
শেখ রিফান আহমেদ : একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। মানুষ রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানবে, সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করবে, অনিয়মের তথ্য সামনে আসবে, নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার প্রতিবাদ উঠবে—এসবের জন্য একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম অপরিহার্য। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্কটি অনেকটা আলো ও ছায়ার মতো। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির পূর্ণতা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানই মনে করিয়ে দেয়, এই স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ স্বাধীনতা যেমন সাংবিধানিক অধিকার, তেমনি তার ব্যবহারও আইনি ও নৈতিক কাঠামোর মধ্যে থাকতে হয়।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন স্বাধীনতার অর্থকে নিজের ইচ্ছামতো তথ্য প্রকাশের অবাধ লাইসেন্স হিসেবে দেখা হয়। সংবাদমাধ্যম স্বাধীন মানে এই নয় যে যাচাই-বাছাই ছাড়াই যেকোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে। একটি সংবাদ ভুল হলে তার প্রভাব শুধু সংবাদপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর পড়ে না; ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার, একটি প্রতিষ্ঠান কিংবা বৃহত্তর সমাজ।
সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত তাই তথ্যের সত্যতা।
একজন সাংবাদিক কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হতে পারেন, কোনো নথি হাতে পেতে পারেন, কারও কাছ থেকে অভিযোগ শুনতে পারেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দেখতে পারেন। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই একা একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদ তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়। তথ্যের উৎস যাচাই করা, সম্ভব হলে একাধিক স্বাধীন উৎস থেকে নিশ্চিত হওয়া, নথিপত্র পরীক্ষা করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া—এসবই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ।
বিশেষ করে অভিযোগের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও জরুরি। অভিযোগ আর প্রমাণিত সত্য এক জিনিস নয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অপরাধ বা অনিয়মের অভিযোগ উঠতেই পারে। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব সেই অভিযোগ অনুসন্ধান করা এবং জনগণকে জানানো; কিন্তু অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার সুযোগ দেওয়া তাই শুধু সৌজন্য নয়, ন্যায্যতারও অংশ।
বর্তমান সময়ে সংবাদমাধ্যমের এই দায়িত্ব আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যের প্রবাহকে অভাবনীয় দ্রুততা দিয়েছে। একটি ছবি, ভিডিও কিংবা কয়েক লাইনের পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু দ্রুত ছড়িয়ে পড়া কোনো তথ্য সত্য হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, সম্পাদিত ভিডিও, বিভ্রান্তিকর শিরোনাম, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব—সবই জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত শুধু দ্রুততার সঙ্গে নয়, নির্ভুলতার সঙ্গেও।
‘সবার আগে’ সংবাদ প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু ‘সবার আগে ভুল’ করার চেয়ে ‘কিছুটা পরে নিশ্চিত সত্য’ প্রকাশ করা অনেক বেশি মূল্যবান। একটি ভুল সংবাদ প্রত্যাহার বা সংশোধন করা গেলেও প্রথম প্রকাশের মাধ্যমে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সবসময় পুরোপুরি ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
এখানে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রতিবেদক মাঠ থেকে তথ্য নিয়ে আসেন, কিন্তু প্রকাশের আগে সেই তথ্যের যথার্থতা যাচাই করার দায়িত্ব সম্পাদনা বিভাগের। শিরোনাম, ভাষা, তথ্যের প্রেক্ষাপট, ছবির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য—সবকিছুর মধ্যেই দায়িত্বশীলতার ছাপ থাকা প্রয়োজন।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সাংবাদিকের যেমন সাহস প্রয়োজন, তেমনি নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতাও প্রয়োজন। ভুল সংবাদ প্রকাশিত হলে তা সংশোধন করা দুর্বলতার পরিচয় নয়। বরং ভুল স্বীকার করে সংশোধন করা একটি প্রতিষ্ঠানের পেশাগত সততার প্রমাণ।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসনিক ক্ষমতা কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব—কোনোটিই সাংবাদিকতার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে হওয়া উচিত নয়। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান কী করছে, সরকারি সিদ্ধান্তে মানুষের কী প্রভাব পড়ছে, কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে কি না, নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্ন করা গণমাধ্যমের স্বাভাবিক দায়িত্ব।
তবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার অর্থ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি পূর্বনির্ধারিত বিরোধিতা নয়। সাংবাদিকের কাজ বিচারকের ভূমিকা নেওয়া নয়; তথ্য তুলে ধরা, প্রমাণ অনুসন্ধান করা এবং জনগণকে বাস্তবতা বোঝার সুযোগ করে দেওয়া। সংবাদমাধ্যম যদি আগে থেকেই কোনো পক্ষের হয়ে যায়, তাহলে তার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
