ঢাকা, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220

গৌরীপুরে ঐতিহাসিক ঝলমল সিনেমা হলে ভয়াবহ আগুন

হলি সিয়াম শ্রাবণ, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ):    ময়মনসিংহের গৌরীপুরে জমিদার আমলে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন নাট্যমঞ্চ বর্তমানে ঝলমল সিনেমা হলটি আগুনে পুড়ে গেছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিনগত রাত সোয়া ২টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
অগ্নিকাণ্ডে সিনেমা হলের ভবনে পরিচালিত বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল পুড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সিনেমা হলটিতে গ্যাস সিলিন্ডারের একটি গোডাউন ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ থেকেই ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, সরকারিভাবে লিজ দেওয়া এ সিনেমা হলটিতে প্রায় ২০ বছর ধরে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ রয়েছে। সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ হওয়ার পর থেকে এখানে বিভিন্ন মালামালের গোডাউনসহ নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে আসছিল।
তানভীর এলপিজি স্টোরের মালিক তানভীর আহমেদ জানান, সিনেমা হলের একটি অংশ ভাড়া নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে তিনি সেটি গ্যাস সিলিন্ডারের গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করছেন। ঘটনার দিন রাতে ২৫০টি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডারের একটি চালান আসে। আগুনে গোডাউনে রাখা সব গ্যাস সিলিন্ডার পুড়ে গেছে। এতে তার প্রায় ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ফার্নিচার কারখানার মালিক ভুট্টো জানান, আগুনে তার এক কোটি টাকার বেশি মূল্যের কাঠ, নির্মাণাধীন আসবাবপত্র ও মেশিনারিজ মালামাল পুড়ে গেছে।
লাইটিং ডেকোরেটর ব্যবসায়ী বকুল ইসলাম জানান, আগুনে তার বেশ কয়েকটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরসহ অন্যান্য মালামাল পুড়ে গেছে।
ড্রাইভার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. মজনু মিয়া জানান, সিনেমা হলের মূল ভবনের সামনে তাদের কার্যালয়। আগুনে কার্যালয়টি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এতে তাদের প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
গৌরীপুর ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ মো. খবিরুল আলম জানান, খবর পেয়ে গৌরীপুর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রথমে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে ঈশ্বরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দুটি ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইউনিট এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয়। প্রায় তিন ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও সকালের দিকে ভবনের ভেতরের ফার্নিচার কারখানায় আবারও আগুন জ্বলতে দেখা যায়। পরে গৌরীপুর ফায়ার সার্ভিস এসে তা নিয়ন্ত্রণ করে।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস সিলিন্ডারের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
গৌরীপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ বি এম কাউসার জামান জানান, ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হলটি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। সিনেমা হল পরিচালনার জন্য সরকার এটি লিজ দিয়েছিল। বর্তমানে কারা কোন অবস্থায় এটি ব্যবহার করছে এবং আগুনে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফিয়া আমিন পাপ্পা জানান, সিনেমা হলটি স্থানীয় ১৬ জন ব্যক্তি বাণিজ্যিকভাবে লিজ নিয়ে পরিচালনা করে আসছেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এখানে দাহ্য পদার্থ গ্যাস সিলিন্ডার রাখার বিষয়ে লিজগ্রহীতাদের শোকজ করা হবে।
সিনেমা হলের লিজগ্রহীতাদের একজন অংশীদার স্থানীয় আলী আকরাম রুমি চৌধুরী জানান, তাদের পরিবারের ১৬ জন মিলে ১৯৭৬ সালে এ সিনেমা হলটি সরকারিভাবে বাণিজ্যিক লিজ নিয়ে সিনেমা প্রদর্শন করে আসছিলেন। পরবর্তীতে সিনেমার দর্শক কমে যাওয়ায় লোকসানের কবলে পড়ে ২০০৬ সালে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করে দেন। দীর্ঘদিন হল বন্ধ থাকার পর সিনেমা হলের জায়গার কিছু অংশ স্থানীয় ১৬ জন ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দেওয়া হয়।
স্থানীয় ইতিহাস গবেষকদের মতে, ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর রাজবাড়ীর পঞ্চম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর একমাত্র ছেলে সঙ্গীত ও নাট্যপ্রীতিতে অনন্য ব্যক্তিত্ব বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে এ অনন্য নাট্যমঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেন।
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী স্টার থিয়েটারের স্থাপত্য ও কাঠামোর আদলে তিনি গৌরীপুরে এ অনিন্দ্যসুন্দর থিয়েটার হলটি গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠার পর এ মঞ্চে ঐতিহাসিক ‘শাহজাহান’ নাটকটি উদ্বোধনী বা প্রথম নাটক হিসেবে মঞ্চস্থ হয়ে জননন্দিত হয়েছিল। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পী ও গুণীজনদের পদচারণায় একসময় এ নাট্যমঞ্চটি মুখরিত থাকত।
পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে সরকারের মালিকানায় হস্তান্তর হওয়ার পর এ নাট্যমঞ্চটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য লিজ বা ভাড়া দেওয়া হয়। প্রথম দিকে এটি ‘গিরি সিনেমা হল’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রতিমা সিনেমা হল’। সর্বশেষে এটি ‘ঝলমল সিনেমা হল’ নামে পরিচিতি পায়।

Share this news as a Photo Card

12 October 2026

দুপচাঁচিয়ায় ট্যাপেন্টাডল-সহ রনি নামের মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

