ঢাকা, বাংলাদেশ || শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220

অনিয়ম দূর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় ধ্বংশের পথে গাজীপুরের সাফারি পার্ক

মৃণাল চৌধুরী সৈকত

নানা অনিয়ম দূর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় ধ্বংশের পথে যাত্র করছে গাজীপুরের সাফারি পার্ক।
এতে করে এক সময় দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির প্রাণী আর দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকা পার্কটি দিন দিন হারাচ্ছে জৌলুস। একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু, চুরি ও নিখোঁজের ঘটনায় কমছে প্রাণীর সংখ্যা। এর সঙ্গে রয়েছে ইজারার বকেয়া, প্রাণীর খাবারের নিম্মমান নিয়ে অভিযোগ এবং দর্শনার্থীদের অতিরিক্ত টাকা আদায়, পরিবহন ব্যকস্থার স্বল্পতা এবং ইভটিজিংসহ নানা ভোগান্তি।
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত পার্কটি শুরুতে দেশি-বিদেশি বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। থাইল্যান্ডের সাফারি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে মিল রেখে পার্কটি তৈরি করা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। এখানে প্রাণীরা উন্মুক্ত পরিবেশে থাকবে আর দর্শনার্থীরা নিরাপত্তাবেষ্টিত গাড়িতে ঘুরে সেগুলো দেখবেন-এমন পরিকল্পনা নিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল পার্কটির।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে নানা অনিয়ম দূর্নীতি এবং অবহেলায় কমতে থাকে এর জৌলুস। প্রতি অর্থবছরে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও পার্কের অবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে বিনোদনমুখী পরিদর্শনকারীদের।
পার্কটিতে গত কয়েক বছরে একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহীর মৃত্যু হয়। এর আগেও অবহেলা অযত্নে আর রহস্যজনক খাদ্যবভাবে একটি হাতি মারা যায়।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর পার্ক থেকে দুটি ম্যাকাও চুরি হয়। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি একটি নীলগাই পার্ক থেকে নিখোঁজ হয়। একই বছরের মার্চে পার্ক থেকে তিনটি আফ্রিকান রিংটেইল লেমুর চুরি হয়। সবশেষ গত ৬ ও ৭ আগস্ট অযত্নে অবহেলা আর খাদ্যবভাবসহ অজ্ঞাকত কারনে পরপর দুটি হাতির মৃত্যু হয়।
পার্ক প্রতিষ্ঠার সময় বিদেশ থেকে ১২টি জিরাফ আনা হয়েছিল। পরে জিরাফগুলো চারটি বাচ্চার জন্ম দেয়। কিন্তু একে একে সব জিরাফ মারা যায়। ২০২৫ সালে মারা যায় সর্বশেষ জিরাফটি। এরপর থেকে পার্কটি জিরাফশূন্য।
২০১৩ সালে তিনটি ক্যাঙ্গারুও আনা হয়েছিল। ২০১৭ সালে একটি ক্যাঙ্গারু একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। পরে সেগুলোও মারা যায়। এসব পশুগুলো মারা যায় তার কোন সুর্নিদিষ্ট তধ্য পাওয়া যায়নি।
পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট রাতে পাচারকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লাভবার্ড, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, ময়ূর ও দুটি লেমুরসহ বিপুলসংখ্যক পাখি ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ ও ঢাকা কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। পরে সেগুলো বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরদিন উদ্ধার করা পাখি ও প্রাণীগুলো সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
উদ্ধার হওয়া লেমুর থেকে পরে পার্কে একজোড়া বাচ্চার জন্ম হয়। ২০২২ সালে একটি লেমুর মারা যায়। ২০২৫ সালের মার্চে পার্ক থেকে তিনটি লেমুর চুরি হলে পার্কটি লেমুরশূন্য হয়ে পড়ে।
