ঢাকা, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220

সংবাদ প্রকাশের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

শেখ রিফান আহমেদ : সত্য সংবাদ প্রকাশ করা সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতার মাঠে দাঁড়িয়ে সত্য খুঁজে বের করা এবং সেটি পাঠকের সামনে নির্ভয়ে তুলে ধরা যতটা সহজ বলে মনে হয়, কাজটি আসলে ততটা সহজ নয়। একটি সংবাদ তৈরির পেছনে শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়—থাকে উৎস যাচাই, নথি পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝা এবং সবশেষে প্রকাশযোগ্য তথ্য ও অনুমানের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাংবাদিককে নানা ধরনের চাপ ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

প্রশ্ন হলো, সত্য সংবাদ প্রকাশের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
এর একক কোনো উত্তর নেই। তবে সব চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রে রয়েছে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা। কারণ তথ্য পাওয়া আর সত্য জানা এক বিষয় নয়। অনেক সময় সাংবাদিকের হাতে এমন তথ্য আসে, যা প্রথম দেখায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু আরও অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, তথ্যটি অসম্পূর্ণ, একপাক্ষিক অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সাংবাদিকতার এখানেই বড় পরীক্ষা।
বর্তমান সময়ে তথ্যের অভাব নেই; বরং অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহই নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। একটি ছবি বা ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু সেই ছবি কোথায় তোলা, কখন তোলা, ভিডিওটি সম্পূর্ণ কি না কিংবা ঘটনাটির সঙ্গে সেটির আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্ন অনেক সময় সামনে আসে না।
ফলে সাংবাদিকের দায়িত্ব আগের তুলনায় কমেনি; বরং বেড়েছে।
একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিককে এখন শুধু সংবাদ সংগ্রহ করলেই হয় না, তথ্যের উৎস এবং প্রেক্ষাপটও যাচাই করতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোনো তথ্যকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করার আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি ভুল তথ্য যখন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি সংশোধন করলেও আগের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতার চাপ।
ক্ষমতা শুধু রাজনৈতিক নয়। প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক কিংবা সামাজিক প্রভাবও সংবাদ প্রকাশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কোনো প্রতিবেদনে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাংবাদিককে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে। কখনো ফোন আসে, কখনো আপত্তি জানানো হয়, আবার কখনো বিজ্ঞাপন বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয় সামনে এনে সংবাদকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়।
একটি সংবাদপত্রের জন্য এখানেই নৈতিকতার বড় পরীক্ষা।
কারণ সংবাদমাধ্যমের আয় প্রয়োজন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অর্থ প্রয়োজন, সাংবাদিকদের বেতন প্রয়োজন। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রয়োজন যদি সংবাদ প্রকাশের সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিজ্ঞাপনদাতা বা প্রভাবশালী কোনো পক্ষ সংবাদপত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে—এমন পরিবেশ কখনোই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য সুস্থ নয়।
তবে এর বিপরীত সমস্যাটিও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়। সাংবাদিকতার কাজ হলো অভিযোগ অনুসন্ধান করা, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া। অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবে এবং প্রমাণিত তথ্যকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করার সততা থাকতে হবে।
