ঢাকা, বাংলাদেশ। , শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
জনতার হৃদয়ে অমর নেতা

এস এম লুৎফর রহমানের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

জেমস আব্দুর রহিম রানা
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৮:০৫:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ৪৪ বার পঠিত
১৩ সেপ্টেম্বর, যশোরের মণিরামপুর উপজেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম লুৎফর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৭ সালের এদিনে তিনি এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। আজও তাকে স্মরণ করছে মণিরামপুরবাসী, কারণ তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে ছিলেন সমান প্রিয়।
তিনি ছিলেন সহজ-সরল, অকপট ও মানবিক গুণাবলিতে ভরপুর একজন মানুষ। কাউকে দেখলেই জড়িয়ে ধরে খোঁজখবর নিতেন, কখনো কাউকে ছোট করে দেখেননি। তার উপজেলা পরিষদ অফিস ছিল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। সেখানে দেখা করতে গেলে কোনো অনুমতির দরকার হতো না। তিনি বরং নিজেই মানুষের কাছে এগিয়ে যেতেন। গ্রামের সাধারণ মানুষকে নিয়মিত খোঁজ নিতেন, অসুস্থ বা বিপদগ্রস্ত কারও খবর শুনলেই নিজে ছুটে যেতেন। বিশেষ করে ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি তার মমতা ছিল অতুলনীয়। তার কাছে মানুষই ছিল একমাত্র পরিচয়।
১৯৮৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল। বানভাসি মানুষের জন্য সরকারি ত্রাণ সংগ্রহ করতে তিনি নিজেই জিপগাড়ি চালিয়ে যশোরে যান। গাড়িতে ত্রাণের চাল বোঝাই করে ফেরার পথে যশোর শহরের মণিহার সিনেমা হলের অদূরে বকচর নামক স্থানে ঘটে সেই নির্মম দুর্ঘটনা। মুহূর্তেই প্রাণ হারান তিনি। সেদিন গাড়িতে আরও ছিলেন নেহালপুরের আব্দুস সালাম ও খালিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন ওরফে অনটু। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমি জেমস আব্দুর রহিম রানা নিজেও সেই গাড়িতে ছিলাম। ঘটনাটি আজও চোখে ভাসে—এক মুহূর্তেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই মণিরামপুরসহ আশপাশের জনপদে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, গ্রাম-গঞ্জ সর্বত্রই শুরু হয় কান্নার রোল। মানুষ দল বেঁধে ছুটে আসে রাস্তায়। মরদেহ যশোর থেকে মণিরামপুরে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছিল, কারণ রাস্তার দু’পাশে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ে রাস্তাই থেমে গিয়েছিল। রাজগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র আনিছুর রহমান তখনকার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “ক্লাস চলাকালীন সময় খবর আসে লুৎফর রহমান মারা গেছেন। আমাদের স্যার পাগলের মতো দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন। আমরা সবাই দৌড়ে গিয়ে দেখি চারপাশে কান্নার রোল। বিকেল পর্যন্ত মানুষ অপেক্ষা করেছিল মরদেহ দেখার জন্য।”
মরদেহ পৌঁছালে জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। হানুয়ার বটতলার পাশে পারিবারিক জমিতে তাকে সমাহিত করা হয়। এত মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে দিয়েছিল তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। জীবদ্দশায় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দেশসেরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার রাজনীতি ছিল মানুষের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়। তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার মৃত্যুতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং মণিরামপুরে এসে তার কবর জিয়ারত করেন।
আজও মণিরামপুরের অসংখ্য পরিবার তাদের ঘরে তার ছবি যত্নে তুলে রেখেছেন। মানুষ তাকে স্মরণ করে আবেগে ভেসে যায়। কারণ তিনি ছিলেন এমন এক নেতা যিনি রাজনীতিকে জনসেবার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সহজ-সরল জীবন, মানবিক আচরণ ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় তিনি জয় করেছিলেন সবার মন।
৩৮ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু এস এম লুৎফর রহমান আজও মণিরামপুরবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। তিনি মরেও বেঁচে আছেন মানুষের স্মৃতিতে। বছর ঘুরে আসে ১৩ সেপ্টেম্বর, কিন্তু সেই দিনের শোক এখনো মণিরামপুরবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতো বাজে। কালের স্রোত বয়ে গেলেও লুৎফর রহমানের মতো নেতার অভাব পূরণ হয়নি, আর কোনোদিন পূরণও হবে না।
আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

