ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
তাজা খবর
“কানাডার এমপি নির্বাচনে জয়ী ডলি বেগমকে গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র অভিনন্দন
উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হলো ১৪৪ তম খুলনা দিবস!
চট্রগ্রামের জব্বারের বলি খেলায় হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন হোমনার বাঘা শরীফ
কৃষকের ন্যায্য মূল্য কোথায় যায়?
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত
ছদ্মবেশী অস্ত্র ‘পেনগান’
ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট
যশোরে কৃত্রিম তেল সংকটে দিশেহারা চালক ও সাধারণ মানুষ
জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার তেল শোধনাগারে ভয়াবহ আগুন
ফুয়েল পাস নিতে নিবন্ধনের নিয়ম
বর্ষার আগেই মাঝারি বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় জলাবদ্ধতা: কারণ প্রভাব ও প্রতিকার

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৭:১০:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৫
- / ৮৯ বার পঠিত

বাংলাদেশ একটি বৃষ্টিপ্রবণ দেশ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাবদ্ধতা একটি সাধারণ দৃশ্য। তবে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই মাত্র মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিতেই অনেক জেলা শহর, গ্রামীণ এলাকা ও নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এই প্রবণতা উদ্বেগজনক, কারণ এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে সামনে নিয়ে আসে।
> জলাবদ্ধতার সংজ্ঞা ও প্রেক্ষাপট
জলাবদ্ধতা বলতে বোঝায় এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দীর্ঘসময় জমে থেকে জনজীবনে বিঘ্ন ঘটায়। এটি সাধারণত দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-বিল ও জলাশয় ভরাট, এবং অপর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কারণে হয়।
মাঝারি বৃষ্টিতে কেন জলাবদ্ধতা?
১. অপরিকল্পিত নগরায়ন
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বড় বড় শহরে অপরিকল্পিতভাবে ভবন, রাস্তা এবং শিল্প এলাকা গড়ে উঠেছে। এইসব এলাকায় খাল, নালা ও প্রাকৃতিক জলাধান ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে বর্ষার আগে সামান্য বৃষ্টি হলেও পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত পথ থাকে না।
২. ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা
বেশিরভাগ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শহরগুলোতে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। পুরাতন ড্রেনেজ লাইন, বর্জ্যে পূর্ণ নালা এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক পানি নিষ্কাশনের পথের অভাবে পানি জমে থেকে যায়।
৩. খাল ও নদী দখল
বাংলাদেশে খাল, নদী ও জলাশয় দখল ও ভরাট একটি বড় সমস্যা। অনেক জায়গায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জলাবদ্ধতা বাড়ছে।
৪. বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে বৃষ্টিপাত অপ্রত্যাশিত ও ঘন ঘন হচ্ছে। স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টি হওয়ায় পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না।
> জলাবদ্ধতার প্রভাব
১. জনজীবনে বিঘ্ন
জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে স্কুল, কলেজ, অফিস ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। রাস্তাঘাটে পানি জমে চলাচল অক্ষম হয়ে পড়ে, ফলে পণ্য পরিবহনেও সমস্যা দেখা দেয়।
২. স্বাস্থ্য ঝুঁকি
পানি জমে থাকলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড ও ডায়রিয়ার মতো রোগের প্রকোপ বাড়ে। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এটি বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ।
৩. কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব
প্রাক-মৌসুমে যদি জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, তাহলে জমিতে থাকা আগাম ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এতে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
৪. পরিবেশগত প্রভাব
জমে থাকা পানি পরিবেশে দূষণ সৃষ্টি করে। বর্জ্যসহ পানি নদীতে গেলে তা জলজ জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে।
> জেলার ভিত্তিতে জলাবদ্ধতার বর্তমান চিত্র
ঢাকা
ঢাকা মহানগরীতে এপ্রিল মাসেই একাধিকবার জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, বসুন্ধরা এলাকায় মাত্র ৩০-৪০ মিনিটের বৃষ্টিতে হাঁটু পরিমাণ পানি জমেছে।
চট্টগ্রাম
বহুদিন ধরেই চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা একটি স্বাভাবিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পোর্ট কানেক্টিং রোড, আগ্রাবাদ, হালিশহর—এই এলাকাগুলোর জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের। এবছর এপ্রিলের মাঝামাঝিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
খুলনা
খুলনা শহরের শিববাড়ি, গল্লামারী, রূপসা এলাকায় মাঝারি বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা হয়। এখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় পানি বের হতে সময় লাগে।
সিলেট
সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার, আম্বরখানা, সুবিদবাজার এলাকায় জলাবদ্ধতা নতুন কিছু নয়। এবছর মাঝারি বৃষ্টিতেই এই এলাকাগুলোতে যানজট এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বরিশাল, রাজশাহী ও কুমিল্লা
এছাড়াও বরিশাল শহরে নদী সংলগ্ন এলাকা, রাজশাহীর বড়বাজার, কুমিল্লার কান্দিরপাড়—সবখানেই জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
> সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ
১. ড্রেন ও খালের সমন্বয়হীনতা
২. উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত বিষয় উপেক্ষা
৩. স্থানীয় সরকারের তদারকি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা
৪. জলাধার সংরক্ষণে যথাযথ আইন প্রয়োগ না হওয়া
> সম্ভাব্য সমাধান ও সুপারিশ
১. সমন্বিত পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনা
প্রতিটি শহরের জন্য পৃথক পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও বৃষ্টিপাতের ধরণ অনুযায়ী ড্রেন, খাল ও জলাশয়ের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়।
২. খাল ও নালা পুনর্খনন
প্রাকৃতিক জলপথ পুনরুদ্ধার করতে হবে। দখলকৃত খাল ও নালাগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত করে পুনর্খনন করতে হবে।
৩. ড্রেনেজ অবকাঠামোর উন্নয়ন
নতুন ও টেকসই ড্রেন নির্মাণ এবং পুরাতন ড্রেন পুনর্নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত পরিস্কার-পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি
অনেক সময় নাগরিকরাই নালায় বর্জ্য ফেলেন, যা জলাবদ্ধতা বাড়ায়। গণসচেতনতা কর্মসূচি ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ প্রবণতা রোধ করতে হবে।
৫. প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান
আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শহরের ভূগর্ভস্থ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে বড় শহরগুলোর জন্য এধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।
৬. জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এতে করে নগর ও গ্রামীণ উভয় এলাকায় পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরি সম্ভব হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্ষার আগেই দেশের বিভিন্ন জেলায় মাঝারি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা যে পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অতএব, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে অদূর ভবিষ্যতে এ সমস্যার পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে। প্রশাসন, প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ এবং জনগণ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এ সমস্যা সমাধান সম্ভব।
আরও পড়ুন:

















