ঢাকা, বাংলাদেশ। , শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

ডিজিটাল ব্যালটে প্রবাসীর ভোট, গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত নাকি নতুন সংশয়?

এসএম রায়হান মিয়া
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:৫৩:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১৭২ বার পঠিত

নির্বাচনের ইতিহাস যখনই খুঁটিয়ে দেখা হয়, তখন দেখা যায় ভোট না দেওয়া দল বা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক অশক্তিকর ফাঁক রয়ে যায়। প্রবাসী জনগোষ্ঠী, যারা অর্থচেনা থেকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কোরশক্তিতে বড় অবদান রেখে আসছেন, তাদের ভোটাধিকার অনেকদিন ধরেই অপূর্ণাংশ রয়ে গেছে। সেই অপূর্ণাঙ্গকে পূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তÑপ্রবাসীদের জন্য চড়ংঃধষ ঠড়ঃব ইউ” নামে একটি অ্যাপ ১৬ নভেম্বর উন্মুক্ত করার ঘোষণা, সততাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পলিটিক্যাল মাইলফলক। তবে এই মাইলফলককে কেবল আনন্দের অভিব্যক্তি ভাবলে হবে না; এটিকে ঘিরে আছেন জটিলতা, সন্দেহ, সম্ভাবনা ও নৈতিক প্রশ্ন, সবকিছুই। এই কলামে আমি সেইসব দিকগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখাবো: কেন এই অ্যাপ দরকার, কোন ক্ষেত্রে এটির ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, কোথায় ঝুঁকি রয়েছে, প্রশাসনিক ও আইনি প্রস্ততি কীরকম থাকা উচিত, এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রবাসীরা শুধু অর্থশক্তি নয়; তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিও। যে দেশের মানুষ দূরে গিয়ে শ্রম, দক্ষতা এবং মেধা নিয়ে বিদেশে অবস্থান করে, সেই মানুষটির কাছে দেশের রাজনীতিও বড় একটি দায়িত্ব। তাদের রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি টিকে থাকে, এটাই বাস্তবতা। তবে অর্থিক প্রদানের সাথে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার সংযুক্ত না হলে সেই সম্পর্ক সার্বিকভাবে অসম্পূর্ণ থাকে। প্রবাসীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করাটা কেবল ন্যায়সঙ্গত আচরণ নয়, এটা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাই যখন নির্বাচন কমিশন ডিজিটালভাবে প্রবাসীদের জন্য ভোটের পথ খুলে দিতে চায়, সেটা গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কিন্তু যে প্রক্রিয়া ডিজিটাল তার সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে থাকে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, তথ্যগত স্বচ্ছতা, এবং আইনি প্রতিরক্ষাm এই তিনটি স্তম্ভ। এগুলোর প্রতিটি যদি দুর্বল হয়, তাহলে প্রযুক্তির দ্বারা প্রদত্ত সুবিধা সহজেই ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
প্রথমত, এই উদ্যোগের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে কথা বলা যাক। ডিজিটাল ভোটিং অ্যাপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নিরপেক্ষ, সময়োপযোগী এবং সহজ প্রবেশাধিকার। কাগজভিত্তিক পোস্টাল ভোট যেখানে সপ্তাহ বা মাস ধরে বিলম্বিত হত, সেখানে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করলে প্রবাসীরা ঘরে বসে, নিজ শহর কিংবা দূতাবাস ছাড়াই নিরাপদভাবে ভোটদান করতে পারবে। এটি বিশেষ করে করোনাকালের অভিজ্ঞতা এবং ডিজিটাল সেবায় মানুষের বাড়তি আকর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বাস্তবিক