ঢাকা, বাংলাদেশ। , মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

কৃষকের আত্মহত্যা – রাষ্ট্রের গোপন হত্যাকাণ্ড

মিনহাজ মোল্লা
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:২২:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৫
  • / ৮৮ বার পঠিত

“সে বিষ খায়নি, তাকে খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। খেয়েছে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা, সমাজের দুর্নীতি আর নেতাদের নীরবতা। তার মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড।”
— অজানা কৃষকের স্ত্রীর কণ্ঠে একটি কষ্টের কাহিনী


বাংলাদেশের কৃষি খাত — যে খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের খাদ্যনির্ভরতা, সেই খাতের মূল কারিগর কৃষক আজ সবচেয়ে অনিরাপদ, সবচেয়ে অবহেলিত এবং সবচেয়ে আত্মহত্যাপ্রবণ জনগোষ্ঠী। তার বীজ মরে যায়, তার ফসল দাম পায় না, তার মাথায় দেনার পাহাড় জমে। আর একদিন হঠাৎ খবর আসে—“একজন কৃষক গলায় দড়ি দিয়েছে” কিংবা “একজন বিষ খেয়ে মারা গেছে।” মিডিয়ার শিরোনামে হয়তো আসে একদিন, পরদিন অন্য কোনো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ রাজনীতি সেই খবর ঢেকে দেয়। কিন্তু আমরা কি বুঝি—এই মৃত্যু শুধু একজন কৃষকের মৃত্যু নয়, এটি একটি পরিবারের পতন, একটি সমাজের বিবেকহীনতা এবং একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার মুখোশ উন্মোচন?


আত্মহত্যার সংখ্যার পেছনের হাহাকার
সরকারি হিসেবে কৃষকের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান খুব সীমিত, কারণ এসব মৃত্যু ‘আত্মহত্যা’ বলেই দায় সারা হয়। বাস্তবে, ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০,০০০-এর বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন ঋণে জর্জরিত, ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ, অথবা দালাল-প্রশাসনের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত। একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৭-২০২৩ সময়কালে প্রতি বছর গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন — যার পেছনে মূলত দায়ী ঋণের চক্র, ফসলের দাম না পাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিপূরণ না পাওয়া এবং সরকারি বঞ্চনা।


কেস স্টাডি: এক জনৈক কৃষকের মৃত্যু – সংবাদপত্রে ৩ কলম, বাস্তবে ৩ সন্তানের অনাথ জীবন রফিকুল ইসলাম, বয়স ৪৩, নাটোরের এক ক্ষুদ্র কৃষক। মাত্র ২ একর জমিতে ধান চাষ করতেন। স্থানীয় এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন, আর পল্লী উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১৫ হাজার। ফসলের দাম কম, আর মহাজনের সুদের বোঝা এতটাই ভারি ছিল যে তিনি ঈদের ঠিক একদিন আগে বিষপানে আত্মহত্যা করেন।
পেছনে রেখে যান ৩ সন্তান আর স্ত্রী, যাঁরা এখন একটি আশ্রমে জীবিকার সন্ধানে। তার মৃত্যু নিয়ে সংবাদপত্রে ছোট্ট একটা রিপোর্ট আসে—
“ঋণের চাপে এক কৃষকের আত্মহত্যা” কিন্তু প্রশ্ন হলো—ঋণ কেন চাপ দিলো? কেন রাষ্ট্র তাকে রক্ষা করতে পারলো না? কেন সরকারি সহায়তা তার গায়ে লাগলো না? কারণ রাষ্ট্রের কাছে রফিক একজন ‘নাগরিক’ নয়, সে একটি পরিসংখ্যান মাত্র।


আত্মহত্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড
যখন:
• সরকারি ভর্তুকি পায় দালাল,
• ফসলের দাম নির্ধারণ হয় ব্যবসায়ীর টেবিলে,
• ক্ষতিপূরণ দেয়ার তালিকায় থাকে শুধু দলের লোক,
• কৃষকের অভিযোগ নেয় না থানার এসআই,
• আর মিডিয়াও মুখ ফিরিয়ে নেয়—
তখন সেই কৃষক মরলে তাকে ‘আত্মহত্যাকারী’ বলা কি ন্যায়সঙ্গত?
না। এটা আত্মহত্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড।
কেননা রাষ্ট্র নিজেই তাকে সেই প্রান্তে ঠেলে দেয়, যেখানে মৃত্যুই একমাত্র মুক্তি।


মিডিয়ার ভূমিকা: নীরবতা ও নিস্পৃহতা
কৃষকের আত্মহত্যা বড় মিডিয়া হেডলাইন হয় না, কারণ সেখানে নেই নাটকীয়তা, নেই ‘ভিউ বাড়ার’ গল্প। এক কৃষকের মরা মুখ, বিবর্ণ ঘর, বিধবা স্ত্রী—এসব ফ্রেমে যেন গণমাধ্যমের ক্যামেরা স্থির হতে চায় না। অথচ নেতার জন্মদিনের কেক কাটার ছবি হয় ১ম পাতার বড় শিরোনাম।
এই নীরবতা একধরনের পাপ। এটি সত্যকে লুকানোর চক্রান্ত।


রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া: ‘তদন্ত চলমান’, ‘ব্যক্তিগত বিষণ্নতা’, ‘বিষয়টি দুঃখজনক’ প্রতিবারের মতোই মন্ত্রীরা বলেন—“ব্যক্তিগত হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছে” কিন্তু কখনো তারা বলেন না— “আমরা দায়ী, আমরা কৃষকের কান্না শুনিনি, আমরা উন্নয়নের নামে তাকে মরতে দিয়েছি।”
কেন এই স্বীকারোক্তি আসে না? কারণ স্বীকারোক্তি মানেই ব্যবস্থা নিতে হবে। আর ব্যবস্থা মানেই সিন্ডিকেটে আঘাত, নেতাদের ফায়দায় ছেদ, দুর্নীতির রন্ধ্র বন্ধ করা—যা এই রাষ্ট্র চাইবে না।


করণীয়: কৃষকের জীবন মানেই দেশের জীবন
এই পর্বের শেষ কথায় বলা যায়—কৃষকের মৃত্যু মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এটি একটি জাতির আত্মহত্যা।
আমাদের করণীয় হলো:
১. কৃষকের জন্য রাষ্ট্রীয় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা
২. ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে আইন করা
৩. ঋণচক্র ও মহাজনি শোষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা
৪. কৃষকের আত্মহত্যার প্রতিটি ঘটনা তদন্তে আলাদা কমিশন গঠন

পর্ব-২ বীজ, সার ও কীটনাশকে অদৃশ্য লুটেরা চক্র
“তাদের হাতে বন্দুক নেই, আছে লাইসেন্স। তাদের গায়ে ইউনিফর্ম নেই, আছে টেন্ডার। তারা কৃষককে মারে গুলি দিয়ে নয়, লুট করে—বীজ, সার, আর কীটনাশকের নামে।” — এক সচেতন কৃষকের আর্তনাদ


কৃষক বীজ বপন করেন, আশা করেন ফসল ফলবে। কিন্তু তার হাতে যে বীজ, তা হয়তো নিষ্ক্রিয়; যে সারে গাছ বড় হবে, তা হয়তো মিশ্রিত; যে কীটনাশকে পোকা মরবে, তা হয়তো মাটির প্রাণ শেষ করে দেয়। কারণ এ দেশে বীজ, সার আর কীটনাশক নামে চলে অদৃশ্য এক চোরাচালান-সিন্ডিকেট—যা বৈধ লেবেলের আড়ালে অবৈধ ব্যবসা চালায়, আর কৃষকের ঘামকে রক্তে রূপান্তর করে । এখানে সবকিছুই মেকি: নকল সার, নষ্ট বীজ, বিষাক্ত কীটনাশক আর একটি মৌন রাষ্ট্র—যে দেখেও দেখে না।


