ঢাকা, বাংলাদেশ। , শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি বৃদ্ধি ও ইউজিসির আয়ের চাপ শিক্ষার্থীদের কাঁধে

সাব্বির হোসেন, কুবি প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৪:১১:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ মার্চ ২০২৫
  • / ১১২ বার পঠিত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ভর্তিচ্ছু ও অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এমনটাই অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা আয়ের হিসাব দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ভার পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির রসিদ অনুযায়ী, ভর্তি ফি, সেমিস্টার ফি, বেতন ফি, আবাসিক হল ফি, গ্রন্থাগার ফি, ছাত্র-ছাত্রী কল্যাণ ফি, বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটস ফিসহ ১৫টি খাত থেকে আয় দেখানো হয়েছে। এতদিন শিক্ষার্থীদের ১৭,৭০০ টাকা গুণতে হলেও, নতুন নীতিতে সেমিস্টার ফি ৫৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৪,৫০০ টাকা করা হয়েছে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফি ৫৫০ টাকা থাকলেও, পাঁচ বছর পর তা দ্বিগুণ করে ১,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা না করেই ইউজিসির চাপে ফি বাড়িয়েছে। অন্যান্য আয়ের খাত উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের উপরই ব্যয়ভার চাপানো হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন ‘পাটাতন’-এর সাধারণ সম্পাদক সায়েম মোহাইমিন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান যেখানে সরকার প্রতিবছর ভর্তুকি দিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি না করে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন থেকে অনুদান সংগ্রহ করে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ দপ্তরের সূত্র জানায়, ইউজিসির নির্ধারিত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট থেকে অর্থ কেটে রাখা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। তবে অর্থ দপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “ইউজিসি আমাদের সব আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে, যদি আয়ের সুযোগ না থাকে, তাহলে অর্থ কেটে রাখার প্রশ্নই আসে না।”সাবেক রেজিস্ট্রার আমিরুল হক চৌধুরী জানান, “অর্থ সংক্রান্ত কোনো বিষয় সিন্ডিকেটে যাওয়ার আগে অর্থ কমিটির অনুমোদন লাগে, এবং তখনকার অর্থ কমিটি এটি অনুমোদন দিয়েছিল।”

বর্তমান কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, “বর্তমান প্রশাসন কোনো ফি বৃদ্ধি করেনি, আগের প্রশাসন এটি অনুমোদন করেছিল। সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত বিষয় হওয়ায় এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়, তবে আলোচনা করা হবে।”

উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলী বলেন, “আমি আসার আগেই ফি বৃদ্ধি করা হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা আমার কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছে। ফি কমানো কষ্টকর, কারণ ইউজিসি আমাদের স্বনির্ভর হতে বলছে। তবে আমি বিষয়টি সিন্ডিকেট সভায় তুলবো।”

ইউজিসির অর্থ, হিসাব ও বাজেট বিভাগের পরিচালক মো. রেজাউল করিম হাওলাদার বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় না থাকলে তারা কীভাবে আয় দেখাবে?”

এদিকে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, “এটি ইউজিসির বিষয় নয়, বরং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার।”

বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০০৬-২৬ সালের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ৫০% ব্যয় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে, যার ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি ফি চাপানো হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। ইউজিসির নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যয়ভার চাপিয়ে তাদের শিক্ষার অধিকারকে সংকুচিত করছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় বিকল্প অর্থসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

 

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি বৃদ্ধি ও ইউজিসির আয়ের চাপ শিক্ষার্থীদের কাঁধে

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৪:১১:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ মার্চ ২০২৫

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ভর্তিচ্ছু ও অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এমনটাই অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা আয়ের হিসাব দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ভার পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির রসিদ অনুযায়ী, ভর্তি ফি, সেমিস্টার ফি, বেতন ফি, আবাসিক হল ফি, গ্রন্থাগার ফি, ছাত্র-ছাত্রী কল্যাণ ফি, বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটস ফিসহ ১৫টি খাত থেকে আয় দেখানো হয়েছে। এতদিন শিক্ষার্থীদের ১৭,৭০০ টাকা গুণতে হলেও, নতুন নীতিতে সেমিস্টার ফি ৫৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৪,৫০০ টাকা করা হয়েছে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফি ৫৫০ টাকা থাকলেও, পাঁচ বছর পর তা দ্বিগুণ করে ১,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা না করেই ইউজিসির চাপে ফি বাড়িয়েছে। অন্যান্য আয়ের খাত উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের উপরই ব্যয়ভার চাপানো হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন ‘পাটাতন’-এর সাধারণ সম্পাদক সায়েম মোহাইমিন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান যেখানে সরকার প্রতিবছর ভর্তুকি দিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি না করে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন থেকে অনুদান সংগ্রহ করে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ দপ্তরের সূত্র জানায়, ইউজিসির নির্ধারিত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট থেকে অর্থ কেটে রাখা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। তবে অর্থ দপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “ইউজিসি আমাদের সব আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে, যদি আয়ের সুযোগ না থাকে, তাহলে অর্থ কেটে রাখার প্রশ্নই আসে না।”সাবেক রেজিস্ট্রার আমিরুল হক চৌধুরী জানান, “অর্থ সংক্রান্ত কোনো বিষয় সিন্ডিকেটে যাওয়ার আগে অর্থ কমিটির অনুমোদন লাগে, এবং তখনকার অর্থ কমিটি এটি অনুমোদন দিয়েছিল।”

বর্তমান কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, “বর্তমান প্রশাসন কোনো ফি বৃদ্ধি করেনি, আগের প্রশাসন এটি অনুমোদন করেছিল। সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত বিষয় হওয়ায় এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়, তবে আলোচনা করা হবে।”

উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলী বলেন, “আমি আসার আগেই ফি বৃদ্ধি করা হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা আমার কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছে। ফি কমানো কষ্টকর, কারণ ইউজিসি আমাদের স্বনির্ভর হতে বলছে। তবে আমি বিষয়টি সিন্ডিকেট সভায় তুলবো।”

ইউজিসির অর্থ, হিসাব ও বাজেট বিভাগের পরিচালক মো. রেজাউল করিম হাওলাদার বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় না থাকলে তারা কীভাবে আয় দেখাবে?”

এদিকে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, “এটি ইউজিসির বিষয় নয়, বরং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার।”

বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০০৬-২৬ সালের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ৫০% ব্যয় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে, যার ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি ফি চাপানো হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। ইউজিসির নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যয়ভার চাপিয়ে তাদের শিক্ষার অধিকারকে সংকুচিত করছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় বিকল্প অর্থসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।