একইভাবে সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক কাজ তুলে ধরাও সাংবাদিকতার বাইরে নয়। সমালোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভালো উদ্যোগের স্বীকৃতিও প্রয়োজন। একটি সেতু নির্মাণ হলে তার উদ্বোধনের ছবি প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার শেষ কথা নয়; সেই সেতু বাস্তবে মানুষের কী উপকার করছে, প্রকল্পের ব্যয় কত, কাজের মান কেমন—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। আবার কোনো সরকারি উদ্যোগ সত্যিই মানুষের জীবন সহজ করলে সেটিও পাঠকের সামনে তুলে ধরা উচিত।
অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের কাজ প্রশংসা করা কিংবা সমালোচনা করা—কোনোটিই একক লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য হলো সত্যকে যথাসম্ভব নিরপেক্ষ ও প্রাসঙ্গিকভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা।
আরেকটি বিষয় আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—সংবাদ কেবল রাজনীতি বা ক্ষমতার খবর নয়। একজন কৃষকের উৎপাদন খরচ, একজন শ্রমিকের মজুরি, একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ, একজন রোগীর চিকিৎসা পাওয়া, নদী-খাল দখল, পরিবেশের ক্ষতি, দ্রব্যমূল্যের চাপ কিংবা কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের নাগরিক সুবিধার অভাব—এসবও জনস্বার্থের সংবাদ।
জাতীয় সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হলো রাজধানীর বাইরে তাকানো। দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবন, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসা। কারণ বাংলাদেশের বাস্তবতা শুধু শহরের ব্যস্ত সড়ক বা ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন সাধারণ মানুষের জীবনও জাতীয় বাস্তবতারই অংশ।
স্বাধীনতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংবাদিকের নিরাপত্তা। কোনো সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হুমকি, হামলা, হয়রানি বা চাপের মুখে পড়লে শুধু একজন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের জানার অধিকার। তাই সাংবাদিকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সংবাদ সংগ্রহে অযৌক্তিক বাধা না দেওয়া একটি গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তবে সাংবাদিকদেরও মনে রাখতে হবে, পেশাগত স্বাধীনতা ব্যক্তিগত দায়মুক্তি নয়। সংবাদ সংগ্রহের সময় কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা, শিশুদের পরিচয়, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা কিংবা সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনায় নিতে হবে। সব সত্য প্রকাশযোগ্য নয়—কোন তথ্য কীভাবে, কখন এবং কতটুকু প্রকাশ করা জনস্বার্থে প্রয়োজন, সেটিও সাংবাদিকতার বিচক্ষণতার অংশ।
আজকের পাঠকও আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। পাঠক শুধু সংবাদ পড়েন না; তিনি সংবাদকে অন্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, প্রশ্ন করেন, ভুল ধরিয়ে দেন। ফলে সংবাদমাধ্যমের জন্য পাঠকের আস্থা অর্জন এখন আরও কঠিন, কিন্তু একই সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন নয়, প্রযুক্তি নয়, এমনকি বড় সংখ্যার অনুসারীও নয়—তার সবচেয়ে বড় সম্পদ পাঠকের বিশ্বাস।
এই বিশ্বাস তৈরি হয় বছরের পর বছর ধরে। একটি নির্ভুল প্রতিবেদন সেই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে। একটি অসতর্ক সংবাদ সেটিকে দুর্বল করে। আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা সংবাদ একটি প্রতিষ্ঠানের বহু বছরের অর্জনকে মুহূর্তে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
তাই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই এবং সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার লড়াই আসলে পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি অন্যটিকে শক্তিশালী করে। দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমই স্বাধীনতার অধিকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ায়। আর স্বাধীন পরিবেশই সাংবাদিককে সত্য অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয় সাহস দেয়।
আমাদের প্রয়োজন এমন সংবাদমাধ্যম, যে সংবাদ প্রকাশের আগে নিজেকেই প্রশ্ন করবে—তথ্যটি কি যাচাই করা হয়েছে? কারও বক্তব্য বাদ পড়েছে কি? এই সংবাদ জনস্বার্থে কতটা প্রয়োজনীয়? প্রকাশের ফলে অযথা কারও ক্ষতি হবে কি? শিরোনাম কি তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই যা জানি, সেটিই পাঠককে জানাচ্ছি?
এই আত্মজিজ্ঞাসা যতদিন সাংবাদিকতার ভেতরে থাকবে, ততদিন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অর্থবহ থাকবে।
স্বাধীনতা চাই, কারণ সত্য প্রকাশের জন্য স্বাধীনতা প্রয়োজন। দায়িত্ব চাই, কারণ সত্য প্রকাশের ক্ষমতা ভুলভাবে ব্যবহার করা হলে সেই স্বাধীনতাই মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের অবস্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা ক্ষমতাকেন্দ্রের পাশে নয়—তার অবস্থান হওয়া উচিত সত্য, ন্যায় এবং জনস্বার্থের পাশে। সাংবাদিকের কলম ভয়মুক্ত হবে, কিন্তু দায়িত্বহীন হবে না। সংবাদপত্র প্রশ্ন করবে, কিন্তু অপপ্রচার করবে না। সমালোচনা করবে, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বানাবে না। মানুষের কথা বলবে, কিন্তু মানুষের ক্ষতি করে নয়।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তাই যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি সেই স্বাধীনতার মর্যাদা রাখার দায়িত্বও নিতে হবে। কারণ স্বাধীনতা সংবাদমাধ্যমকে শক্তি দেয়, আর দায়িত্ব সেই শক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের পথ দেখায়।
-লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা

শেখ রিফান আহমেদ, সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা 

