অগ্রগতি। তরুণ প্রবাসীরাও প্রগতিশীল তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় সহজেই নাম লেখাতে ও ভোট দিতে সক্ষম হবে, এটি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম খুলে দেবে। এছাড়া প্রবাসীদের ভোট রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সংবেদনশীল করবে, নীতিনির্ধারণকারীরা যদি লক্ষ করেন যে বিদেশে থাকা মানুষজন কেবল অর্থই নয়, ভোটও দিচ্ছেন, তাহলে দেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা ও নিয়ম-নীতি আরও দৃঢ় হবে।
দ্বিতীয়ত, অ্যাপের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সেকেন্ডারি সুবিধাও আছে, ডেটা ক্লিনিং, দ্রুত গণনা ও স্বচ্ছতা। অনলাইন পদ্ধতি ব্যবহার করলে প্রাথমিকভাবে ব্যালট সংগ্রহ, যাচাই ও গণনার সময় কমে যাবে; ভুল-ত্রুটি সনাক্তকরণ সহজতর হবে; এবং পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে লগ-ফাইলের মাধ্যমে তদন্ত করা যায়। ডিজিটাল পদ্ধতিতে যদি বিশুদ্ধ এনক্রিপশন, দুই-স্তরের অথেনটিকেশন, এবং অনমনীয় অডিট-ট্রেইল থাকে, তাহলে ভোটের স্বচ্ছতা বাড়ে এবং ফলাফল ভুয়া ঘোষণা বা কাগজপত্রে সম্ভাব্য জোড়াতালি কম হয়। তদুপরি, প্রবাসীদের আলাদা ব্যালট ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত, যা কমিশনারের বক্তব্যে দেখা গেছে, প্রযুক্তিগতভাবে স্বাধীনতা দিয়ে দেয় যে তাদের ভোট অনন্যভাবে ট্যাগ করা যাবে; ফলে সেগুলো আলাদাভাবে যাচাইও করা সহজ হবে।
তবে সবকিছুই শুভ ও ঝকঝকে নয়, এখানে জড়িয়ে থাকে বড় ধরনের ঝুঁকি। সবচেয়ে মনস্তাপপ্রদ সমস্যা হলো সাইবার নিরাপত্তা। ডিজিটাল ভোটিং অ্যাপ হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্যাকারদের লক্ষ্যবস্তু হবে। সরকারি তথ্যভাণ্ডার ও ভোটকেন্দ্রিক সার্ভারগুলোতে যদি পেন-টেস্টিং, রেড-টিমিং, বাগ বাউন্টি প্রক্রিয়া, এবং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের অডিট না করা হয়, তাহলে একটি কাঙ্খিত আক্রমণ সম্পূর্ণ নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করতে পারে। একটি সফল বিশ্বের হ্যাকাররা যদি নির্বাচনী ডেটা বদলে দেয়, অথবা ভোট প্রদানের লগ ফাইল মুছে দেয়, তখন কেবল প্রযুক্তিগত প্রশ্ন থাকবে না; জাতীয় স্তরে একটি গণতান্ত্রিক সঙ্কট শুরু হবে। এজন্য অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের শুরু থেকেই কনফিগারেশন লেয়ার, এনক্রিপশন প্রটোকল, সার্ভার লোকেশন, ডেটা রিডান্ডেন্সি, এবং ব্যাকআপ স্ট্র্যাটেজি। এটি করা না হলে ‘ডিজিটাল ভোট’ নামে যে কিছু সূচিত হচ্ছে, তা রূপান্তরিত হয়ে ‘প্রদর্শনী ভোট’ হয়ে যায়, যার রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্য।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভোটার শনাক্তকরণ, কারণ এনআইডি নম্বর ব্যবহার করা হলে কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে যে যে লোগ-ইন করা হয়েছে সে সত্যিই প্রবাসী ব্যক্তি? শুধুমাত্র এনআইডি নম্বর মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়; কারণ কোনো ব্যক্তি তার পরিচয় কারো হাতে তুলে দিতে পারে বা ডেটা লিকজনিত ভুয়া একাউন্ট তৈরি হতে পারে। এজন্য দরকার বহু-স্তরীয় অথেনটিকেশন, ফেস ভেরিফিকেশন, লাইভনেস ডিটেকশন, বায়োমেট্রিক মিল, অথবা দূতাবাস-ভেরিফায়েড কোড ইস্যু করা ইত্যাদি। তাছাড়া দেশের বাইরে প্রবাসীরা এমন দেশে থাকতে পারে যেখানে আইটি অবকাঠামো সীমিত; সেখানে ফেসভেরিফিকেশন বা উচ্চ ব্যান্ডউইথ যাচাই করা কঠিন। সেক্ষেত্রে বিকল্প সিস্টেম যেমন সিম-কনফার্মেশন, দূতাবাসের অনলাইন ভেরিফিকেশন, অথবা দ্বি-পদক্ষেপীয় কোডিং ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে এগুলোও যথেষ্ট শক্তভাবে ডিজাইন করা লাগবে।
আইনি ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পোস্টাল ভোটের আইনি কাঠামো ছিল, কিন্তু তা কাগজভিত্তিক পদ্ধতির জন্য বানানো। ডিজিটাল ভোটের জন্য পৃথক আইনি বিধি প্রণয়ন না করে কোন রকম প্রশাসনিক আদেশে এটি চালু করা হলে ভবিষ্যতে এটি সহজেই আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। নির্বাচন কমিশনকে উচিত এই উদ্যোগকে কার্যকর করার আগে সংসদে একটি স্পষ্ট বিধান প্রস্তাব করা, যাতে ডিজিটাল ভোটিংয়ের বৈধতা, তত্ত্বাবধান, অডিট, পুনর্গণনা ও ফলাফল চ্যালেঞ্জের নিয়ম স্পষ্ট করে দেয়া থাকে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দেওয়ার বন্দোবস্ত থাকতে হবে; কারণ একটি নতুন পদ্ধতির স্বীকৃতি পেতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং তৃতীয় পক্ষের অডিট তুলনীয় সহায়ক হবে। যদি নির্বাচন-সংক্রান্ত আইনি জট কাটিয়ে উঠতে না পারে, তবে এই উদ্যোগ দ্রুত রাজনৈতিক বিবাদ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে যেখানে বুরুজ-ধারণকারী আসনগুলো সংকীর্ণ মার্জিনে নির্ধারিত হয় এবং প্রবাসী ভোটের সংখ্যাই ফলপ্রসূ পার্থক্য তৈরি করে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও অনুধাবন করা জরুরি। প্রবাসী ভোট কিভাবে রাজনৈতিক ভারসাম্য পাল্টাতে পারে, এটি নির্ভর করে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং নির্বাচনী এলাকার গঠনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর। কোনো কোনো আসনে প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা একটি নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো বিদেশে প্রচারণা-লোকসামগ্রী, মিডিয়া ক্যাম্পেইন, এবং প্রবাসী নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া শুরু করবে। এটি স্বাভাবিকভাবে নেতিবাচকও হতে পারে, বহুজাতিক কর্পোরেট বা বিদেশি কূটনীতিক প্রভাব ঢোকে বেড়াতে পারে, অথবা প্রবাসী সংগঠনগুলো যদি অপরীক্ষিতভাবে আর্থিকভাবে প্রভাবিত হয়, তবে তা রাজনৈতিক দুর্নীতির পথ সুগম করতে পারে। সে কারণে একটি নৈতিক নীতি (পড়ফব ড়ভ পড়হফঁপঃ) প্রনয়ন আবশ্যক, যেখানে ডিজিটাল প্রচারণার নিয়ম, প্রবাসীদের উদ্দেশ্যভিত্তিক টার্গেটিং বন্ধ করা, এবং বিদেশি তহবিল থেকে রাজনৈতিক প্রচারণায় আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
আরও একটি বিবেচ্য বিষয় হলো তথ্যের বিভ্রান্তি। বিদেশে থাকা প্রবাসীরা অনেক সময় তথ্যের সূত্র হিসেবে সামাজিক মিডিয়ার ওপর নির্ভরশীল। সেখানে গুজব, ম্যাসেজিং গ্রুপ, এবং বট সম্প্রচার দ্বারা সহজেই ভুল তথ্য ছড়ানো যায়। যদি ভোটাররা বিভ্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে নির্বাচনের সংবেদনশীলতা বাড়বে। নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই প্রবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট তথ্য প্রচারণা, ফ্যাক্ট-চেক ইউনিট, এবং দ্বিভাষিক (বাংলা ও ইংরেজি) গাইডলাইন সরবরাহ করতে হবে, যা তাদেরকে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি ব্যবহারকারী-শিক্ষা চালানো অত্যাবশ্যক, কোনভাবে অ্যাপটি ডাউনলোড এবং ব্যবহারের পদ্ধতি, নিরাপত্তা টিপস, নম্বর-ভেরিফিকেশন, এগুলো স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