বিস্তারিত লিংক কমেন্টে |
nagorikbhabna.com
nagorikbhabna

গৌরীপুরে ঐতিহাসিক ঝলমল সিনেমা হলে ভয়াবহ আগুন

সর্বশেষ পরিমার্জন : ০৪:২৮:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
হলি সিয়াম শ্রাবণ, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ):    ময়মনসিংহের গৌরীপুরে জমিদার আমলে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন নাট্যমঞ্চ বর্তমানে ঝলমল সিনেমা হলটি আগুনে পুড়ে গেছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিনগত রাত সোয়া ২টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
অগ্নিকাণ্ডে সিনেমা হলের ভবনে পরিচালিত বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল পুড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সিনেমা হলটিতে গ্যাস সিলিন্ডারের একটি গোডাউন ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ থেকেই ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, সরকারিভাবে লিজ দেওয়া এ সিনেমা হলটিতে প্রায় ২০ বছর ধরে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ রয়েছে। সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ হওয়ার পর থেকে এখানে বিভিন্ন মালামালের গোডাউনসহ নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে আসছিল।
তানভীর এলপিজি স্টোরের মালিক তানভীর আহমেদ জানান, সিনেমা হলের একটি অংশ ভাড়া নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে তিনি সেটি গ্যাস সিলিন্ডারের গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করছেন। ঘটনার দিন রাতে ২৫০টি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডারের একটি চালান আসে। আগুনে গোডাউনে রাখা সব গ্যাস সিলিন্ডার পুড়ে গেছে। এতে তার প্রায় ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ফার্নিচার কারখানার মালিক ভুট্টো জানান, আগুনে তার এক কোটি টাকার বেশি মূল্যের কাঠ, নির্মাণাধীন আসবাবপত্র ও মেশিনারিজ মালামাল পুড়ে গেছে।
লাইটিং ডেকোরেটর ব্যবসায়ী বকুল ইসলাম জানান, আগুনে তার বেশ কয়েকটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরসহ অন্যান্য মালামাল পুড়ে গেছে।
ড্রাইভার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. মজনু মিয়া জানান, সিনেমা হলের মূল ভবনের সামনে তাদের কার্যালয়। আগুনে কার্যালয়টি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এতে তাদের প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
গৌরীপুর ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ মো. খবিরুল আলম জানান, খবর পেয়ে গৌরীপুর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রথমে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে ঈশ্বরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দুটি ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইউনিট এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয়। প্রায় তিন ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও সকালের দিকে ভবনের ভেতরের ফার্নিচার কারখানায় আবারও আগুন জ্বলতে দেখা যায়। পরে গৌরীপুর ফায়ার সার্ভিস এসে তা নিয়ন্ত্রণ করে।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস সিলিন্ডারের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
গৌরীপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ বি এম কাউসার জামান জানান, ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হলটি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। সিনেমা হল পরিচালনার জন্য সরকার এটি লিজ দিয়েছিল। বর্তমানে কারা কোন অবস্থায় এটি ব্যবহার করছে এবং আগুনে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফিয়া আমিন পাপ্পা জানান, সিনেমা হলটি স্থানীয় ১৬ জন ব্যক্তি বাণিজ্যিকভাবে লিজ নিয়ে পরিচালনা করে আসছেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এখানে দাহ্য পদার্থ গ্যাস সিলিন্ডার রাখার বিষয়ে লিজগ্রহীতাদের শোকজ করা হবে।
সিনেমা হলের লিজগ্রহীতাদের একজন অংশীদার স্থানীয় আলী আকরাম রুমি চৌধুরী জানান, তাদের পরিবারের ১৬ জন মিলে ১৯৭৬ সালে এ সিনেমা হলটি সরকারিভাবে বাণিজ্যিক লিজ নিয়ে সিনেমা প্রদর্শন করে আসছিলেন। পরবর্তীতে সিনেমার দর্শক কমে যাওয়ায় লোকসানের কবলে পড়ে ২০০৬ সালে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করে দেন। দীর্ঘদিন হল বন্ধ থাকার পর সিনেমা হলের জায়গার কিছু অংশ স্থানীয় ১৬ জন ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দেওয়া হয়।
স্থানীয় ইতিহাস গবেষকদের মতে, ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর রাজবাড়ীর পঞ্চম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর একমাত্র ছেলে সঙ্গীত ও নাট্যপ্রীতিতে অনন্য ব্যক্তিত্ব বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে এ অনন্য নাট্যমঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেন।
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী স্টার থিয়েটারের স্থাপত্য ও কাঠামোর আদলে তিনি গৌরীপুরে এ অনিন্দ্যসুন্দর থিয়েটার হলটি গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠার পর এ মঞ্চে ঐতিহাসিক ‘শাহজাহান’ নাটকটি উদ্বোধনী বা প্রথম নাটক হিসেবে মঞ্চস্থ হয়ে জননন্দিত হয়েছিল। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পী ও গুণীজনদের পদচারণায় একসময় এ নাট্যমঞ্চটি মুখরিত থাকত।
পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে সরকারের মালিকানায় হস্তান্তর হওয়ার পর এ নাট্যমঞ্চটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য লিজ বা ভাড়া দেওয়া হয়। প্রথম দিকে এটি ‘গিরি সিনেমা হল’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রতিমা সিনেমা হল’। সর্বশেষে এটি ‘ঝলমল সিনেমা হল’ নামে পরিচিতি পায়।

Share this news as a Photo Card