ওই বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে চুরি হওয়া একটি পুরুষ রিংটেইল লেমুর উদ্ধার করা হয়। বাকি দুটি লেমুর ভারতে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। লেমুরগুলো কীভাবে পার্ক থেকে চুরি হয়ে দেশের বাইরে গেল, তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বর্তমানে অন্যান্য পশু-পাখিগুলো কি অবস্থায় আছে তা সুর্নিদিষ্ট ভাবে জানাতে পারেনি পার্ক কর্তৃপক্ষ।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভাওয়ালের শালবনের ৩ হাজার ৮১০ একর ভূমি পার্ক এলাকার অন্তর্ভুক্ত। একসময় এখানে বিশাল বৃক্ষের সমাহার থাকলেও গাছ চুরি ও পাচারের কারণে বনের গাছপালা কয়েকগুন কমছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পার্কটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক তপন দের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাজ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণে অনিয়ম, বিদেশ থেকে প্রাণী আমদানিতে অনিয়ম এবং পার্কের জায়গার একটি অংশ বাদ রেখে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। কর্মচারী নিয়োগেও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল তৎসময়।
পার্ক প্রতিষ্ঠার পর মূল গেটসহ বিভিন্ন ইভেন্ট ইজারা দেওয়া হলেও বিগত সময়ে ইজারার প্রায় ৮ কোটি টাকা আদায় করতে পারেনি বন বিভাগ। পাওনা টাকা আদায়ে মামলাও হয়েছে সে সময়।
পার্কটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালনার কথা থাকলেও কয়েক বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত বন বিভাগ নিজেরাই পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, ইজারা ও রাজস্ব আদায়ে অনিয়ম এবং দূর্নীতির কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
পার্কের মূল ফটক ও কোর সাফারি ইজারা দিয়ে বছরে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু করোনার পর থেকে কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ার কথা বলে ইজারা দেওয়া হচ্ছে না। বন বিভাগ নিজেরা পরিচালনা করলেও এসব খাত থেকে বছরে কত টাকা আয় হচ্ছে আর কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তার হিসাব নিয়েও নানা ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।
বন্য প্রাণীদের খাবারের মান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে অভিযোগ। নিম্নমানের খাবার সরবরাহের কারণে অনেক প্রাণী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে আবার অনেক প্রানী মারা গেছে বলে অভিযোগ। বেশ কয়েক বছর ধরে বাঘ ও সিংহের প্রজননও রয়েছে বন্ধ।
বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বিনোদমুখী দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধার অবস্থাও ভালো নয়। বিশাল পার্ক ঘুরতে গিয়ে রোদ বা বৃষ্টিতে আশ্রয় নেওয়ার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ভেতরে খাবারেরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া বখাটেদের উৎপাতের ফলে অনেক দর্শনার্থী বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে পার্ক ত্যাগ করেন।
এসব খবর ছড়িয়ে পড়ায় দর্শনার্থীরা আর আসতে চাননা এখানে।
পার্কের ভেতরে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকারও অভিযোগ রয়েছে। গত ২৯ আগস্ট পার্কের ভেতরে বখাটে এবং কর্মচারীদের সঙ্গে দর্শনার্থীদের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, কম জনবল নিয়ে পার্ক ব্যবস্থাপনা সত্যিই অনেক কষ্টের। এরপরও আমরা চেষ্টা করছি। ইজারাদার পাওয়া গেলে কাজ করতে সুবিধা হতো। তবে পার্ক পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম. কে. এম. ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, আমরা বেশ কয়েকবার দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় ইজারা দেওয়া যাচ্ছে না। ৫ আগস্টের পর পার্কের নানা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব কাটিয়ে উঠতে বন বিভাগের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
একসময় দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় বন্যপ্রাণী পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের সাফারি পার্ক এখন একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু, চুরি, নিখোঁজ আর অব্যবস্থাপনায় জৌলুস হারাচ্ছে। পার্কটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা।

Share this news as a Photo Card

সম্পর্কিত খবর :
জনপ্রিয়

দেশের নারীদের শিক্ষায় ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে: রুহুল কবির রিজভী

12 September 2026

প্রতিবন্ধী ও অসহায়দের মাঝে এককালীন আর্থিক অনুদান-চেক বিতরণ

বিস্তারিত পড়তে কমেন্টে লিংক ... |
nagorikbhabna.com

অনিয়ম দূর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় ধ্বংশের পথে গাজীপুরের সাফারি পার্ক

সর্বশেষ পরিমার্জন : ০৫:২৮:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মৃণাল চৌধুরী সৈকত

নানা অনিয়ম দূর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় ধ্বংশের পথে যাত্র করছে গাজীপুরের সাফারি পার্ক।
এতে করে এক সময় দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির প্রাণী আর দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকা পার্কটি দিন দিন হারাচ্ছে জৌলুস। একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু, চুরি ও নিখোঁজের ঘটনায় কমছে প্রাণীর সংখ্যা। এর সঙ্গে রয়েছে ইজারার বকেয়া, প্রাণীর খাবারের নিম্মমান নিয়ে অভিযোগ এবং দর্শনার্থীদের অতিরিক্ত টাকা আদায়, পরিবহন ব্যকস্থার স্বল্পতা এবং ইভটিজিংসহ নানা ভোগান্তি।
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত পার্কটি শুরুতে দেশি-বিদেশি বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। থাইল্যান্ডের সাফারি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে মিল রেখে পার্কটি তৈরি করা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। এখানে প্রাণীরা উন্মুক্ত পরিবেশে থাকবে আর দর্শনার্থীরা নিরাপত্তাবেষ্টিত গাড়িতে ঘুরে সেগুলো দেখবেন-এমন পরিকল্পনা নিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল পার্কটির।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে নানা অনিয়ম দূর্নীতি এবং অবহেলায় কমতে থাকে এর জৌলুস। প্রতি অর্থবছরে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও পার্কের অবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে বিনোদনমুখী পরিদর্শনকারীদের।
পার্কটিতে গত কয়েক বছরে একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহীর মৃত্যু হয়। এর আগেও অবহেলা অযত্নে আর রহস্যজনক খাদ্যবভাবে একটি হাতি মারা যায়।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর পার্ক থেকে দুটি ম্যাকাও চুরি হয়। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি একটি নীলগাই পার্ক থেকে নিখোঁজ হয়। একই বছরের মার্চে পার্ক থেকে তিনটি আফ্রিকান রিংটেইল লেমুর চুরি হয়। সবশেষ গত ৬ ও ৭ আগস্ট অযত্নে অবহেলা আর খাদ্যবভাবসহ অজ্ঞাকত কারনে পরপর দুটি হাতির মৃত্যু হয়।
পার্ক প্রতিষ্ঠার সময় বিদেশ থেকে ১২টি জিরাফ আনা হয়েছিল। পরে জিরাফগুলো চারটি বাচ্চার জন্ম দেয়। কিন্তু একে একে সব জিরাফ মারা যায়। ২০২৫ সালে মারা যায় সর্বশেষ জিরাফটি। এরপর থেকে পার্কটি জিরাফশূন্য।
২০১৩ সালে তিনটি ক্যাঙ্গারুও আনা হয়েছিল। ২০১৭ সালে একটি ক্যাঙ্গারু একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। পরে সেগুলোও মারা যায়। এসব পশুগুলো মারা যায় তার কোন সুর্নিদিষ্ট তধ্য পাওয়া যায়নি।
পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট রাতে পাচারকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লাভবার্ড, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, ময়ূর ও দুটি লেমুরসহ বিপুলসংখ্যক পাখি ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ ও ঢাকা কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। পরে সেগুলো বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরদিন উদ্ধার করা পাখি ও প্রাণীগুলো সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
উদ্ধার হওয়া লেমুর থেকে পরে পার্কে একজোড়া বাচ্চার জন্ম হয়। ২০২২ সালে একটি লেমুর মারা যায়। ২০২৫ সালের মার্চে পার্ক থেকে তিনটি লেমুর চুরি হলে পার্কটি লেমুরশূন্য হয়ে পড়ে।