প্রশাসনিক দিক থেকে দেখা গেলে, একটি সফল বাস্তবায়নের জন্য তিনটি স্তম্ভ থাকা দরকার, প্রযুক্তিতে শক্ততা, আইনগত সমর্থন, এবং জনসচেতনতা। প্রযুক্তিগত স্তম্ভে দরকার হবে স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট, উন্মুক্ত সোর্স বা নিয়মিত কোড রিভিউ (যেখানে সম্ভব), এবং সার্ভার আর্কিটেকচারে এমন ব্যবস্থা যাতে একক লাইনে আক্রমণ হলে সিস্টেম ভেঙে না যায়। আইনি স্তম্ভে দরকার হবে পরিষ্কার নিয়মাবলী, কীভাবে প্রবাসীর ভোট গোনা হবে, কাকে পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকার থাকবে, কিভাবে পুনর্গণনা করা হবে ইত্যাদি। জনসচেতনতার স্তম্ভে দরকার হবে প্রশিক্ষণ, ভাষ্য, এবং প্রচারণা, বিশেষ করে যেখানে প্রবীণ প্রবাসীরা প্রযুক্তিগতভাবে অনভিজ্ঞ, তাদের জন্য সাহায্য সেন্টার ও দূতাবাসের সহযোগিতার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
আরেকটি দিক যা মানুষ প্রায়শই উপেক্ষা করে তা হলো বহুজাতিক আইনগত জটিলতা। প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব নেয়া/নেওয়ার পরিস্থিতিতে থাকতে পারেন; কখনো কখনো দ্বৈত নাগরিকত্ব সমস্যা তারা পড়তে পারে। আইনীভাবে কোথায় কী গ্রহণযোগ্য হবে, অধিবাসী দেশের আইন কেমন, এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। কিছু দেশে অনলাইন ভোটিং বা নির্দিষ্ট ডিজিটাল পদ্ধতি আইনত অনুমোদনযোগ্য নাও হতে পারে; সেখানে প্রবাসী ভোটাররা অংশগ্রহণ করতে গেলে দেশের নীতিনির্ধারক ও ঐ দেশের আইনগত বাধ্যবাধকতা-সহ কাজ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়গুলো নিয়ে কৌশলগত আলোচনায় ব্যস্ত হতে হবে, দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে দেশগুলোর সাথে সমঝোতা গড়ে তোলা, সেখানকার আইনি বিধানগুলো অনুসরণ করা শেখানো ইত্যাদি।
অবশেষে, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কিভাবে রূপান্তরিত করতে পারে, এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে প্রবাসীদের সংযুক্তিকরণ কেবল সংখ্যাগত নয়; এটি মানসিক ও নৈতিক সংযুক্তি হবে। প্রবাসী নেতারা যে বিষয়ে আগ্রহী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ-নীতি, এসব নীতির ওপর তাদের প্রভাব পড়বে। তারা কেবল অর্থ পাঠানোই নয়, দেশের নীতিনির্ধারণেও অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু সফলতার জন্য দরকার নিরবচ্ছিন্ন প্রতিশ্রুতি, নিরাপত্তায় বিনিয়োগ, আইনি সুরক্ষা, এবং স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি। আর যদি আমরা এই পথ বেছে নেই এবং তাড়াহুড়ো করে অসম্পূর্ণভাবে খুলে দিই, তাহলে ফলাফল হবে আস্থা-ভঙ্গ; এবং আস্থা পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে না।
নির্বাচন কমিশনকে উচিত, অ্যাপ মুক্তির আগেই অন্তত একটি পাইলট-রান সম্পন্ন করা, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট দেশের প্রবাসীরা অংশ নিয়ে পদ্ধতির স্বচ্ছতা যাচাই করবে; পাশাপাশি স্বাধীন সাইবার সিকিউরিটি ফার্মের অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। আইনি বিভাগকে নির্বাচন-আইন সংশোধনের প্রস্তাব দ্রুততম সময়ে উপস্থাপন করতে হবে; যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় স্পষ্ট দিশা থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোকে উত্সাহিত করা উচিত যে তারা প্রবাসীদের সাথে নৈতিকভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে, অর্থাৎ বিদেশি তহবিল গ্রহণ না করা, লক্ষ্যভিত্তিক ডিজিটাল প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকা, এবং ফ্যাক্ট-চেক মেকানিজম মেনে চলা। প্রবাসী সংগঠনগুলোকেও সচেতন হতে হবে যে তাদের প্রদেশেই নয়, দেশীয় রাজনীতিতেও তাদের প্রতিনিধি-হিসেবে নৈতিক আচরণ বজায় রাখতে হবে।
