
নাগরিকভাবনা ডেস্ক: জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার তুলে ধরতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার এই সফরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বহুল আলোচিত বৈঠকের জোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প নিজেই তারেক রহমানের সঙ্গে ‘অদূর ভবিষ্যতে’ সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করায় নিউইয়র্কে দুই নেতার বৈঠক নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। একই চিঠিতে বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর।
২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার প্রথম ভাষণ।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে কেবল জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে দেখছে না ঢাকা। নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান স্পষ্ট করা, যুক্তরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে সফরটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে। চিঠিতে ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ‘নট টু ডিসটেন্স ফিউচার’-এ সাক্ষাতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উষ্ণ শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথাও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে দুই নেতার সাক্ষাতের সম্ভাবনাটি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জোরালো বলে মনে করা হচ্ছে। বৈঠকের বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে কোনো তথ্য নেই। তবে কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ট্রাম্পের সরাসরি আগ্রহ প্রকাশের পর এ বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে যোগাযোগ আরও সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বাংলাদেশি পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ, মার্কিন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। এর আগে ট্রাম্প বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফলে দুই নেতার সরাসরি বৈঠক হলে এসব বিষয়ে নতুন কোনো সমঝোতা বা অগ্রগতির পথ তৈরি হয় কিনা, সেদিকেও নজর থাকবে কূটনৈতিক মহলের।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হবে ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের জাতীয় বক্তব্য দেওয়া। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন। তার বক্তব্যে গণতন্ত্র, রাষ্ট্র সংস্কার, আইনের শাসন, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা, উন্নয়ন সহযোগিতা, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় ন্যায্যতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার বিষয়ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি অর্থপাচার ও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মে জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক এজেন্ডার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও বাস্তুচ্যুতির মতো সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন প্রধানমন্ত্রী।
এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ একটি ঐতিহাসিক মাত্রাও রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। গত ২ জুনের নির্বাচনে বাংলাদেশ ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসকে পরাজিত করে এই মর্যাদাপূর্ণ পদ অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে প্রায় চার দশক পর আবারও একজন বাংলাদেশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাই একই সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন বিশ্বনেতাদের সবচেয়ে বড় সমাবেশে দেশের নেতৃত্ব দেবেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন, তখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থিতি এবার বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিতে পারেন। ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটও প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হবে। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা চাওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ার ঝুঁকি এবং রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরবে ঢাকা।
জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন, ন্যায্য রূপান্তর এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। ফলে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এসব আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ পাবে। ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্যও বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফ্লোরিডা বিএনপির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ইমরানুল হক চাকলাদারের মতে, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সদরদপ্তরে আসা বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার ঐতিহাসিক সুযোগ। একই সঙ্গে প্রবাসীদের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মর্যাদা ও সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাবে— এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
নিউইয়র্কের কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রের অন্য শহরে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে সানফ্রান্সিসকো সফর হলে প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে তার মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রযুক্তি, স্টার্টআপ, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পেতে পারে।

নাগরিকভাবনা ডেস্ক 