বীজ: জীবনের শুরুতেই প্রতারণা
একটি বীজ ভালো না হলে, ফসল হয় না। কিন্তু কৃষকের হাতে যে বীজ আসে, তা অনেকসময় নিম্নমানের, নিষ্ক্রিয় অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ। সরকারি ডিলার কিংবা বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিরীক্ষাহীনভাবে বাজারে ছেড়ে দেয় কোটি কোটি টাকার ভুয়া বীজ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে: “প্রতিবছর দেশের প্রায় ২০% বীজ নিম্নমানের এবং এর দায় কোনো সংস্থাই স্বীকার করে না।”
বীজ-লুটের বৈধ পথ:
• অনুমোদনের নামে ঘুষ-নির্ভর নথিপত্র
• সরকারি প্রকল্পের নামে মজুদকৃত বীজ কালোবাজারে বিক্রি
• নির্বাচনী এলাকায় দলের লোকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ বিতরণ, অথচ প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত
• উচ্চফলনশীল হাইব্রিড বীজের নামে দুর্বল জাতের বীজ বাজারে ছাড়
এভাবে বীজ নয়, প্রতারনার বীজ রোপণ করা হয় প্রতিটি ক্ষেতে।


সার: পুষ্টির নামে বিষ
সার কৃষির জ্বালানী। কিন্তু এই জ্বালানীতেই মেশানো হয় সিন্ডিকেটের বিষ। কখনো তা কম দামে কৃষকের হাতে পৌঁছে না, কখনো তা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি হয়। ২০২৩ সালে সারের ঘাটতি দেখিয়ে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার কালোবাজারি হয়, অথচ সরকারি গুদামে সেই সার পড়ে থাকে ‘বন্টনের অপেক্ষায়’। বাস্তবে বন্টন হয় দলের নেতাদের মাধ্যমে, কৃষকের মাধ্যমে নয়।
সারের সিন্ডিকেট চক্র:
• টেন্ডার নিয়ে গুদাম দখল করে রাজনৈতিক ঠিকাদার
• আমদানি করা সার ভেজাল করে পুনরায় প্যাকিং করে বাজারজাত
• ট্রাকচালক-কৃষি অফিসার-ডিলার – সবাই কমিশনের খেলায় যুক্ত
এভাবেই কৃষকের মাঠে পুষ্টির পরিবর্তে ঢুকে পড়ে রোগ, আর ফলন কমে যায় প্রতিবছর।


কীটনাশক: বিষ শুধু পোকায় নয়, মাটিতেও
বাংলাদেশে ব্যবহৃত কীটনাশকের ৩০% এরও বেশি অবৈধ বা অস্বীকৃত। এগুলো শুধু পোকা নয়, মাটির জৈব উপাদান, পানি, এবং পরিবেশকেও ধ্বংস করে। অনেক সময় এগুলোর প্রভাবে ফসলই মারা যায়, ফলন হয় না । ২০২2 সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক রিপোর্টে বলা হয়:
“১০০টি নমুনা কীটনাশকের মধ্যে ৩৮টি ছিল মানহীন বা ভেজাল।” কিন্তু এই রিপোর্ট চাপা পড়ে যায়, কারণ এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ৪টি বড় কোম্পানি এবং কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা।


কৃষকের ঘরে আগুন, দোষ কোথায়?
একজন কৃষক যখন জানতে পারেন—তার ফসল ফললো না কারণ তার বীজ নিষ্ক্রিয় ছিল, তার সার ভেজাল ছিল, আর কীটনাশক ছিল বিষ—তখন সে আর প্রতিবাদ করে না। সে শুধু গুমরে কাঁদে, দেনা বাড়ায়, শেষে হয়তো নিজেই হারিয়ে যায় আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে।কিন্তু এই মৃত্যু কি কেবল তার? না—এটি একটি পদ্ধতিগত হত্যা। এটি লুটের ছক। একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অপারেশন, যার লক্ষ্য কৃষককে সর্বস্বান্ত করে কৃষিকে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া।


এ লুটের চক্র কারা চালায়?
• স্থানীয় ডিলার সিন্ডিকেট – যারা লুটের প্রথম স্তর
• রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল – যারা টেন্ডার ও গুদাম দখলে রাখে
• কৃষি দপ্তরের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারী – যারা অস্বীকৃত পণ্যে ছাড়পত্র দেয়
• বেসরকারি কোম্পানির দুর্নীতিপরায়ণ প্রতিনিধি – যারা কৃষকের সাথে ছলনা করে
তারা সবাই জানে—বীজ ভালো হলে কৃষক স্বাধীন হয়, আর দুর্বল বীজ দিয়ে কৃষিকে পরাধীন করা যায়।