এই কয়েকটি নীতি যদি মেনে চলা যায়, তাহলে চড়ংঃধষ ঠড়ঃব ইউ হতে পারে কেবল একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এটি হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও গভীর, বিস্তৃত ও নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার একভাবে দিশাহীন আগমন। আর যদি এসব ব্যর্থ হয়, তাহলে ডিজিটাল ভোটিং হয়ে উঠবে ক্ষমতার দখলে নতুন এক মাধ্যম, যা গণতান্ত্রিক নৈতিকতাকে ক্ষুন্ন করবে। কাজেই এ সিদ্ধান্তকে উত্সবের সঙ্গে গ্রহণ করার আগে আমাদের দায়িত্ব হলো সচেতন হওয়া, প্রশ্ন করা, এবং জানালে সম্মতি দেওয়া, কারণ গণতন্ত্র টিকে আছে আস্থায়, এবং সেই আস্থা যদি প্রযুক্তির আড়ালে হারায়, তবে সব হারিয়ে যাবে। ১৬ নভেম্বর শুধু একটি তারিখ নয়; এটি একটি পরীক্ষার তারিখ, যেখানে আমরা দেখব প্রযুক্তি কি আমাদের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের সঙ্গী হতে পারবে, নাকি কেবল একটি তাত্ক্ষণিক প্রদর্শনী হয়ে থেকে যাবে।

– লেখক: সিনিয়র শিক্ষক ও কলাম, গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

ডিজিটাল ব্যালটে প্রবাসীর ভোট, গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত নাকি নতুন সংশয়?

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:৫৩:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫

নির্বাচনের ইতিহাস যখনই খুঁটিয়ে দেখা হয়, তখন দেখা যায় ভোট না দেওয়া দল বা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক অশক্তিকর ফাঁক রয়ে যায়। প্রবাসী জনগোষ্ঠী, যারা অর্থচেনা থেকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কোরশক্তিতে বড় অবদান রেখে আসছেন, তাদের ভোটাধিকার অনেকদিন ধরেই অপূর্ণাংশ রয়ে গেছে। সেই অপূর্ণাঙ্গকে পূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তÑপ্রবাসীদের জন্য চড়ংঃধষ ঠড়ঃব ইউ” নামে একটি অ্যাপ ১৬ নভেম্বর উন্মুক্ত করার ঘোষণা, সততাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পলিটিক্যাল মাইলফলক। তবে এই মাইলফলককে কেবল আনন্দের অভিব্যক্তি ভাবলে হবে না; এটিকে ঘিরে আছেন জটিলতা, সন্দেহ, সম্ভাবনা ও নৈতিক প্রশ্ন, সবকিছুই। এই কলামে আমি সেইসব দিকগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখাবো: কেন এই অ্যাপ দরকার, কোন ক্ষেত্রে এটির ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, কোথায় ঝুঁকি রয়েছে, প্রশাসনিক ও আইনি প্রস্ততি কীরকম থাকা উচিত, এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রবাসীরা শুধু অর্থশক্তি নয়; তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিও। যে দেশের মানুষ দূরে গিয়ে শ্রম, দক্ষতা এবং মেধা নিয়ে বিদেশে অবস্থান করে, সেই মানুষটির কাছে দেশের রাজনীতিও বড় একটি দায়িত্ব। তাদের রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি টিকে থাকে, এটাই বাস্তবতা। তবে অর্থিক প্রদানের সাথে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার সংযুক্ত না হলে সেই সম্পর্ক সার্বিকভাবে অসম্পূর্ণ থাকে। প্রবাসীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করাটা কেবল ন্যায়সঙ্গত আচরণ নয়, এটা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাই যখন নির্বাচন কমিশন ডিজিটালভাবে প্রবাসীদের জন্য ভোটের পথ খুলে দিতে চায়, সেটা গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কিন্তু যে প্রক্রিয়া ডিজিটাল তার সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে থাকে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, তথ্যগত স্বচ্ছতা, এবং আইনি প্রতিরক্ষাm এই তিনটি স্তম্ভ। এগুলোর প্রতিটি যদি দুর্বল হয়, তাহলে প্রযুক্তির দ্বারা প্রদত্ত সুবিধা সহজেই ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
প্রথমত, এই উদ্যোগের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে কথা বলা যাক। ডিজিটাল ভোটিং অ্যাপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নিরপেক্ষ, সময়োপযোগী এবং সহজ প্রবেশাধিকার। কাগজভিত্তিক পোস্টাল ভোট যেখানে সপ্তাহ বা মাস ধরে বিলম্বিত হত, সেখানে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করলে প্রবাসীরা ঘরে বসে, নিজ শহর কিংবা দূতাবাস ছাড়াই নিরাপদভাবে ভোটদান করতে পারবে। এটি বিশেষ করে করোনাকালের অভিজ্ঞতা এবং ডিজিটাল সেবায় মানুষের বাড়তি আকর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বাস্তবিক অগ্রগতি। তরুণ প্রবাসীরাও প্রগতিশীল তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় সহজেই নাম লেখাতে ও ভোট দিতে সক্ষম হবে, এটি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম খুলে দেবে। এছাড়া প্রবাসীদের ভোট রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সংবেদনশীল করবে, নীতিনির্ধারণকারীরা যদি লক্ষ করেন যে বিদেশে থাকা মানুষজন কেবল অর্থই নয়, ভোটও দিচ্ছেন, তাহলে দেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা ও নিয়ম-নীতি আরও দৃঢ় হবে।
দ্বিতীয়ত, অ্যাপের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সেকেন্ডারি সুবিধাও আছে, ডেটা ক্লিনিং, দ্রুত গণনা ও স্বচ্ছতা। অনলাইন পদ্ধতি ব্যবহার করলে প্রাথমিকভাবে ব্যালট সংগ্রহ, যাচাই ও গণনার সময় কমে যাবে; ভুল-ত্রুটি সনাক্তকরণ সহজতর হবে; এবং পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে লগ-ফাইলের মাধ্যমে তদন্ত করা যায়। ডিজিটাল পদ্ধতিতে যদি বিশুদ্ধ এনক্রিপশন, দুই-স্তরের অথেনটিকেশন, এবং অনমনীয় অডিট-ট্রেইল থাকে, তাহলে ভোটের স্বচ্ছতা বাড়ে এবং ফলাফল ভুয়া ঘোষণা বা কাগজপত্রে সম্ভাব্য জোড়াতালি কম হয়। তদুপরি, প্রবাসীদের আলাদা ব্যালট ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত, যা কমিশনারের বক্তব্যে দেখা গেছে, প্রযুক্তিগতভাবে স্বাধীনতা দিয়ে দেয় যে তাদের ভোট অনন্যভাবে ট্যাগ করা যাবে; ফলে সেগুলো আলাদাভাবে যাচাইও করা সহজ হবে।
তবে সবকিছুই শুভ ও ঝকঝকে নয়, এখানে জড়িয়ে থাকে বড় ধরনের ঝুঁকি। সবচেয়ে মনস্তাপপ্রদ সমস্যা হলো সাইবার নিরাপত্তা। ডিজিটাল ভোটিং অ্যাপ হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্যাকারদের লক্ষ্যবস্তু হবে। সরকারি তথ্যভাণ্ডার ও ভোটকেন্দ্রিক সার্ভারগুলোতে যদি পেন-টেস্টিং, রেড-টিমিং, বাগ বাউন্টি প্রক্রিয়া, এবং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের অডিট না করা হয়, তাহলে একটি কাঙ্খিত আক্রমণ সম্পূর্ণ নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করতে পারে। একটি সফল বিশ্বের হ্যাকাররা