জনতার হৃদয়ে অমর নেতা

এস এম লুৎফর রহমানের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৮:০৫:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
১৩ সেপ্টেম্বর, যশোরের মণিরামপুর উপজেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম লুৎফর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৭ সালের এদিনে তিনি এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। আজও তাকে স্মরণ করছে মণিরামপুরবাসী, কারণ তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে ছিলেন সমান প্রিয়।
তিনি ছিলেন সহজ-সরল, অকপট ও মানবিক গুণাবলিতে ভরপুর একজন মানুষ। কাউকে দেখলেই জড়িয়ে ধরে খোঁজখবর নিতেন, কখনো কাউকে ছোট করে দেখেননি। তার উপজেলা পরিষদ অফিস ছিল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। সেখানে দেখা করতে গেলে কোনো অনুমতির দরকার হতো না। তিনি বরং নিজেই মানুষের কাছে এগিয়ে যেতেন। গ্রামের সাধারণ মানুষকে নিয়মিত খোঁজ নিতেন, অসুস্থ বা বিপদগ্রস্ত কারও খবর শুনলেই নিজে ছুটে যেতেন। বিশেষ করে ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি তার মমতা ছিল অতুলনীয়। তার কাছে মানুষই ছিল একমাত্র পরিচয়।
১৯৮৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল। বানভাসি মানুষের জন্য সরকারি ত্রাণ সংগ্রহ করতে তিনি নিজেই জিপগাড়ি চালিয়ে যশোরে যান। গাড়িতে ত্রাণের চাল বোঝাই করে ফেরার পথে যশোর শহরের মণিহার সিনেমা হলের অদূরে বকচর নামক স্থানে ঘটে সেই নির্মম দুর্ঘটনা। মুহূর্তেই প্রাণ হারান তিনি। সেদিন গাড়িতে আরও ছিলেন নেহালপুরের আব্দুস সালাম ও খালিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন ওরফে অনটু। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমি জেমস আব্দুর রহিম রানা নিজেও সেই গাড়িতে ছিলাম। ঘটনাটি আজও চোখে ভাসে—এক মুহূর্তেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই মণিরামপুরসহ আশপাশের জনপদে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, গ্রাম-গঞ্জ সর্বত্রই শুরু হয় কান্নার রোল। মানুষ দল বেঁধে ছুটে আসে রাস্তায়। মরদেহ যশোর থেকে মণিরামপুরে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছিল, কারণ রাস্তার দু’পাশে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ে রাস্তাই থেমে গিয়েছিল। রাজগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র আনিছুর রহমান তখনকার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “ক্লাস চলাকালীন সময় খবর আসে লুৎফর রহমান মারা গেছেন। আমাদের স্যার পাগলের মতো দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন। আমরা সবাই দৌড়ে গিয়ে দেখি চারপাশে কান্নার রোল। বিকেল পর্যন্ত মানুষ অপেক্ষা করেছিল মরদেহ দেখার জন্য।”
মরদেহ পৌঁছালে জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। হানুয়ার বটতলার পাশে পারিবারিক জমিতে তাকে সমাহিত করা হয়। এত মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে দিয়েছিল তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। জীবদ্দশায় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দেশসেরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার রাজনীতি ছিল মানুষের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়। তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার মৃত্যুতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং মণিরামপুরে এসে তার কবর জিয়ারত করেন।
আজও মণিরামপুরের অসংখ্য পরিবার তাদের ঘরে তার ছবি যত্নে তুলে রেখেছেন। মানুষ তাকে স্মরণ করে আবেগে ভেসে যায়। কারণ তিনি ছিলেন এমন এক নেতা যিনি রাজনীতিকে জনসেবার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সহজ-সরল জীবন, মানবিক আচরণ ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় তিনি জয় করেছিলেন সবার মন।
৩৮ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু এস এম লুৎফর রহমান আজও মণিরামপুরবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। তিনি মরেও বেঁচে আছেন মানুষের স্মৃতিতে। বছর ঘুরে আসে ১৩ সেপ্টেম্বর, কিন্তু সেই দিনের শোক এখনো মণিরামপুরবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতো বাজে। কালের স্রোত বয়ে গেলেও লুৎফর রহমানের মতো নেতার অভাব পূরণ হয়নি, আর কোনোদিন পূরণও হবে না।