খাদ্য নিরাপত্তা নেই, আছে কর্পোরেট নিরাপত্তা
যতই বলা হোক খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি, বাস্তবে আমরা বীজ, সার ও কীটনাশকে নির্ভরশীল হয়ে গেছি বহুজাতিক কোম্পানির উপর। এই বহুজাতিকদের হয়ে কাজ করছে দেশের ভেতরের লুটেরা চক্র। এরা চায় না কৃষক স্বাধীন হোক, কারণ স্বাধীন কৃষক মানেই কর্পোরেট দেউলিয়া।


সমাধান নয়, চাই প্রতিরোধ
আমরা শুধু সমাধান চাই না, চাই প্রতিরোধ। এই লুটেরা চক্র ভাঙতে হলে চাই:
১. প্রতিটি বীজ, সার ও কীটনাশকের গুণগত মান যাচাইয়ে স্বাধীন ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান
২. কালোবাজার ও ভেজালের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
৩. কৃষককে সরাসরি উপকরণ সরবরাহ, ডিলারমুক্ত পদ্ধতি
৪. গোপন রিপোর্ট ও পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আনা
৫. বীজের ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ ভাঙা এবং স্থানীয় জাতের বীজ উন্নয়ন


উপসংহার
“বীজে যদি থাকে বিশ্বাসঘাতকতা, তাহলে ফসল নয়, জন্ম নেয় প্রতারণা। কৃষক যে ফসল তুলে আনে, সেটি তখন খাদ্য নয়, প্রতিবাদ।”
যতদিন না আমরা কৃষকের কান্নাকে রাষ্ট্রের কান্না বলে মেনে নেব, ততদিন প্রতিটি আত্মহত্যার দায় আমাদের সকলের। এটি সময়ের দাবি নয়, এটি নৈতিক দাবি। একজন কৃষক যেন আর বিষ না খায়। গলায় দড়ি না দেয়। তার হাতে থাকুক বীজ, বুকে থাকুক আশা।

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

কৃষকের আত্মহত্যা – রাষ্ট্রের গোপন হত্যাকাণ্ড

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:২২:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৫

“সে বিষ খায়নি, তাকে খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। খেয়েছে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা, সমাজের দুর্নীতি আর নেতাদের নীরবতা। তার মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড।”
— অজানা কৃষকের স্ত্রীর কণ্ঠে একটি কষ্টের কাহিনী


বাংলাদেশের কৃষি খাত — যে খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের খাদ্যনির্ভরতা, সেই খাতের মূল কারিগর কৃষক আজ সবচেয়ে অনিরাপদ, সবচেয়ে অবহেলিত এবং সবচেয়ে আত্মহত্যাপ্রবণ জনগোষ্ঠী। তার বীজ মরে যায়, তার ফসল দাম পায় না, তার মাথায় দেনার পাহাড় জমে। আর একদিন হঠাৎ খবর আসে—“একজন কৃষক গলায় দড়ি দিয়েছে” কিংবা “একজন বিষ খেয়ে মারা গেছে।” মিডিয়ার শিরোনামে হয়তো আসে একদিন, পরদিন অন্য কোনো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ রাজনীতি সেই খবর ঢেকে দেয়। কিন্তু আমরা কি বুঝি—এই মৃত্যু শুধু একজন কৃষকের মৃত্যু নয়, এটি একটি পরিবারের পতন, একটি সমাজের বিবেকহীনতা এবং একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার মুখোশ উন্মোচন?


