
এম.জে.এ মামুন:
শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের আগমনী বার্তা। আশ্বিন-কার্তিকের এ সময়ে গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতির আশপাশে দলবদ্ধ বেওয়ারিশ কুকুরের বিচরণ চোখে পড়ে। অনেক এলাকায় এসব কুকুর পথচারী ও স্কুলগামী শিশুদের ধাওয়া করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এরই মধ্যে কুকুরের আক্রমণের ভয়াবহ একটি ঘটনা ঘটেছে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায়। গত সোমবার বিকেলে কামারপাড়া ইউনিয়নের উত্তর হাটবামুনী গ্রামে একটি বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে ৭ বছরের এক শিশু আহত হওয়ার পর তাকে ধাওয়া করে আরেক ৭ বছরের স্কুলশিক্ষার্থী সিনথিয়া আক্তারকে। দৌড়ে পালানোর সময় সিনথিয়া গাছের শিকড়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলে কুকুরটি তার গলায় কামড় দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই ঘটনায় আহত অপর শিশুকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে বেওয়ারিশ বা অপরিচিত কুকুরকে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে স্কুলে যাতায়াতের সময় শিশুদের একা চলাচল এবং কুকুরের দল দেখলে দৌড়ে পালানোর প্রবণতা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
কুকুর দেখলে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, অপরিচিত কুকুর কাছে এলে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ানো বা চিৎকার না করে শান্ত থাকতে হবে। সম্ভব হলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কুকুরটিকে চলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কুকুরের দিকে পাথর ছোড়া, লাঠি দিয়ে আঘাত করা, লাথি দেওয়া কিংবা উত্ত্যক্ত করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
বিশেষ করে শিশুরা কুকুরের বাচ্চা, খাবার কিংবা খেলনা নিয়ে থাকা কুকুরের কাছে যাবে না। ঘুমন্ত, অসুস্থ, আহত বা অস্বাভাবিক আচরণ করা কুকুর থেকেও দূরে থাকতে হবে। কোনো কুকুর ধাওয়া করলে দৌড়ে পালানোর পরিবর্তে স্থির থাকার শিক্ষা শিশুদের আগে থেকেই দেওয়া জরুরি। WHO-এর শিশুদের জন্য নির্দেশনাতেও কুকুর কাছে এলে স্থির থাকা এবং পড়ে গেলে শরীর গুটিয়ে মাথা-মুখ ও ঘাড় সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কুকুর কামড়ালে অবহেলা নয়
কুকুরের কামড় বা আঁচড় সামান্য মনে হলেও বিষয়টি অবহেলা করা যাবে না। WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, কামড় বা আঁচড়ের পর ক্ষতস্থান দ্রুত সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ভালোভাবে ধুতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা এবং গুরুতর সংস্পর্শের ক্ষেত্রে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন বা সমজাতীয় চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।
ক্ষতস্থানে মরিচ, চুন, মাটি, গাছের রস, অ্যাসিড বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ লাগানো উচিত নয়। শুধু ক্ষত ছোট বা রক্তপাত কম হয়েছে বলে টিকা নেওয়ার প্রয়োজন নেই এমন ধারণাও বিপজ্জনক।
শুধু আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
কুকুরের উৎপাত নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা/সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে পোষা কুকুরকে নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া এবং জনবসতিতে বেওয়ারিশ কুকুরের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা জরুরি।
চট্টগ্রামেও চলতি বছর বেওয়ারিশ কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য ও সংবাদ প্রতিবেদনে কুকুরের সংখ্যা, কামড় ও জলাতঙ্কের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
চট্টগ্রাম জেলায় কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ের ঘটনাও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে ৫ হাজার ১৬৯ জন এমন ঘটনায় চিকিৎসা নিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৭ হাজার ৬৩ জনে দাঁড়ায়; ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিলেই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৫২ জন বলে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
শিশুদের নিরাপত্তায় অভিভাবক-শিক্ষকদের ভূমিকা
স্কুলে যাওয়া-আসার পথে কোথায় কুকুরের দল থাকে, তা অভিভাবকদের জানা থাকা দরকার। শিশুদের একা পাঠানোর পরিবর্তে সম্ভব হলে দলবদ্ধভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্কুল কর্তৃপক্ষও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কুকুরের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার কৌশল সম্পর্কে সচেতন করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, কুকুর দেখলেই আতঙ্কিত হওয়া নয়, আবার কুকুরের আচরণকে হালকাভাবে নেওয়াও নয়। সতর্কতা, সচেতনতা এবং কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে একটি প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সতর্ক থাকুন, শিশু ও পথচারীদের নিরাপদ রাখুন। কুকুরের কামড় বা আঁচড় হলে দেরি না করে ক্ষতস্থান ১৫ মিনিট সাবান-পানিতে ধুয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

নাগরিক ডেস্ক রিপোর্ট 



















