চট্টগ্রাম ১৫ জনতার ভোটে আস্থার উজ্জ্বলতা

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ১১:৪৯:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১৯ বার পঠিত

মুন্সি শাহাব উদ্দীন, চট্টগ্রাম: গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চট্টগ্রাম ১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসন জুড়ে ছিল এক অনন্য আবহ। ভোরের শিশিরভেজা প্রভাতে যখন সূর্যের প্রথম আলো গ্রামবাংলার পথঘাট ছুঁয়ে যায়, তখনই দুই উপজেলার নানা প্রান্ত থেকে নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ সবাই ছুটে যান ভোটকেন্দ্রের দিকে। ছিল না কোনো আতঙ্কের ছায়া, ছিল না ভীতসন্ত্রস্ত অপেক্ষা। বরং ছিল দায়িত্ববোধ, ছিল নাগরিক অধিকার প্রয়োগের এক গর্বিত প্রত্যয়।
এই আসনে লোহাগাড়ায় ৬৭টি এবং সাতকানিয়ায় ৯০টি মোট ১৫৭টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, শৃঙ্খলাবদ্ধ সারি, আর ভোটারদের মুখে শান্ত হাসি। অতীতের কিছু নির্বাচনে সহিংসতার তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকলেও এবারের নির্বাচন যেন সেই স্মৃতিকে মুছে দিয়ে নতুন এক ইতিহাস রচনা করেছে।
প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী এবং হাতপাখা প্রতীকের আরেক প্রার্থী। তবে ভোটের মাঠে মূল লড়াই গড়ে ওঠে দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষ প্রতীকের মধ্যে। ছিল টানটান উত্তেজনা, ছিল প্রত্যাশা আর প্রতীক্ষার মিশ্র অনুভূতি।
ভোট গণনা শেষে ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিনকে ৪৫,০৩৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন। এ বিজয়কে অনেকেই দেখছেন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে।
তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। সরেজমিনে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। কোথাও ছিল না বিশৃঙ্খলার দৃশ্য, ছিল না অপ্রীতিকর সংঘাতের খবর।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান ও কার্যকর উপস্থিতি ছিল ভোটের মাঠে আস্থার মূল ভিত্তি। কেন্দ্রের আশপাশে কোনো ধরনের অযাচিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে তা নিয়ন্ত্রণে নেয়। ফলে ভোটারদের মনে জন্ম নেয় নিরাপত্তা ও সাহসের এক দৃঢ় অনুভব। অনেক ভোটার বলেন, “সেনাবাহিনী না থাকলে হয়তো আমরা ভয় পেতাম। তাদের উপস্থিতি আমাদের মনে শক্তি জুগিয়েছে, তাই নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পেরেছি।”
লোহাগাড়ার বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক অধ্যাপক ডাক্তার কামাল উদ্দীন জানান, “আমি সকালে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়ে এসেছি। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরপেক্ষ।”
নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মাঝে ছিল সহনশীলতা ও সংযমের পরিচয়। এটি প্রমাণ করে, জনগণ এখন সহিংসতার পথ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক চর্চায় বিশ্বাসী।
সবমিলিয়ে বলা যায়, চট্টগ্রাম–১৫ আসনের এবারের নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং ছিল গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের গভীর আস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শান্তির জনপদ সাতকানিয়া–লোহাগাড়া ভোটের দিন যেমন স্থির ও সুশৃঙ্খল ছিল, তেমনি ভোট-পরবর্তী সময়েও রয়েছে প্রশান্ত ও নির্ভার। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। এই শান্তি, এই সৌহার্দ্য এবং এই গণতান্ত্রিক চর্চা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, আর তাদের প্রিয় জনপদ হয়ে উঠবে উন্নয়ন ও সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।


