আত্মহত্যার সংখ্যার পেছনের হাহাকার
সরকারি হিসেবে কৃষকের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান খুব সীমিত, কারণ এসব মৃত্যু ‘আত্মহত্যা’ বলেই দায় সারা হয়। বাস্তবে, ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০,০০০-এর বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন ঋণে জর্জরিত, ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ, অথবা দালাল-প্রশাসনের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত। একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৭-২০২৩ সময়কালে প্রতি বছর গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন — যার পেছনে মূলত দায়ী ঋণের চক্র, ফসলের দাম না পাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিপূরণ না পাওয়া এবং সরকারি বঞ্চনা।


কেস স্টাডি: এক জনৈক কৃষকের মৃত্যু – সংবাদপত্রে ৩ কলম, বাস্তবে ৩ সন্তানের অনাথ জীবন রফিকুল ইসলাম, বয়স ৪৩, নাটোরের এক ক্ষুদ্র কৃষক। মাত্র ২ একর জমিতে ধান চাষ করতেন। স্থানীয় এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন, আর পল্লী উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১৫ হাজার। ফসলের দাম কম, আর মহাজনের সুদের বোঝা এতটাই ভারি ছিল যে তিনি ঈদের ঠিক একদিন আগে বিষপানে আত্মহত্যা করেন।
পেছনে রেখে যান ৩ সন্তান আর স্ত্রী, যাঁরা এখন একটি আশ্রমে জীবিকার সন্ধানে। তার মৃত্যু নিয়ে সংবাদপত্রে ছোট্ট একটা রিপোর্ট আসে—
“ঋণের চাপে এক কৃষকের আত্মহত্যা” কিন্তু প্রশ্ন হলো—ঋণ কেন চাপ দিলো? কেন রাষ্ট্র তাকে রক্ষা করতে পারলো না? কেন সরকারি সহায়তা তার গায়ে লাগলো না? কারণ রাষ্ট্রের কাছে রফিক একজন ‘নাগরিক’ নয়, সে একটি পরিসংখ্যান মাত্র।


আত্মহত্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড
যখন:
• সরকারি ভর্তুকি পায় দালাল,
• ফসলের দাম নির্ধারণ হয় ব্যবসায়ীর টেবিলে,
• ক্ষতিপূরণ দেয়ার তালিকায় থাকে শুধু দলের লোক,
• কৃষকের অভিযোগ নেয় না থানার এসআই,
• আর মিডিয়াও মুখ ফিরিয়ে নেয়—
তখন সেই কৃষক মরলে তাকে ‘আত্মহত্যাকারী’ বলা কি ন্যায়সঙ্গত?
না। এটা আত্মহত্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড।
কেননা রাষ্ট্র নিজেই তাকে সেই প্রান্তে ঠেলে দেয়, যেখানে মৃত্যুই একমাত্র মুক্তি।


মিডিয়ার ভূমিকা: নীরবতা ও নিস্পৃহতা
কৃষকের আত্মহত্যা বড় মিডিয়া হেডলাইন হয় না, কারণ সেখানে নেই নাটকীয়তা, নেই ‘ভিউ বাড়ার’ গল্প। এক কৃষকের মরা মুখ, বিবর্ণ ঘর, বিধবা স্ত্রী—এসব ফ্রেমে যেন গণমাধ্যমের ক্যামেরা স্থির হতে চায় না। অথচ নেতার জন্মদিনের কেক কাটার ছবি হয় ১ম পাতার বড় শিরোনাম।
এই নীরবতা একধরনের পাপ। এটি সত্যকে লুকানোর চক্রান্ত।


রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া: ‘তদন্ত চলমান’, ‘ব্যক্তিগত বিষণ্নতা’, ‘বিষয়টি দুঃখজনক’ প্রতিবারের মতোই মন্ত্রীরা বলেন—“ব্যক্তিগত হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছে” কিন্তু কখনো তারা বলেন না— “আমরা দায়ী, আমরা কৃষকের কান্না শুনিনি, আমরা উন্নয়নের নামে তাকে মরতে দিয়েছি।”
কেন এই স্বীকারোক্তি আসে না? কারণ স্বীকারোক্তি মানেই ব্যবস্থা নিতে হবে। আর ব্যবস্থা মানেই সিন্ডিকেটে আঘাত, নেতাদের ফায়দায় ছেদ, দুর্নীতির রন্ধ্র বন্ধ করা—যা এই রাষ্ট্র চাইবে না।