ওই বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে চুরি হওয়া একটি পুরুষ রিংটেইল লেমুর উদ্ধার করা হয়। বাকি দুটি লেমুর ভারতে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। লেমুরগুলো কীভাবে পার্ক থেকে চুরি হয়ে দেশের বাইরে গেল, তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বর্তমানে অন্যান্য পশু-পাখিগুলো কি অবস্থায় আছে তা সুর্নিদিষ্ট ভাবে জানাতে পারেনি পার্ক কর্তৃপক্ষ।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভাওয়ালের শালবনের ৩ হাজার ৮১০ একর ভূমি পার্ক এলাকার অন্তর্ভুক্ত। একসময় এখানে বিশাল বৃক্ষের সমাহার থাকলেও গাছ চুরি ও পাচারের কারণে বনের গাছপালা কয়েকগুন কমছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পার্কটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক তপন দের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাজ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণে অনিয়ম, বিদেশ থেকে প্রাণী আমদানিতে অনিয়ম এবং পার্কের জায়গার একটি অংশ বাদ রেখে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। কর্মচারী নিয়োগেও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল তৎসময়।
পার্ক প্রতিষ্ঠার পর মূল গেটসহ বিভিন্ন ইভেন্ট ইজারা দেওয়া হলেও বিগত সময়ে ইজারার প্রায় ৮ কোটি টাকা আদায় করতে পারেনি বন বিভাগ। পাওনা টাকা আদায়ে মামলাও হয়েছে সে সময়।
পার্কটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালনার কথা থাকলেও কয়েক বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত বন বিভাগ নিজেরাই পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, ইজারা ও রাজস্ব আদায়ে অনিয়ম এবং দূর্নীতির কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
পার্কের মূল ফটক ও কোর সাফারি ইজারা দিয়ে বছরে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু করোনার পর থেকে কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ার কথা বলে ইজারা দেওয়া হচ্ছে না। বন বিভাগ নিজেরা পরিচালনা করলেও এসব খাত থেকে বছরে কত টাকা আয় হচ্ছে আর কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তার হিসাব নিয়েও নানা ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।
বন্য প্রাণীদের খাবারের মান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে অভিযোগ। নিম্নমানের খাবার সরবরাহের কারণে অনেক প্রাণী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে আবার অনেক প্রানী মারা গেছে বলে অভিযোগ। বেশ কয়েক বছর ধরে বাঘ ও সিংহের প্রজননও রয়েছে বন্ধ।
বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বিনোদমুখী দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধার অবস্থাও ভালো নয়। বিশাল পার্ক ঘুরতে গিয়ে রোদ বা বৃষ্টিতে আশ্রয় নেওয়ার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ভেতরে খাবারেরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া বখাটেদের উৎপাতের ফলে অনেক দর্শনার্থী বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে পার্ক ত্যাগ করেন।
এসব খবর ছড়িয়ে পড়ায় দর্শনার্থীরা আর আসতে চাননা এখানে।
পার্কের ভেতরে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকারও অভিযোগ রয়েছে। গত ২৯ আগস্ট পার্কের ভেতরে বখাটে এবং কর্মচারীদের সঙ্গে দর্শনার্থীদের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, কম জনবল নিয়ে পার্ক ব্যবস্থাপনা সত্যিই অনেক কষ্টের। এরপরও আমরা চেষ্টা করছি। ইজারাদার পাওয়া গেলে কাজ করতে সুবিধা হতো। তবে পার্ক পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম. কে. এম. ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, আমরা বেশ কয়েকবার দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় ইজারা দেওয়া যাচ্ছে না। ৫ আগস্টের পর পার্কের নানা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব কাটিয়ে উঠতে বন বিভাগের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
একসময় দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় বন্যপ্রাণী পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের সাফারি পার্ক এখন একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু, চুরি, নিখোঁজ আর অব্যবস্থাপনায় জৌলুস হারাচ্ছে। পার্কটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা।

Share this news as a Photo Card