নাগরিকভাবনা ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যুগপত্ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে নানা পরামর্শ ও মতামত প্রদানের পাশাপাশি উঠে এসেছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথাও। শরিক নেতাদের কেউ কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার আগ্রহের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীকে। কেউ কেউ সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, বিএনপির ৩১ দফা ও স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংসদের ‘উচ্চকক্ষ’ গঠন হলে সেটির সদস্য পদে যেন তাদেরকে বিবেচনা করা হয়।
সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর যুগপত্ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এ রকম নানা ইচ্ছা ও প্রত্যাশার কথা উঠে আসে। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক শরিক দলের নেতারা গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাকের সঙ্গে পৃথক আলাপে এ কথা জানান। তারা জানান, বৈঠকে শরিক দলগুলোর নেতাদের পক্ষ থেকে পাঁচ জন বক্তব্য রেখেছেন। সবার কথা শোনার পর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শরিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে যারা যোগ্য তাদের পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে এই বৈঠকে যোগ দিয়ে শরিক নেতাদের মধ্যে যে পাঁচ জন বক্তব্য রাখেন তাদের একজন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। বৈঠক শেষে তিনি জানান, এ বৈঠকের একটি দিক ছিল প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন, যুগপত্ আন্দোলনের যারা শরিক দল ছিল তারা যাতে দূরে চলে না যায়। তিনি বলেন, বৈঠকে সুনির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডা ছিল না। কেউ বক্তৃতা করেছেন, কেউ কেউ সরকারের অংশ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ রকম বলেছেন যে আমরা অংশীদার হতে চাই ক্ষমতার। আবার কেউ কেউ বলেছেন, সরকার পরিচালনার বিষয়ে তারা কিছু জানেন না, তারা অংশ নিতে পারছেন না।
একাধিক শরিক দলের নেতা জানান, সরকার পরিচালনায় শরিকদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জোটকে আরো সুসংহত করার কথাও এসেছে বৈঠকে। নির্বাচনের আগে বিএনপি শরিকদের নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকারে মাত্র তিনটি শরিক দলের তিন জন নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করায় কেউ কেউ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ তাদের বক্তব্যে বলেছেন, মিত্র দলগুলোর মধ্যে যারা নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি, মনোনয়ন পেলেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি—সেক্ষেত্রে এই দলগুলোর দুই-তিন জন নারী নেত্রীকে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য করা যেত।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শরিক দলগুলোর জন্য ১৫টি আসন ছেড়ে দেয়। এর মধ্যে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া পাঁচটি দলের জন্য ছিল আটটি আসন। নির্বাচনে জয়ী হন গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর। পরে জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক ও ববি হাজ্জাজকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। আন্দালিভ রহমান পার্থকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। এছাড়া, কয়েকটি শরিক দলের নেতা নিজ নিজ দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। তাদের মধ্যে শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ববি হাজ্জাজ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খাঁনকে রবিবার প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে যমুনায় বৈঠকে অংশ নেওয়া জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মহাসচিব আহসান হাবীব লিংকন ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীও তার বক্তব্যে নানা সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন। তবে, মিত্রদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে খুবই আন্তরিক মনে হয়েছে।’
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আলোচনায় কেউ কেউ তাদের বক্তব্যে বলেছেন, সরকারে আসার পর বিএনপি ও যুগপত্ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তত্পরতা তেমন দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে গত পাঁচ মাসে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে বিএনপি সমালোচনার মুখে পড়েছে বলেও তারা মত দেন।
শরিক দলের এক নেতা তার বক্তব্যে বলেছেন, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিএনপি ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করেছে। সেখানেও শরিকদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়নি।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শরিক দলগুলোর নেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আরো নিয়মিত মতবিনিময় এবং আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

নাগরিকভাবনা ডেস্ক 



