করণীয়: কৃষকের জীবন মানেই দেশের জীবন
এই পর্বের শেষ কথায় বলা যায়—কৃষকের মৃত্যু মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এটি একটি জাতির আত্মহত্যা।
আমাদের করণীয় হলো:
১. কৃষকের জন্য রাষ্ট্রীয় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা
২. ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে আইন করা
৩. ঋণচক্র ও মহাজনি শোষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা
৪. কৃষকের আত্মহত্যার প্রতিটি ঘটনা তদন্তে আলাদা কমিশন গঠন

পর্ব-২ বীজ, সার ও কীটনাশকে অদৃশ্য লুটেরা চক্র
“তাদের হাতে বন্দুক নেই, আছে লাইসেন্স। তাদের গায়ে ইউনিফর্ম নেই, আছে টেন্ডার। তারা কৃষককে মারে গুলি দিয়ে নয়, লুট করে—বীজ, সার, আর কীটনাশকের নামে।” — এক সচেতন কৃষকের আর্তনাদ


কৃষক বীজ বপন করেন, আশা করেন ফসল ফলবে। কিন্তু তার হাতে যে বীজ, তা হয়তো নিষ্ক্রিয়; যে সারে গাছ বড় হবে, তা হয়তো মিশ্রিত; যে কীটনাশকে পোকা মরবে, তা হয়তো মাটির প্রাণ শেষ করে দেয়। কারণ এ দেশে বীজ, সার আর কীটনাশক নামে চলে অদৃশ্য এক চোরাচালান-সিন্ডিকেট—যা বৈধ লেবেলের আড়ালে অবৈধ ব্যবসা চালায়, আর কৃষকের ঘামকে রক্তে রূপান্তর করে । এখানে সবকিছুই মেকি: নকল সার, নষ্ট বীজ, বিষাক্ত কীটনাশক আর একটি মৌন রাষ্ট্র—যে দেখেও দেখে না।


বীজ: জীবনের শুরুতেই প্রতারণা
একটি বীজ ভালো না হলে, ফসল হয় না। কিন্তু কৃষকের হাতে যে বীজ আসে, তা অনেকসময় নিম্নমানের, নিষ্ক্রিয় অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ। সরকারি ডিলার কিংবা বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিরীক্ষাহীনভাবে বাজারে ছেড়ে দেয় কোটি কোটি টাকার ভুয়া বীজ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে: “প্রতিবছর দেশের প্রায় ২০% বীজ নিম্নমানের এবং এর দায় কোনো সংস্থাই স্বীকার করে না।”
বীজ-লুটের বৈধ পথ:
• অনুমোদনের নামে ঘুষ-নির্ভর নথিপত্র
• সরকারি প্রকল্পের নামে মজুদকৃত বীজ কালোবাজারে বিক্রি
• নির্বাচনী এলাকায় দলের লোকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ বিতরণ, অথচ প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত
• উচ্চফলনশীল হাইব্রিড বীজের নামে দুর্বল জাতের বীজ বাজারে ছাড়
এভাবে বীজ নয়, প্রতারনার বীজ রোপণ করা হয় প্রতিটি ক্ষেতে।


সার: পুষ্টির নামে বিষ
সার কৃষির জ্বালানী। কিন্তু এই জ্বালানীতেই মেশানো হয় সিন্ডিকেটের বিষ। কখনো তা কম দামে কৃষকের হাতে পৌঁছে না, কখনো তা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি হয়। ২০২৩ সালে সারের ঘাটতি দেখিয়ে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার কালোবাজারি হয়, অথচ সরকারি গুদামে সেই সার পড়ে থাকে ‘বন্টনের অপেক্ষায়’। বাস্তবে বন্টন হয় দলের নেতাদের মাধ্যমে, কৃষকের মাধ্যমে নয়।
সারের সিন্ডিকেট চক্র:
• টেন্ডার নিয়ে গুদাম দখল করে রাজনৈতিক ঠিকাদার
• আমদানি করা সার ভেজাল করে পুনরায় প্যাকিং করে বাজারজাত
• ট্রাকচালক-কৃষি অফিসার-ডিলার – সবাই কমিশনের খেলায় যুক্ত
এভাবেই কৃষকের মাঠে পুষ্টির পরিবর্তে ঢুকে পড়ে রোগ, আর ফলন কমে যায় প্রতিবছর।


