চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮০ শতাংশ আম গাছে মুকুল: পরিচর্যায় ব্যস্ত চাষিরা

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:১৮:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ৬০ বার পঠিত

আব্দুল বারী, বিশেষ প্রতিনিধি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ: আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের সর্বত্রই এখন মুকুলের মৌ মৌ গন্ধ। এ বছর একটু আগেই আসতে শুরু করে মুকুল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় খুব দ্রুত মুকুলিত হয়েছে বেশিরভাগ গাছ।
চাষিরা বলছেন, এখন পর্যন্ত মুকুলের অবস্থা বেশ ভালো। তারা জানান, এ বছর মাঘ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই মুকুল আসতে শুরু করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানগুলোতে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এখন মুকুলে মুকুলে ছেয়ে গেছে বেশিরভাগ গাছ। এখন তারা মুকুল রক্ষায় বাগানে পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।অনুকূল আবহাওয়ার কারণে জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ গাছে ইতোমধ্যে মুকুল দেখা গেছে। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত এমন আবহাওয়া বজায় থাকলে প্রায় সব গাছই মুকুলে ছেয়ে যাবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। সম্ভাব্য ভালো ফলনের প্রত্যাশায় বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন আমচাষিরা।
শীতের শেষ আর বসন্তের শুরুতেই জেলার বিস্তীর্ণ আমবাগানগুলো হলুদ মুকুলে সেজে উঠেছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার অনুকূল সমন্বয়ের কারণে এবার মুকুল আসার হার সন্তোষজনক। মৌসুমের শুরুতেই এমন ইতিবাচক চিত্রে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা। তবে শেষ পর্যন্ত ফলন নির্ভর করবে আবহাওয়ার ধারাবাহিকতা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ঝড়বৃষ্টি পরিস্থিতির ওপর। এ জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আম। এখানে ফজলি, খিরসাপাত, গোপালভোগ, ল্যাংড়াসহ দেড় শতাধিক জাতের সুস্বাদু আম উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয় এ অঞ্চলের আম। বিশেষ করে মৌসুমে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ব্যাপক চাহিদা থাকে, ফলে জেলার অর্থনীতিতে আমের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত বছর ফলন ভালো হলেও পাকার মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক আম নষ্ট হয়ে যায়। এতে দাম কমে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই লোকসান গুনেছেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাগান পরিচর্যায় বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। নিয়মিত সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগ-পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করছেন চাষিরা।
তবে এ বছর পরিচর্যার খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিকরা। সার, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরির দাম আগের তুলনায় বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
চাষিদের দাবি, প্রণোদনা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে তারা আরও উৎসাহ নিয়ে উৎপাদনে মন দিতে পারবেন।
জেলার টিকরামপুর এলাকার আমচাষি আব্দুল মতিন বলেন, “এ বছর মুকুল আসার জন্য আবহাওয়া মৌসুমের শুরু থেকেই ভালো আছে। দিনের বেলায় যে তাপমাত্রা দরকার, রোদের মাধ্যমে সেটি পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে গাছে গাছে অনেক মুকুল এসেছে। এই রকম আবহাওয়া আরও ১০ দিন থাকলে আরও ভালো পরিমাণে মুকুল আসবে।”
তিনি বলেন, “গত বছর মুকুল ভালো হলেও বাজারজাতের সময় টানা বৃষ্টিতে আম নষ্ট হয়ে যায়। দাম না পাওয়ায় অনেক চাষি আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। এ বছর ভালো মুকুল আর ভালো ফলনের আশাতেই সবাই বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত।”
আরামবাগ এলাকার আমচাষি মুকুল হোসেন বলেন, “আম চাষে আমাদের প্রচুর খরচ হয়। সার, কীটনাশক, পানি ও শ্রমিক সবকিছুতেই খরচ বাড়ছে। অথচ ধান, গম বা পাটের মতো অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে কৃষকরা সরকারি প্রণোদনা পেলেও আমচাষিরা তা পান না। সরকার যদি আমচাষিদের জন্যও প্রণোদনা দেয়, তাহলে আমরা আরও উৎসাহ নিয়ে উৎপাদনে মন দিতে পারব।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক ড. ইয়াছিন আলী জানান, অনুকূল আবহাওয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত মুকুল আসার সময় রয়েছে। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ব্যাপক মুকুলের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
তিনি জানান, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করা হচ্ছে এবং চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম গাছ রয়েছে প্রায় ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৬৫টি। আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ টন।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অনেক বাগানে ইতোমধ্যে মুকুল রক্ষায় ছত্রাকনাশক ও বালাইনাশক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি মৌমাছির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে পরাগায়ন ভালো হয় এবং ফলের গুটি বেশি ধরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুকুল আসার পরবর্তী সময়টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত কুয়াশা, অকালবৃষ্টি বা তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তনে মুকুল ঝরে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে মৌসুমের শুরুতেই মুকুলে ছেয়ে যাওয়া আমবাগান চাঁপাইনবাবগঞ্জে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। গত বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং ন্যায্য দাম পেতে চাষিরা এখন অনুকূল আবহাওয়া ও সহায়ক বাজার ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে আছেন। আবহাওয়া সহায়ক থাকলে এ বছরও আমের রাজধানীর বাগানগুলো সোনালি ফলনে ভরে উঠবে, এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।

