‘সত্য’ এবং ‘শুনেছি’—এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে না পারা সাংবাদিকতার অন্যতম বড় বিপদ।
সত্য সংবাদ প্রকাশের পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হলো তথ্যের উৎসের নির্ভরযোগ্যতা। একটি সূত্র কোনো তথ্য দিলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। বিশেষ করে রাজনৈতিক, অপরাধ, দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়মের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে উৎসের উদ্দেশ্যও বিবেচনায় নিতে হয়। কোনো ব্যক্তি হয়তো সত্য তথ্য দিচ্ছেন, আবার একই সঙ্গে নিজের কোনো স্বার্থও পূরণ করতে চাইছেন।
সাংবাদিকের কাজ তাই শুধু ‘কে তথ্য দিল’ তা জানা নয়; বরং ‘কেন তথ্যটি দেওয়া হলো’—এই প্রশ্নটিও করা।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। নথি, সরকারি রেকর্ড, আর্থিক তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা—সবকিছুকে মিলিয়ে দেখতে হয়। একটি সূত্রের ওপর নির্ভর করে বড় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া বিপজ্জনক।
এখানে সময়ও একটি বড় বিষয়।
ডিজিটাল যুগে সংবাদ প্রকাশের গতি অত্যন্ত বেড়েছে। পাঠক এখন কয়েক মিনিটের মধ্যে খবর জানতে চান। অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোও দ্রুত প্রকাশের প্রতিযোগিতায় থাকে। এই প্রতিযোগিতা সংবাদমাধ্যমকে দ্রুততার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে নির্ভুলতার ভারসাম্য না থাকলে সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একটি সংবাদ পাঁচ মিনিট আগে প্রকাশ করা বড় সাফল্য নয়, যদি সেখানে ভুল তথ্য থাকে। বরং কিছুটা সময় নিয়ে যাচাই করে নির্ভুল সংবাদ প্রকাশ করাই দীর্ঘমেয়াদে সংবাদমাধ্যমের জন্য বেশি মূল্যবান।
কারণ পাঠক ভুল ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু বারবার ভুল তথ্য পেলে আস্থা হারান।
আস্থার সংকট তাই সত্য সংবাদ প্রকাশের পথে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। সংবাদমাধ্যম যখন কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে, তখন পাঠকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়—এই সংবাদ কি সত্যিই তথ্যভিত্তিক, নাকি কোনো পক্ষের স্বার্থে তৈরি?
একটি সংবাদপত্রের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ খুব কমই আছে।
সংবাদমাধ্যমের উচিত কোনো পক্ষের মুখপাত্র না হয়ে জনগণের তথ্যের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সরকার ভালো কাজ করলে সেটিও সংবাদ; সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হলে সেটিও সংবাদ। বিরোধী দলের ইতিবাচক উদ্যোগ যেমন সংবাদ হতে পারে, তেমনি তাদের ভুল বা অনিয়মের বিষয়ও সংবাদ হতে পারে। সাংবাদিকতার মাপকাঠি হওয়া উচিত না—‘কার পক্ষে?’ বরং হওয়া উচিত—‘তথ্যটি সত্য কি না এবং এটি জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ কি না?’
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সাংবাদিকের নিজের পক্ষপাত।
সাংবাদিকও একজন মানুষ। তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ, অপছন্দ, রাজনৈতিক বা সামাজিক ধারণা থাকতে পারে। কিন্তু সংবাদ লেখার সময় ব্যক্তিগত অবস্থানকে তথ্যের ওপর বসিয়ে দিলে সাংবাদিকতা দুর্বল হয়। মতামত ও সংবাদ এক জিনিস নয়। সম্পাদকীয় বা কলামে মতামত প্রকাশের সুযোগ আছে, কিন্তু সংবাদ প্রতিবেদনে তথ্যের যথার্থতা এবং ভারসাম্য অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
এখানে সম্পাদকের দায়িত্বও কম নয়। একজন অভিজ্ঞ সম্পাদক শুধু ভাষা সংশোধন করেন না; তিনি সংবাদটির ভেতরের প্রশ্নগুলোও দেখেন। তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, বক্তব্যের ভারসাম্য আছে কি না, শিরোনাম প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং কোনো শব্দ অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি করছে কি না—এসব বিবেচনা করতে হয়।
