“মৃত্যুর আগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ দেখে যেতে চাই”

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৭:৫৭:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ৮১ বার পঠিত

দক্ষিণাঞ্চল প্রতিবেদক :: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে ঢাকা জগন্নাথ কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শামছুল হক খান। তারুণ্যের উন্মাদনা ও দেশপ্রেমের অদম্য আকাঙ্ক্ষা তাকে বারবার টেনে নিয়েছিল যুদ্ধের রণাঙ্গনে। নিজেকে আর স্থির রাখতে না পেরে যে কোনো মূল্যে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার দৃঢ় সংকল্পে তিনি নিজের জেলায় ফিরে গ্রামবাসীকে সংঘবদ্ধ করার প্রস্তুতি নেন। বিভিন্ন পথ বেয়ে তিনি গোপনে পিরোজপুরের নিজ গ্রাম কলাখালীতে পৌঁছান। সেখান থেকে কয়েকজন যুবককে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। যশোরের ভদ্রপাড়ায় পৌঁছে মাঠের পর মাঠ ধানক্ষেত ও আমবাগানের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে নদী অতিক্রম করে নৌকাযোগে ভারতের বনগাঁও সীমান্তে পৌঁছান। এ সময় তার সঙ্গে ১৪-১৫ জন যুবক ছিলেন। পথে পাক সেনাদের আক্রমণের মুখে পড়লেও অল্পের জন্য সবাই প্রাণে রক্ষা পান। বনগাঁও পৌঁছানোর পর পিরোজপুর শহরের পরিচিত দিলীপের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি তাদের ‘বেগুনদিয়া’ মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পৌঁছে দেন। সেখানে প্রায় ১৫০ জনের একটি গ্রুপকে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, এসএলআর ও টু-টু বোরসহ বিভিন্ন অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে ভারত থেকে স্থানীয় নৌকাযোগে তাদের সুন্দরবনের উদ্দেশে পাঠানো হয়। রাতের শুরুতেই মাঝনদীতে পৌঁছালে আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে থাকা পাক সেনারা নৌকাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মরক্ষা করেন এবং নিজেদের জেলে পরিচয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সুন্দরবনের গহীনে প্রবেশ করেন। বর্তমানে আশিতিপর এই বীর মুক্তিযোদ্ধা শামছুল হক খান এ প্রতিবেদককে জানান, দিকভ্রান্ত হয়ে তারা মাইলের পর মাইল হাঁটতে থাকেন। এক পর্যায়ে এক পেশাদার মৌয়ালীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তার কাছ থেকেই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের অবস্থান জানতে পারেন। প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর ক্যাম্পে পৌঁছান। বাগেরহাট, পিরোজপুর ও সাতক্ষীরার একাংশ নিয়ে তখন সুন্দরবনে একটি সাব-সেক্টর গঠন করা হয়। এর কমান্ডার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে ৯নং সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার প্রয়াত মেজর জিয়া উদ্দিন আহম্মেদ। তেঁতুলবাড়িয়া নদীর তীরে গড়ে তোলা হয় সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার্স। সেনাবাহিনীর নিয়মে পরিচালিত এই বাহিনীতে ১২টি প্রশাসনিক ইউনিট ও বিশেষ গেরিলা বাহিনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। শামছুল হক খান জানান, তাম্বুলবুনিয়া স্টুডেন্ট ক্যাম্প, হয়লাতলা ও কলমতেজীতে সুন্দরবন বাহিনীর প্রশিক্ষণ শিবির ছিল। তিনি স্টুডেন্ট ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। যুদ্ধের শেষ পর্যায় পর্যন্ত তিনি ছাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং পাক সেনা ক্যাম্পগুলোর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ ও অপারেশনে নেতৃত্ব দেন। তিনি কলমতেজি, নাংলী, তাম্বুলবুনিয়া, হয়লাতলা, কালিবাড়ি ও নারী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন বিশেষ ক্যাম্পের দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্ট কমান্ডারদের মধ্যে ছিলেন-কলমতেজি ক্যাম্পে স.ম. কবির আহমেদ (মধু), নারী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নাছিমা বেগম, নাংলী ক্যাম্পে মফিজুল হক, তাম্বুলবুনিয়া পশ্চিমবঙ্গ গেরিলা ক্যাম্পে সুবেদার আ. গাফফার, হয়লাতলা ক্যাম্পে মো. আফজাল হোসেন, বৈদ্যমারি মুজিব বাহিনী ক্যাম্পে ডা. মোসলেম উদ্দিন এবং কালিবাড়ি ক্যাম্পে নূর মোহাম্মদ। সাব-সেক্টর হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর মেজর জিয়া উদ্দিনের নেতৃত্বে পিরোজপুর ও বাগেরহাটের সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাসহ পুরো সুন্দরবনে এই বাহিনী পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই বাহিনীর উল্লেখযোগ্য অভিযানের মধ্যে রয়েছে-মোড়েলগঞ্জ রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ, ধানসাগর খালমুখে সম্মুখ যুদ্ধ, ফুলহাতা-পানগুচি নদীতে রাজাকার লঞ্চ আক্রমণ, বগী পাঞ্জাবি গানবোট প্রতিরোধ, রাজাপুর ভোলা নদী প্রতিরোধ, তুষখালী অপারেশন, বড় মাছুয়া যুদ্ধ, মঠবাড়িয়া-আমড়াগাছিয়া-বেতমোর যুদ্ধ, শরণখোলা ও শৌলা নদীতে গানবোট প্রতিরোধ, শেলা নদীতে পাক বাহিনীর স্টিমার আক্রমণ, শাপলেজা বাজার অপারেশন, হিরণ পয়েন্ট-মংলাবন্দর অভিযান এবং কাউখালী ও মঠবাড়িয়া উপজেলায় রাজাকারবিরোধী অভিযান। দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগে ১২ ডিসেম্বর মেজর জিয়ার নেতৃত্বে সুন্দরবন ত্যাগের সময় শামছুল হক খানসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা রায়েন্দা ও মোড়েলগঞ্জ এলাকায় পাক সেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হন। এক পর্যায়ে পাক বাহিনী পিছু হটে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এর আগেই, ৮ ডিসেম্বর জিয়া বাহিনীর হাতে পিরোজপুর শত্রুমুক্ত হয়। ঘরে ঘরে উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র ও লাল-সবুজের পতাকা।



















