ঢাকা, বাংলাদেশ। , শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

সন্তানের মৃত্যু পিতার জীবনের অর্ধেক শূন্যতা: অধ্যাপক ডা.কামাল উদ্দীন

মুন্সি শাহাব উদ্দীন, চট্টগ্রাম
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:৫৬:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
  • / ৬১ বার পঠিত

মুন্সি শাহাব উদ্দীন, চট্টগ্রাম:  আমি একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সেবা করে আসছি। এই দেশের অসংখ্য মানুষ আমার চিকিৎসা সেবা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। তাদের অসুস্থতা দূর হয়েছে, অনেকের মুখে ফিরেছে হাসি। সেইসব মানুষের দোয়া আর ভালোবাসাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। মানুষের সেবা করাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।
কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সব অর্জন, সব সাফল্য যেন ম্লান হয়ে যায়। জীবনের সব শক্তি, সাহস আর আশ্রয় যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। আজ আমি সেই কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
ভাবতেই অবাক লাগে আমার জীবনের প্রিয়তম সম্পদ, আমার কনিষ্ঠ কন্যাকে ছাড়া আমাকে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হবে। যে মেয়েটিকে আমি বুকের মাঝে আগলে রেখে বড় করেছি, যার হাসি আমার ঘরকে আলোকিত করত, সেই মেয়েটি আজ আর নেই।
গত ২৬  তারিখে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার স্নেহের কন্যা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। চিকিৎসকরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, আমরা পরিবারের সবাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আমাদের সব আশা ব্যর্থ হয়ে যায়।
সেদিন রাত প্রায় ১১টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে আমার কলিজার টুকরাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করলাম। সেই মুহূর্তটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য। নিজের হাতে মেয়েকে কবরের মাটিতে শুইয়ে দেওয়া একজন পিতার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।
সেদিন থেকেই মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সুখ, শান্তি, আশা ও ভরসা যেন সেই কবরের মাটির সাথেই মিশে গেছে। চারপাশে সবকিছু আগের মতোই আছে, কিন্তু আমার পৃথিবীটা যেন আর আগের মতো নেই।
আমার সেই আদরের কন্যা চট্টগ্রাম কলেজে অনার্সে অধ্যয়নরত ছিল। পড়াশোনায় ছিল মেধাবী, ভদ্র ও বিনয়ী। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সে নিজেকে দক্ষ করে তুলেছিল একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবেও। নিজের স্বপ্ন ছিল, পরিবারকে নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার।
মেয়েটির স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন ছিল তার চোখে। তার প্রাণবন্ত হাসি, তার প্রাণখোলা কথা, তার স্নেহমাখা ডাক সবকিছু আজ শুধুই স্মৃতি হয়ে গেছে।
আজও মনে হয়, আমি কি কোনোদিন আমার মেয়ের সেই মায়াভরা মুখটি ভুলতে পারবো? যে মুখটি জন্মের পর থেকে আমার চোখের সামনে বড় হয়েছে। যে ছোট্ট শিশুটি একদিন “বাবা” বলে আমার বুকে এসে জড়িয়ে ধরত, সেই মেয়েটি আজ আর পৃথিবীর আলো-বাতাসে নেই। এ কথা ভাবলেই বুকটা হাহাকার করে ওঠে।
পবিত্র রমজান মাসে সে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। আমরা বিশ্বাস করি, রমজানের এই বরকতময় সময়ে আল্লাহ তাকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেছেন। একজন পিতা হিসেবে এই বিশ্বাসই আমার একমাত্র সান্ত্বনা।
সন্তানের মৃত্যু যে কতটা গভীর বেদনার, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সত্যিই, সন্তানের মৃত্যু মানে একজন পিতার অর্ধেক মৃত্যু। বাকি অর্ধেক জীবনটা শুধু স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়েই কাটাতে হয়।
তবুও মহান আল্লাহর কাছে আমার একটাই প্রার্থনা তিনি যেন আমার প্রিয় কন্যাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন এবং আমাদের পরিবারকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দেন।
আমার কন্যা হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার স্মৃতি, তার ভালোবাসা, তার স্বপ্ন এসব চিরদিন আমাদের হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