বিশেষ করে দুর্ঘটনা, মৃত্যু, যৌন সহিংসতা, শিশু, আত্মহত্যা বা পারিবারিক সংকটের মতো সংবেদনশীল ঘটনায় সাংবাদিকতার মানবিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হলেও সব তথ্য প্রকাশ করা সবসময় নৈতিক নয়। কোনো ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশে যদি তার বা পরিবারের আরও ক্ষতি হয়, তাহলে জনস্বার্থ ও ব্যক্তিগত মর্যাদার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে।
সত্য সংবাদ মানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন অযথা প্রকাশ করা নয়। সত্য সংবাদ মানে মানুষের জানার অধিকারকে সম্মান করা—একই সঙ্গে মানুষের মর্যাদাকেও সম্মান করা।
আমাদের দেশে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের বাস্তবতাও কম কঠিন নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের সময়, অর্থ, যাতায়াত ও নিরাপত্তা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। অনেক স্থানীয় সংবাদ হয়তো জাতীয় পর্যায়ের বড় খবরের মতো আলোচিত নয়, কিন্তু সেই খবরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে একটি এলাকার মানুষের জীবন ও অধিকার।
তাই সত্য সাংবাদিকতার জন্য শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন মাঠে যাওয়ার মানসিকতা।
কাগজে বসে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে সব সংবাদ তৈরি করা যায় না। অনেক সত্য মানুষের মুখে, মাঠের বাস্তবতায়, সরকারি-বেসরকারি নথিতে এবং ঘটনাস্থলের পরিবেশে লুকিয়ে থাকে। সেই সত্য খুঁজে বের করতে সাংবাদিককে প্রশ্ন করতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়, কখনো একই জায়গায় একাধিকবার যেতে হয়।
এ কারণেই সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়; এটি এক ধরনের জনদায়িত্ব।
তবে সত্য প্রকাশের দায়িত্ব সাংবাদিকের একার নয়। সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পাঠক—সব পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। সাংবাদিক সত্য তথ্য খুঁজবেন, সম্পাদক তা যাচাই করে প্রকাশ করবেন, প্রশাসন তথ্য গোপন না করে প্রয়োজনীয় তথ্যের সুযোগ সৃষ্টি করবে, আর পাঠকও যাচাইহীন তথ্যকে অন্ধভাবে বিশ্বাস বা প্রচার করবেন না।
একটি সুস্থ গণমাধ্যম পরিবেশ তৈরি হয় যখন প্রশ্ন করার অধিকার এবং জবাব দেওয়ার সংস্কৃতি—দুটিই শক্তিশালী থাকে।
সবশেষে বলা যায়, সত্য সংবাদ প্রকাশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল চাপ নয়, কেবল গুজব নয়, কেবল প্রযুক্তিও নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো—সব প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যকে সত্য হিসেবে চিহ্নিত করার এবং সেটিকে দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশ করার নৈতিক সাহস ধরে রাখা।
সাংবাদিকের হাতে কলম আছে, ক্যামেরা আছে, প্রযুক্তি আছে; কিন্তু এগুলোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বিবেক। তথ্যের পেছনে ছুটতে হবে, কিন্তু তথ্যের প্রতি সততাও রাখতে হবে। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে হবে, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না। দ্রুত সংবাদ দিতে হবে, কিন্তু যাচাইয়ের জায়গায় তাড়াহুড়ো করা যাবে না।
একটি সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত প্রতিটি সংবাদ আসলে পাঠকের সঙ্গে একটি নীরব চুক্তি—‘আমরা যা জানাচ্ছি, তা জানার মতো এবং যথাসম্ভব যাচাই করা।’
এই চুক্তি ভেঙে গেলে সংবাদপত্রের কাগজ থাকে, ওয়েবসাইট থাকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ থাকে; কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি থাকে না—পাঠকের আস্থা।
আর যে সংবাদমাধ্যম পাঠকের আস্থা হারায়, তার সামনে সবচেয়ে বড় সংকট তখন আর সংবাদ প্রকাশের নয়; সংকট হয়ে দাঁড়ায় তার অস্তিত্বের অর্থই।

-লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয়
10 September 2026

পেকুয়ায় ইউসুফ আলী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা: আসামী-১০

বিস্তারিত পড়তে কমেন্টে লিংক ... |
nagorikbhabna.com

সংবাদ প্রকাশের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

সর্বশেষ পরিমার্জন : ১২:০১:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেখ রিফান আহমেদ : সত্য সংবাদ প্রকাশ করা সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতার মাঠে দাঁড়িয়ে সত্য খুঁজে বের করা এবং সেটি পাঠকের সামনে নির্ভয়ে তুলে ধরা যতটা সহজ বলে মনে হয়, কাজটি আসলে ততটা সহজ নয়। একটি সংবাদ তৈরির পেছনে শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়—থাকে উৎস যাচাই, নথি পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝা এবং সবশেষে প্রকাশযোগ্য তথ্য ও অনুমানের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাংবাদিককে নানা ধরনের চাপ ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

প্রশ্ন হলো, সত্য সংবাদ প্রকাশের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
এর একক কোনো উত্তর নেই। তবে সব চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রে রয়েছে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা। কারণ তথ্য পাওয়া আর সত্য জানা এক বিষয় নয়। অনেক সময় সাংবাদিকের হাতে এমন তথ্য আসে, যা প্রথম দেখায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু আরও অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, তথ্যটি অসম্পূর্ণ, একপাক্ষিক অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সাংবাদিকতার এখানেই বড় পরীক্ষা।
বর্তমান সময়ে তথ্যের অভাব নেই; বরং অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহই নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। একটি ছবি বা ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু সেই ছবি কোথায় তোলা, কখন তোলা, ভিডিওটি সম্পূর্ণ কি না কিংবা ঘটনাটির সঙ্গে সেটির আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্ন অনেক সময় সামনে আসে না।
ফলে সাংবাদিকের দায়িত্ব আগের তুলনায় কমেনি; বরং বেড়েছে।
একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিককে এখন শুধু সংবাদ সংগ্রহ করলেই হয় না, তথ্যের উৎস এবং প্রেক্ষাপটও যাচাই করতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোনো তথ্যকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করার আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি ভুল তথ্য যখন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি সংশোধন করলেও আগের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতার চাপ।
ক্ষমতা শুধু রাজনৈতিক নয়। প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক কিংবা সামাজিক প্রভাবও সংবাদ প্রকাশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কোনো প্রতিবেদনে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাংবাদিককে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে। কখনো ফোন আসে, কখনো আপত্তি জানানো হয়, আবার কখনো বিজ্ঞাপন বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয় সামনে এনে সংবাদকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়।
একটি সংবাদপত্রের জন্য এখানেই নৈতিকতার বড় পরীক্ষা।
কারণ সংবাদমাধ্যমের আয় প্রয়োজন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অর্থ প্রয়োজন, সাংবাদিকদের বেতন প্রয়োজন। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রয়োজন যদি সংবাদ প্রকাশের সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিজ্ঞাপনদাতা বা প্রভাবশালী কোনো পক্ষ সংবাদপত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে—এমন পরিবেশ কখনোই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য সুস্থ নয়।
তবে এর বিপরীত সমস্যাটিও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়। সাংবাদিকতার কাজ হলো অভিযোগ অনুসন্ধান করা, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া। অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবে এবং প্রমাণিত তথ্যকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করার সততা থাকতে হবে।
‘সত্য’ এবং ‘শুনেছি’—এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে না পারা সাংবাদিকতার অন্যতম বড় বিপদ।
সত্য সংবাদ প্রকাশের পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হলো তথ্যের উৎসের নির্ভরযোগ্যতা। একটি সূত্র কোনো তথ্য দিলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। বিশেষ করে রাজনৈতিক, অপরাধ, দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়মের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে উৎসের উদ্দেশ্যও বিবেচনায় নিতে হয়। কোনো ব্যক্তি হয়তো সত্য তথ্য দিচ্ছেন, আবার একই সঙ্গে নিজের কোনো স্বার্থও পূরণ করতে চাইছেন।
সাংবাদিকের কাজ তাই শুধু ‘কে তথ্য দিল’ তা জানা নয়; বরং ‘কেন তথ্যটি দেওয়া হলো’—এই প্রশ্নটিও করা।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। নথি, সরকারি রেকর্ড, আর্থিক তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা—সবকিছুকে মিলিয়ে দেখতে হয়। একটি সূত্রের ওপর নির্ভর করে বড় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া বিপজ্জনক।
এখানে সময়ও একটি বড় বিষয়।
ডিজিটাল যুগে সংবাদ প্রকাশের গতি অত্যন্ত বেড়েছে। পাঠক এখন কয়েক মিনিটের মধ্যে খবর জানতে চান। অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোও দ্রুত প্রকাশের প্রতিযোগিতায় থাকে। এই প্রতিযোগিতা সংবাদমাধ্যমকে দ্রুততার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে নির্ভুলতার ভারসাম্য না থাকলে সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একটি সংবাদ পাঁচ মিনিট আগে প্রকাশ করা বড় সাফল্য নয়, যদি সেখানে ভুল তথ্য থাকে। বরং কিছুটা সময় নিয়ে যাচাই করে নির্ভুল সংবাদ প্রকাশ করাই দীর্ঘমেয়াদে সংবাদমাধ্যমের জন্য বেশি মূল্যবান।
কারণ পাঠক ভুল ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু বারবার ভুল তথ্য পেলে আস্থা হারান।
আস্থার সংকট তাই সত্য সংবাদ প্রকাশের পথে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। সংবাদমাধ্যম যখন কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে, তখন পাঠকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়—এই সংবাদ কি সত্যিই তথ্যভিত্তিক, নাকি কোনো পক্ষের স্বার্থে তৈরি?
একটি সংবাদপত্রের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ খুব কমই আছে।
সংবাদমাধ্যমের উচিত কোনো পক্ষের মুখপাত্র না হয়ে জনগণের তথ্যের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সরকার ভালো কাজ করলে সেটিও সংবাদ; সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হলে সেটিও সংবাদ। বিরোধী দলের ইতিবাচক উদ্যোগ যেমন সংবাদ হতে পারে, তেমনি তাদের ভুল বা অনিয়মের বিষয়ও সংবাদ হতে পারে। সাংবাদিকতার মাপকাঠি হওয়া উচিত না—‘কার পক্ষে?’ বরং হওয়া উচিত—‘তথ্যটি সত্য কি না এবং এটি জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ কি না?’
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সাংবাদিকের নিজের পক্ষপাত।
সাংবাদিকও একজন মানুষ। তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ, অপছন্দ, রাজনৈতিক বা সামাজিক ধারণা থাকতে পারে। কিন্তু সংবাদ লেখার সময় ব্যক্তিগত অবস্থানকে তথ্যের ওপর বসিয়ে দিলে সাংবাদিকতা দুর্বল হয়। মতামত ও সংবাদ এক জিনিস নয়। সম্পাদকীয় বা কলামে মতামত প্রকাশের সুযোগ আছে, কিন্তু সংবাদ প্রতিবেদনে তথ্যের যথার্থতা এবং ভারসাম্য অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
এখানে সম্পাদকের দায়িত্বও কম নয়। একজন অভিজ্ঞ সম্পাদক শুধু ভাষা সংশোধন করেন না; তিনি সংবাদটির ভেতরের প্রশ্নগুলোও দেখেন। তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, বক্তব্যের ভারসাম্য আছে কি না, শিরোনাম প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং কোনো শব্দ অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি করছে কি না—এসব বিবেচনা করতে হয়।
