স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:০১:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
- / ১১ বার পঠিত

সাইমুম রেজা পিয়াস : বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের এই সাফল্য প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এই অর্জনের পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় এখনো বহু মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল, কারণ সেখানে চিকিৎসা খরচ তুলনামূলক কম। কিন্তু রোগীর সংখ্যা অনুযায়ী হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা অপর্যাপ্ত। ফলে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একটি শয্যায় একাধিক রোগী রাখা, হাসপাতালের করিডোরে রোগীর অবস্থান—এসব দৃশ্য এখন সাধারণ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এই সংকটকে আরও প্রকট করেছে। দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী গ্রামে বসবাস করলেও সেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নেই। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে প্রায়ই চিকিৎসক সংকট দেখা যায়। অনেক চিকিৎসক গ্রামে পদায়িত হলেও নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। ফলে গ্রামীণ জনগণ বাধ্য হয়ে জেলা শহর বা রাজধানীমুখী হয়। এতে শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আরও বেড়ে যায় এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।
অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে আধুনিক চিকিৎসাসেবা থাকলেও তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বড় বোঝা। অনেক সময় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় আরোপের অভিযোগও পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসেবা যখন একটি মৌলিক অধিকার, তখন অর্থের অভাবে মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হাসপাতালের সরঞ্জাম ক্রয়, ওষুধ সরবরাহ, জনবল নিয়োগ—এসব ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। অনেক সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি থাকে, ফলে রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য হতে হয়। এতে দরিদ্র রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে সুশাসনের অভাব সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি হলো একটি সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন। স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু শহরকেন্দ্রিক না রেখে গ্রামীণ পর্যায়ে চিকিৎসক, সরঞ্জাম ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, নতুন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দিতে হবে এবং স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায্য খরচে মানসম্মত চিকিৎসা পায়।
স্বাস্থ্যসেবা একটি দেশের মানবিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই স্বাস্থ্যখাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা তখনই অর্থবহ হবে, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে।
– লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা























