নেতার স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান নামের ওই প্রার্থীর রাজনৈতিক অতীত, দীর্ঘদিনের দলীয় সম্পৃক্ততা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক সিদ্ধান্তের পর আদালতের মাধ্যমে মনোনয়ন পুনর্বহাল—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন আর কেবল ব্যক্তি বা দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, আইনের প্রয়োগ এবং ভোটারদের আস্থার এক বড় পরীক্ষায়।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও প্রবীণ নেতাকর্মীদের ভাষ্যমতে, ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান দীর্ঘ সময় ধরে মনিরামপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। জাতীয় দিবস, দলীয় কর্মসূচি এবং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন বাজার, সড়ক মোড় ও গ্রামাঞ্চলে টানানো ব্যানার–ফেস্টুনে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবির পাশাপাশি তাঁর নাম ও ছবি ছিল পরিচিত দৃশ্য। স্থানীয়দের বড় একটি অংশের দাবি, ওই সময় তিনি কখনো নিজেকে স্বতন্ত্র বা নির্দলীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেননি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের পর, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট–পরবর্তী পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। এখান থেকেই মনিরামপুরের রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্নের সূচনা হয়। আইনগতভাবে একজন ব্যক্তি অতীতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন—এটি সত্য। তবে ভোটারদের সামনে তাঁর রাজনৈতিক অতীত ও বর্তমান অবস্থান কতটা স্বচ্ছভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা নিয়েই সচেতন মহলে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, ব্যারিস্টার কামরুজ্জামানের অর্থনৈতিক প্রভাব অতীতেও মনিরামপুরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের দাবি, তাঁর অর্থায়নে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে এবং কিছু এলাকায় প্রভাবশালী বলয় গড়ে ওঠে। এমনকি অতীতে চিহ্নিত ও বর্তমানে এলাকা ছাড়া কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীর দায়দায়িত্ব ও দেখভালের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো কোনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবুও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অর্থের উৎস ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ব্যারিস্টার কামরুজ্জামানের প্রার্থিতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল এবং পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে তা পুনর্বহালের ঘটনা। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক যাচাইয়ে মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন বিষয়টি সেখানেই শেষ। কিন্তু আদালতের আদেশে মনোনয়ন পুনর্বহাল হওয়ার পর এলাকাজুড়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়—এটি কি কেবল আইনি প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ফল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো প্রভাব কাজ করেছে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালত মনোনয়ন পুনর্বহালের ক্ষেত্রে কেবল আইনগত দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা সাংবিধানিকভাবে বৈধ। তবে আদালত কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক অতীত বা নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করে না। এই দায়িত্ব পড়ে নির্বাচন কমিশনের ওপর, যার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হলো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা।
মনিরামপুরের শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও সমাজসেবীদের বড় একটি অংশ মনে করেন, এই প্রার্থিতা কেবল একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং এটি পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক অতীত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা না থাকলে ভবিষ্যতে পুরোনো প্রভাবশালী রাজনীতি নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, “নির্বাচন মানে শুধু ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিনিধি বাছাই নয়; এটি নৈতিকতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন।”
এ বিষয়ে ব্যারিস্টার কামরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ” আমি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম না এবং বর্তমানেও কোন দলের সাথে সম্পৃক্ত নই। যদি কেউ এই ধরনের কথা বলে থাকে তবে তা উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
এর বাইরে তিনি সরাসরি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি, তিনি সম্পূর্ণ আইন মেনেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইন যেখানে অনুমতি দিয়েছে, সেখানে তাঁর প্রার্থিতা প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই এবং তিনি জনগণের ভোটের মাধ্যমেই নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে চান।
সব মিলিয়ে মনিরামপুরের এই রাজনৈতিক বিতর্ক এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল একজন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণের বিষয় নয়; বরং এটি নির্বাচন কমিশনের সক্রিয়তা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং ভোটারদের আস্থার বড় পরীক্ষা। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—গোপন সমঝোতা বা প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, বরং স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির ভিত্তিতেই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হোক। শেষ পর্যন্ত রায় দেবেন ভোটাররাই; তবে তার আগে উত্থাপিত সব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।






