সন্তানের মৃত্যু পিতার জীবনের অর্ধেক শূন্যতা: অধ্যাপক ডা.কামাল উদ্দীন

সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:৫৬:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

মুন্সি শাহাব উদ্দীন, চট্টগ্রাম:  আমি একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সেবা করে আসছি। এই দেশের অসংখ্য মানুষ আমার চিকিৎসা সেবা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। তাদের অসুস্থতা দূর হয়েছে, অনেকের মুখে ফিরেছে হাসি। সেইসব মানুষের দোয়া আর ভালোবাসাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। মানুষের সেবা করাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।
কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সব অর্জন, সব সাফল্য যেন ম্লান হয়ে যায়। জীবনের সব শক্তি, সাহস আর আশ্রয় যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। আজ আমি সেই কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
ভাবতেই অবাক লাগে আমার জীবনের প্রিয়তম সম্পদ, আমার কনিষ্ঠ কন্যাকে ছাড়া আমাকে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হবে। যে মেয়েটিকে আমি বুকের মাঝে আগলে রেখে বড় করেছি, যার হাসি আমার ঘরকে আলোকিত করত, সেই মেয়েটি আজ আর নেই।
গত ২৬  তারিখে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার স্নেহের কন্যা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। চিকিৎসকরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, আমরা পরিবারের সবাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আমাদের সব আশা ব্যর্থ হয়ে যায়।
সেদিন রাত প্রায় ১১টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে আমার কলিজার টুকরাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করলাম। সেই মুহূর্তটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য। নিজের হাতে মেয়েকে কবরের মাটিতে শুইয়ে দেওয়া একজন পিতার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।
সেদিন থেকেই মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সুখ, শান্তি, আশা ও ভরসা যেন সেই কবরের মাটির সাথেই মিশে গেছে। চারপাশে সবকিছু আগের মতোই আছে, কিন্তু আমার পৃথিবীটা যেন আর আগের মতো নেই।
আমার সেই আদরের কন্যা চট্টগ্রাম কলেজে অনার্সে অধ্যয়নরত ছিল। পড়াশোনায় ছিল মেধাবী, ভদ্র ও বিনয়ী। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সে নিজেকে দক্ষ করে তুলেছিল একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবেও। নিজের স্বপ্ন ছিল, পরিবারকে নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার।
মেয়েটির স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন ছিল তার চোখে। তার প্রাণবন্ত হাসি, তার প্রাণখোলা কথা, তার স্নেহমাখা ডাক সবকিছু আজ শুধুই স্মৃতি হয়ে গেছে।
আজও মনে হয়, আমি কি কোনোদিন আমার মেয়ের সেই মায়াভরা মুখটি ভুলতে পারবো? যে মুখটি জন্মের পর থেকে আমার চোখের সামনে বড় হয়েছে। যে ছোট্ট শিশুটি একদিন “বাবা” বলে আমার বুকে এসে জড়িয়ে ধরত, সেই মেয়েটি আজ আর পৃথিবীর আলো-বাতাসে নেই। এ কথা ভাবলেই বুকটা হাহাকার করে ওঠে।
পবিত্র রমজান মাসে সে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। আমরা বিশ্বাস করি, রমজানের এই বরকতময় সময়ে আল্লাহ তাকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেছেন। একজন পিতা হিসেবে এই বিশ্বাসই আমার একমাত্র সান্ত্বনা।
সন্তানের মৃত্যু যে কতটা গভীর বেদনার, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সত্যিই, সন্তানের মৃত্যু মানে একজন পিতার অর্ধেক মৃত্যু। বাকি অর্ধেক জীবনটা শুধু স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়েই কাটাতে হয়।
তবুও মহান আল্লাহর কাছে আমার একটাই প্রার্থনা তিনি যেন আমার প্রিয় কন্যাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন এবং আমাদের পরিবারকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দেন।
আমার কন্যা হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার স্মৃতি, তার ভালোবাসা, তার স্বপ্ন এসব চিরদিন আমাদের হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকবে।