হার না মানা জীবন যুদ্ধে জয়ী সুরাইয়া

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৮:২২:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৪
- / ৮৯ বার পঠিত

শাহীন শহীদ
ব্রম্মপুত্র, গঙ্গাধর শংকোশ, নদীর বিস্তীর্ণ চরানঞ্চলের মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এক কিশোরী যার মধ্যে সৌন্দর্য, সজীবতা, জীবনীশক্তি উদ্দীপনায় ভরপুর সেই কিশোরীর নাম সুরাইয়া খাতুন। নারায়ণপুরের বিস্তীর্ণ চর ভূমির চিরায়ত এক রূপ। কিন্তু এই দৃশ্য বা অপরূপতা চরের কন্যাশিশুদের হৃদয়ে সেভাবে অনুরণন তোলে না, যতোটা নাগরিক হৃদয় উদ্বেলিত হয়। কিশোরী সুরাইয়া খাতুন নারয়নুপর চরেরই একজন। পিতা – মোঃ কোরবান আলী। গ্রাম – কুলামুয়া কালার চর।সুরাইয়া খাতুনের বাবা পোশায় এক জন স্কুল পিয়ন, দুই বোনের মধ্যে বড় সে। নারায়ণপুর প্রাইমারী স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রোনী পাশ করে। তখন দুই চোখভরা স্বপ্ন লেখা পড়া করে বড় হবে। ঠিক সেই সময় সুরাইয়ার বাবা সুরাইয়ার খালাত ভাই এর সাথে বিবাহ দিতে রাজি হয়। বিয়ের প্রতিবাদ করলে খেতে হয় বাবা মায়ের পিটুনি ও গালাগাল। কিন্তু নিরুপায়। বিয়ের কিছুদিন পর যৌতুক এর টাকা দিতে না পাড়ায় সংসার ভেঙ্গে যায়। শুরু হয় সমাজ ব্যাবস্হার নির্মম ব্যাবহার। নানা রকম কটু কথা সহ্য করে নারায়ণপুর হাই স্কুল থেকে এস এস সি পাস করেন সুরাইয়া। নারায়ণপুর ইউনিয়নে কলেজ না থাকায় লেখা পড়ার জন্য কুড়িগ্রামে কলেজে যেতে হয় অনেক কষ্ট, স্বীকার করে। কলেজ ছুটিতে বাড়ি ফিরলে মানুষের নানা রকম কথা, বুড়ি হয়ে গেছে, স্বামী খাাওয়া মেয়ে ইত্যাদি শুনতে হয় সুরাইয়াকে। এত কিছুর মধ্যেও সুরাইয়া এখন কুুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অনার্সের ছাত্রী। বর্তমানে মহিদেব যুব সমাজ কল্যান সমিতির সিএনবি প্রকল্পের সহযোগিতায় ডিজিটাল মার্কেটিং এ কাজ করছে। দুই মাস কুড়িগ্রাম টিটিসিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রতিদিন অনলাইনে আয় করছে।
এখানই কি গল্প শেষ! না, গল্প এখনও অনেক দীর্ঘ। সুরাইয়ার মতো হাজারও কিশোরীকে বিয়ের স্বল্প সময়ের মধ্যেই মাতৃত্বকে বরণ করে নিতে হয়। জীবনের চাওয়া গুলো এভাবেই অন্ধকারে শেষ হয়ে যায়। কুুড়িগ্রাম জেলার বেশিরভাগ গ্রামে কন্যাশিশুর জীবনের নিয়তি এটাই। এটি যেন জীবনের পরিণতি।
এই পরণতির জন্য অবশ্য তারা দায়ী নয়। তাদেরকে সচেতন নয় বা কু-সংস্কারাচ্ছন্ন বলাও যাবে না।কেননা বর্তমানে নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে। এজন্য রাষ্ট্র এবং আলোকিত মানুষরাও কি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল? না দাড়ায় নি! এনজিও বা উন্নয়ন সংগঠনগুলোর কিছুটা প্রচেষ্টা দেখা যায়। কিন্তু প্রকল্প নিয়ে চরে কার্যক্রম শুরু করলেও ধারাবাহিকতা রক্ষা হয় না। প্রকল্প শেষ তো, সব শেষ। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর আর যেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না তেমনি অসহায় কিশোরীদের পাশে দাড়ানোর কেউ থাকে না। ফলাফল বাল্য বিবাহ সেটা গোপনে হোক বা প্রকাশ্যে।
বাল্য বিবাহের জন্য দারিদ্রতা, যৌতুক, সামাজিক প্রথা, বাল্যবিবাহ সমর্থনকারী আইন, ধর্মীয় ও সামাজিক চাপ, অঞ্চলভিত্তিক রীতি, নিরক্ষরতা এবং মেয়েদের উপার্জনে অক্ষম ভাবা অনেকটা দায়ী।
মনস্তাত্ত্বিক কারণও আছে যেমন মেয়ে বড় হলে ভালো পাত্র পাওয়া যায় না- এরকম একটি কু-সংস্কার চালু আছে গ্রামের মানুষের মাঝে। স্বভাবতই মেয়ে একটু বড় হলেই বিয়ে দেওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেন অভিভাবকরা। যৌতুকেরও প্রচলন বেশী রয়েছে। তাও নগদ টাকার লেনদেনই বেশি। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো যাচ্ছে না। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাল্যবিবাহের হারে বাংলাদেশ এখনো শীর্ষে। এটি মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশে আইন প্রয়োগে কঠোর না হওয়ায় বাল্য বিবাহ থামছে না। আইন প্রয়োগে দু একটা দৃষ্টান্ত স্হাপন করতে পারলে বাল্য বিবাহ অনেককাংশে কমে যাবে। বাংলাদেশের গ্রাম গুলোতে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রভাব বেশী।জনসচেতনতা বাড়াতে মাদ্রাসার শিক্ষক ও মাওলানাদের সহযোগীতা অনেক কাজে লাগবে। বাল্য বিবাহ রোধে সরকারি ও বেসরকারি এবং সামাজিকভাবে আরও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হলে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং আর্থিক ভাবে সচ্ছল জাতি বিনির্মাণে তা যে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে তাতে কোন সন্দেহ নাই । শুধু কিশোরী সুরাইয়া নয় সুরাইয়ার মতো জীবনের প্রতিটি পদে পদে লাঞ্চনা সহ্য করে জীবন যুদ্ধে জয়ী একেকজন সুরাইয়াকে জানাই স্যালুট।





















