ঢাকা, বাংলাদেশ। , মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
অযত্নে ভুতুড়ে কারখানা-চালুর দাবিতে স্থানীয়দের দাবি

ফেনীর দোস্ত টেক্সটাইল মিল ১৫ বছর ধরে বন্ধ

মোঃ আরিফুর রহমান
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ১০:১০:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১০ বার পঠিত
মোঃ আরিফুর রহমান:   ফেনী শহরের অদূরে সদর উপজেলার কাজিরবাগ ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দোস্ত টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্ধ পড়ে রয়েছে। একসময় এলাকার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি এখন অযত্ন-অবহেলায় পরিণত হয়েছে এক ভুতুড়ে স্থাপনায়।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এই মিলটি পুনরায় চালু করা গেলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ফেনীর অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় দোস্ত টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। ফেনী সদর উপজেলার রানীরহাট সংলগ্ন প্রায় ২১ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই মিল একসময় ৬ শতাধিক শ্রমিকের কর্মস্থল ছিল। মিলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বাজার, দোকানপাট, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো।
১৯৭২ সালে এটি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয় এবং দীর্ঘ সময় লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানকার উৎপাদিত সুতা দেশ-বিদেশে রপ্তানি হতো। তবে সময়োপযোগী আধুনিকায়নের অভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে ধীরে ধীরে লোকসানের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৯৩ সাল থেকে লোকসান শুরু হয়ে ১৯৯৭ সালে সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয় মিলটি।
ভুতুড়ে নীরবতায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান
সরেজমিনে দেখা গেছে, এক সময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এই কারখানায় এখন বিরাজ করছে নীরবতা। বিশাল দালান-কোঠা থাকলেও নেই কোনো কার্যক্রম। গুদামঘর ও মেশিন রুমগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
কারখানার আবাসিক ভবনগুলোও ভেঙে পড়ার উপক্রম। কিছু নিম্ন আয়ের পরিবার নামমাত্র ভাড়ায় সেখানে বসবাস করলেও পুরো এলাকাজুড়ে নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য।
কারখানার সংশ্লিষ্টরা জানান, উৎপাদন বন্ধ থাকায় এখন শুধুমাত্র সীমিত জনবল দিয়ে মিলটির নিরাপত্তা ও তদারকি করা হচ্ছে। কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া বৃহৎ এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, কারখানার যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে এবং জমি লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে।
স্মৃতিতে ফিরে দেখা ব্যস্ত সময়
মিলের নিরাপত্তাকর্মী হুমায়ুন কবির বলেন,
“একসময় এই মিলের সাইরেন শুনে মানুষ সময় বুঝতো। সকাল-সন্ধ্যায় পুরো এলাকা লোকারণ্য হয়ে উঠতো। এখন আমরা কয়েকজন ছাড়া আর কেউ নেই।”
স্থানীয় তরুণ মনজুর হোসেন বলেন,
“আমার বাবা এই মিলেই চাকরি করতেন। তখন শত শত মানুষ এখানে কাজ করতো। এখন মিল বন্ধ থাকায় আমরা অনেকেই বেকার। এটি চালু হলে নতুন করে কর্মসংস্থান তৈরি হবে।”
চালুর দাবিতে জোরালো আহ্বান ফেনীর ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল মনে করছেন, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে মিলটি পুনরায় চালু করা গেলে এলাকার অর্থনীতি আবারও চাঙ্গা হবে।
ফেনী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মিলটি দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তারা সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, এত বড় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে না রেখে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাদের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দোস্ত টেক্সটাইল মিল আবারও ফেনীর অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

অযত্নে ভুতুড়ে কারখানা-চালুর দাবিতে স্থানীয়দের দাবি

ফেনীর দোস্ত টেক্সটাইল মিল ১৫ বছর ধরে বন্ধ

সর্বশেষ পরিমার্জন: ১০:১০:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
মোঃ আরিফুর রহমান:   ফেনী শহরের অদূরে সদর উপজেলার কাজিরবাগ ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দোস্ত টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্ধ পড়ে রয়েছে। একসময় এলাকার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি এখন অযত্ন-অবহেলায় পরিণত হয়েছে এক ভুতুড়ে স্থাপনায়।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এই মিলটি পুনরায় চালু করা গেলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ফেনীর অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় দোস্ত টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। ফেনী সদর উপজেলার রানীরহাট সংলগ্ন প্রায় ২১ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই মিল একসময় ৬ শতাধিক শ্রমিকের কর্মস্থল ছিল। মিলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বাজার, দোকানপাট, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো।
১৯৭২ সালে এটি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয় এবং দীর্ঘ সময় লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানকার উৎপাদিত সুতা দেশ-বিদেশে রপ্তানি হতো। তবে সময়োপযোগী আধুনিকায়নের অভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে ধীরে ধীরে লোকসানের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৯৩ সাল থেকে লোকসান শুরু হয়ে ১৯৯৭ সালে সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয় মিলটি।
ভুতুড়ে নীরবতায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান
সরেজমিনে দেখা গেছে, এক সময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এই কারখানায় এখন বিরাজ করছে নীরবতা। বিশাল দালান-কোঠা থাকলেও নেই কোনো কার্যক্রম। গুদামঘর ও মেশিন রুমগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
কারখানার আবাসিক ভবনগুলোও ভেঙে পড়ার উপক্রম। কিছু নিম্ন আয়ের পরিবার নামমাত্র ভাড়ায় সেখানে বসবাস করলেও পুরো এলাকাজুড়ে নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য।
কারখানার সংশ্লিষ্টরা জানান, উৎপাদন বন্ধ থাকায় এখন শুধুমাত্র সীমিত জনবল দিয়ে মিলটির নিরাপত্তা ও তদারকি করা হচ্ছে। কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া বৃহৎ এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, কারখানার যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে এবং জমি লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে।
স্মৃতিতে ফিরে দেখা ব্যস্ত সময়
মিলের নিরাপত্তাকর্মী হুমায়ুন কবির বলেন,
“একসময় এই মিলের সাইরেন শুনে মানুষ সময় বুঝতো। সকাল-সন্ধ্যায় পুরো এলাকা লোকারণ্য হয়ে উঠতো। এখন আমরা কয়েকজন ছাড়া আর কেউ নেই।”
স্থানীয় তরুণ মনজুর হোসেন বলেন,
“আমার বাবা এই মিলেই চাকরি করতেন। তখন শত শত মানুষ এখানে কাজ করতো। এখন মিল বন্ধ থাকায় আমরা অনেকেই বেকার। এটি চালু হলে নতুন করে কর্মসংস্থান তৈরি হবে।”
চালুর দাবিতে জোরালো আহ্বান ফেনীর ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল মনে করছেন, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে মিলটি পুনরায় চালু করা গেলে এলাকার অর্থনীতি আবারও চাঙ্গা হবে।
ফেনী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মিলটি দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তারা সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, এত বড় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে না রেখে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাদের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দোস্ত টেক্সটাইল মিল আবারও ফেনীর অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।