
শেখ রিফান আহমেদ ॥ মানুষের শরীর অসুস্থ হলে আমরা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু মন দীর্ঘদিন ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন, বিষণ্ন বা বিপর্যস্ত থাকলে অনেক সময় তাকে ‘সহ্য করে যাওয়ার’ পরামর্শ দেওয়া হয়। এই সামাজিক দ্বৈততা মানসিক স্বাস্থ্যকে দীর্ঘদিন আড়ালে রেখেছে। ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানসিক স্বাস্থ্যও স্বাস্থ্যেরই অংশ, এবং মানসিক সমস্যায় থাকা মানুষকে বিচার নয়, প্রয়োজন সহায়তা ও সম্মান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের দিবসের মূল বার্তা ‘Lived experiences heard: real voices, real change’—অর্থাৎ মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা যাঁরা নিজেরা বহন করেন, তাঁদের কণ্ঠকে শুধু শোনা নয়, সেবা ও নীতিনির্ধারণে অর্থবহভাবে যুক্ত করা। এই বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা অনেক সময় বিশেষজ্ঞের বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ রোগী বা সেবা-গ্রহীতার বাস্তব অভিজ্ঞতা জানলে সেবাব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আরও পরিষ্কার হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তিনটি সমস্যা বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে—সচেতনতার ঘাটতি, সামাজিক কলঙ্ক এবং সহজলভ্য সেবার প্রয়োজন। পরিবারে কেউ মানসিক সমস্যার কথা বললে তাকে দুর্বল, অলস বা ‘অতিরিক্ত ভাবুক’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হলে সমস্যা আরও গভীর হতে পারে। স্কুল ও কর্মক্ষেত্রেও দীর্ঘ চাপ, ঘুমের ঘাটতি, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক অনিশ্চয়তা বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তরুণদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনা, পরীক্ষার চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সবকিছু একসঙ্গে মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। এখানে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ ধরনের সাধারণ আশ্বাস সবসময় যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপদে কথা বলার জায়গা, প্রশিক্ষিত সহায়তা এবং প্রয়োজনে পেশাদার সেবা নেওয়ার সুযোগ।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল হাসপাতালকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং কমিউনিটি পর্যায়ে প্রাথমিক মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা বাড়ানো দরকার। পরিবার ও বন্ধুরাও গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারেন—শর্ত হলো তাঁরা বিচার না করে শুনবেন এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তার দিকে উৎসাহিত করবেন।
১০ অক্টোবরের সঙ্গে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্বের বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবসও একই দিনে পড়ছে। পাখিদের দীর্ঘ যাত্রা যেমন পরিবেশগত পরিবর্তনের গল্প বলে, তেমনি মানুষের মানসিক সুস্থতাও তার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। নিরাপদ পরিবার, সহায়ক কর্মক্ষেত্র, সবুজ জনপরিসর, সামাজিক সম্পর্ক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন—এসব মানসিক সুস্থতার বৃহত্তর পরিবেশ তৈরি করে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ভাষা বদলাতে হবে। কষ্টকে উপহাস নয়, সংকেত হিসেবে দেখতে হবে; সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা নয়, দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের উপলক্ষ তখনই অর্থবহ হবে, যখন ১০ অক্টোবরের পোস্টের পরও আমরা মানুষকে শুনব, পাশে দাঁড়াব এবং প্রয়োজনীয় সেবার দরজা সহজ করব।
-লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা

শেখ রিফান আহমেদ 