কীটনাশক: বিষ শুধু পোকায় নয়, মাটিতেও
বাংলাদেশে ব্যবহৃত কীটনাশকের ৩০% এরও বেশি অবৈধ বা অস্বীকৃত। এগুলো শুধু পোকা নয়, মাটির জৈব উপাদান, পানি, এবং পরিবেশকেও ধ্বংস করে। অনেক সময় এগুলোর প্রভাবে ফসলই মারা যায়, ফলন হয় না । ২০২2 সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক রিপোর্টে বলা হয়:
“১০০টি নমুনা কীটনাশকের মধ্যে ৩৮টি ছিল মানহীন বা ভেজাল।” কিন্তু এই রিপোর্ট চাপা পড়ে যায়, কারণ এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ৪টি বড় কোম্পানি এবং কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা।


কৃষকের ঘরে আগুন, দোষ কোথায়?
একজন কৃষক যখন জানতে পারেন—তার ফসল ফললো না কারণ তার বীজ নিষ্ক্রিয় ছিল, তার সার ভেজাল ছিল, আর কীটনাশক ছিল বিষ—তখন সে আর প্রতিবাদ করে না। সে শুধু গুমরে কাঁদে, দেনা বাড়ায়, শেষে হয়তো নিজেই হারিয়ে যায় আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে।কিন্তু এই মৃত্যু কি কেবল তার? না—এটি একটি পদ্ধতিগত হত্যা। এটি লুটের ছক। একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অপারেশন, যার লক্ষ্য কৃষককে সর্বস্বান্ত করে কৃষিকে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া।


এ লুটের চক্র কারা চালায়?
• স্থানীয় ডিলার সিন্ডিকেট – যারা লুটের প্রথম স্তর
• রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল – যারা টেন্ডার ও গুদাম দখলে রাখে
• কৃষি দপ্তরের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারী – যারা অস্বীকৃত পণ্যে ছাড়পত্র দেয়
• বেসরকারি কোম্পানির দুর্নীতিপরায়ণ প্রতিনিধি – যারা কৃষকের সাথে ছলনা করে
তারা সবাই জানে—বীজ ভালো হলে কৃষক স্বাধীন হয়, আর দুর্বল বীজ দিয়ে কৃষিকে পরাধীন করা যায়।


খাদ্য নিরাপত্তা নেই, আছে কর্পোরেট নিরাপত্তা
যতই বলা হোক খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি, বাস্তবে আমরা বীজ, সার ও কীটনাশকে নির্ভরশীল হয়ে গেছি বহুজাতিক কোম্পানির উপর। এই বহুজাতিকদের হয়ে কাজ করছে দেশের ভেতরের লুটেরা চক্র। এরা চায় না কৃষক স্বাধীন হোক, কারণ স্বাধীন কৃষক মানেই কর্পোরেট দেউলিয়া।


সমাধান নয়, চাই প্রতিরোধ
আমরা শুধু সমাধান চাই না, চাই প্রতিরোধ। এই লুটেরা চক্র ভাঙতে হলে চাই:
১. প্রতিটি বীজ, সার ও কীটনাশকের গুণগত মান যাচাইয়ে স্বাধীন ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান
২. কালোবাজার ও ভেজালের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
৩. কৃষককে সরাসরি উপকরণ সরবরাহ, ডিলারমুক্ত পদ্ধতি
৪. গোপন রিপোর্ট ও পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আনা
৫. বীজের ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ ভাঙা এবং স্থানীয় জাতের বীজ উন্নয়ন


উপসংহার
“বীজে যদি থাকে বিশ্বাসঘাতকতা, তাহলে ফসল নয়, জন্ম নেয় প্রতারণা। কৃষক যে ফসল তুলে আনে, সেটি তখন খাদ্য নয়, প্রতিবাদ।”
যতদিন না আমরা কৃষকের কান্নাকে রাষ্ট্রের কান্না বলে মেনে নেব, ততদিন প্রতিটি আত্মহত্যার দায় আমাদের সকলের। এটি সময়ের দাবি নয়, এটি নৈতিক দাবি। একজন কৃষক যেন আর বিষ না খায়। গলায় দড়ি না দেয়। তার হাতে থাকুক বীজ, বুকে থাকুক আশা।