বিশেষ করে দুর্ঘটনা, মৃত্যু, যৌন সহিংসতা, শিশু, আত্মহত্যা বা পারিবারিক সংকটের মতো সংবেদনশীল ঘটনায় সাংবাদিকতার মানবিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হলেও সব তথ্য প্রকাশ করা সবসময় নৈতিক নয়। কোনো ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশে যদি তার বা পরিবারের আরও ক্ষতি হয়, তাহলে জনস্বার্থ ও ব্যক্তিগত মর্যাদার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে।
সত্য সংবাদ মানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন অযথা প্রকাশ করা নয়। সত্য সংবাদ মানে মানুষের জানার অধিকারকে সম্মান করা—একই সঙ্গে মানুষের মর্যাদাকেও সম্মান করা।
আমাদের দেশে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের বাস্তবতাও কম কঠিন নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের সময়, অর্থ, যাতায়াত ও নিরাপত্তা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। অনেক স্থানীয় সংবাদ হয়তো জাতীয় পর্যায়ের বড় খবরের মতো আলোচিত নয়, কিন্তু সেই খবরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে একটি এলাকার মানুষের জীবন ও অধিকার।
তাই সত্য সাংবাদিকতার জন্য শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন মাঠে যাওয়ার মানসিকতা।
কাগজে বসে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে সব সংবাদ তৈরি করা যায় না। অনেক সত্য মানুষের মুখে, মাঠের বাস্তবতায়, সরকারি-বেসরকারি নথিতে এবং ঘটনাস্থলের পরিবেশে লুকিয়ে থাকে। সেই সত্য খুঁজে বের করতে সাংবাদিককে প্রশ্ন করতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়, কখনো একই জায়গায় একাধিকবার যেতে হয়।
এ কারণেই সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়; এটি এক ধরনের জনদায়িত্ব।
তবে সত্য প্রকাশের দায়িত্ব সাংবাদিকের একার নয়। সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পাঠক—সব পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। সাংবাদিক সত্য তথ্য খুঁজবেন, সম্পাদক তা যাচাই করে প্রকাশ করবেন, প্রশাসন তথ্য গোপন না করে প্রয়োজনীয় তথ্যের সুযোগ সৃষ্টি করবে, আর পাঠকও যাচাইহীন তথ্যকে অন্ধভাবে বিশ্বাস বা প্রচার করবেন না।
একটি সুস্থ গণমাধ্যম পরিবেশ তৈরি হয় যখন প্রশ্ন করার অধিকার এবং জবাব দেওয়ার সংস্কৃতি—দুটিই শক্তিশালী থাকে।
সবশেষে বলা যায়, সত্য সংবাদ প্রকাশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল চাপ নয়, কেবল গুজব নয়, কেবল প্রযুক্তিও নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো—সব প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যকে সত্য হিসেবে চিহ্নিত করার এবং সেটিকে দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশ করার নৈতিক সাহস ধরে রাখা।
সাংবাদিকের হাতে কলম আছে, ক্যামেরা আছে, প্রযুক্তি আছে; কিন্তু এগুলোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বিবেক। তথ্যের পেছনে ছুটতে হবে, কিন্তু তথ্যের প্রতি সততাও রাখতে হবে। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে হবে, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না। দ্রুত সংবাদ দিতে হবে, কিন্তু যাচাইয়ের জায়গায় তাড়াহুড়ো করা যাবে না।
একটি সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত প্রতিটি সংবাদ আসলে পাঠকের সঙ্গে একটি নীরব চুক্তি—‘আমরা যা জানাচ্ছি, তা জানার মতো এবং যথাসম্ভব যাচাই করা।’
এই চুক্তি ভেঙে গেলে সংবাদপত্রের কাগজ থাকে, ওয়েবসাইট থাকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ থাকে; কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি থাকে না—পাঠকের আস্থা।
আর যে সংবাদমাধ্যম পাঠকের আস্থা হারায়, তার সামনে সবচেয়ে বড় সংকট তখন আর সংবাদ প্রকাশের নয়; সংকট হয়ে দাঁড়ায় তার অস্তিত্বের অর্থই।

-লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা

Share this news as a Photo Card