যদি নির্বাচনী ডেটা বদলে দেয়, অথবা ভোট প্রদানের লগ ফাইল মুছে দেয়, তখন কেবল প্রযুক্তিগত প্রশ্ন থাকবে না; জাতীয় স্তরে একটি গণতান্ত্রিক সঙ্কট শুরু হবে। এজন্য অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের শুরু থেকেই কনফিগারেশন লেয়ার, এনক্রিপশন প্রটোকল, সার্ভার লোকেশন, ডেটা রিডান্ডেন্সি, এবং ব্যাকআপ স্ট্র্যাটেজি। এটি করা না হলে ‘ডিজিটাল ভোট’ নামে যে কিছু সূচিত হচ্ছে, তা রূপান্তরিত হয়ে ‘প্রদর্শনী ভোট’ হয়ে যায়, যার রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্য।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভোটার শনাক্তকরণ, কারণ এনআইডি নম্বর ব্যবহার করা হলে কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে যে যে লোগ-ইন করা হয়েছে সে সত্যিই প্রবাসী ব্যক্তি? শুধুমাত্র এনআইডি নম্বর মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়; কারণ কোনো ব্যক্তি তার পরিচয় কারো হাতে তুলে দিতে পারে বা ডেটা লিকজনিত ভুয়া একাউন্ট তৈরি হতে পারে। এজন্য দরকার বহু-স্তরীয় অথেনটিকেশন, ফেস ভেরিফিকেশন, লাইভনেস ডিটেকশন, বায়োমেট্রিক মিল, অথবা দূতাবাস-ভেরিফায়েড কোড ইস্যু করা ইত্যাদি। তাছাড়া দেশের বাইরে প্রবাসীরা এমন দেশে থাকতে পারে যেখানে আইটি অবকাঠামো সীমিত; সেখানে ফেসভেরিফিকেশন বা উচ্চ ব্যান্ডউইথ যাচাই করা কঠিন। সেক্ষেত্রে বিকল্প সিস্টেম যেমন সিম-কনফার্মেশন, দূতাবাসের অনলাইন ভেরিফিকেশন, অথবা দ্বি-পদক্ষেপীয় কোডিং ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে এগুলোও যথেষ্ট শক্তভাবে ডিজাইন করা লাগবে।
আইনি ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পোস্টাল ভোটের আইনি কাঠামো ছিল, কিন্তু তা কাগজভিত্তিক পদ্ধতির জন্য বানানো। ডিজিটাল ভোটের জন্য পৃথক আইনি বিধি প্রণয়ন না করে কোন রকম প্রশাসনিক আদেশে এটি চালু করা হলে ভবিষ্যতে এটি সহজেই আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। নির্বাচন কমিশনকে উচিত এই উদ্যোগকে কার্যকর করার আগে সংসদে একটি স্পষ্ট বিধান প্রস্তাব করা, যাতে ডিজিটাল ভোটিংয়ের বৈধতা, তত্ত্বাবধান, অডিট, পুনর্গণনা ও ফলাফল চ্যালেঞ্জের নিয়ম স্পষ্ট করে দেয়া থাকে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দেওয়ার বন্দোবস্ত থাকতে হবে; কারণ একটি নতুন পদ্ধতির স্বীকৃতি পেতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং তৃতীয় পক্ষের অডিট তুলনীয় সহায়ক হবে। যদি নির্বাচন-সংক্রান্ত আইনি জট কাটিয়ে উঠতে না পারে, তবে এই উদ্যোগ দ্রুত রাজনৈতিক বিবাদ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে যেখানে বুরুজ-ধারণকারী আসনগুলো সংকীর্ণ মার্জিনে নির্ধারিত হয় এবং প্রবাসী ভোটের সংখ্যাই ফলপ্রসূ পার্থক্য তৈরি করে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও অনুধাবন করা জরুরি। প্রবাসী ভোট কিভাবে রাজনৈতিক ভারসাম্য পাল্টাতে পারে, এটি নির্ভর করে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং নির্বাচনী এলাকার গঠনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর। কোনো কোনো আসনে প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা একটি নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো বিদেশে প্রচারণা-লোকসামগ্রী, মিডিয়া ক্যাম্পেইন, এবং প্রবাসী নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া শুরু করবে। এটি স্বাভাবিকভাবে নেতিবাচকও হতে পারে, বহুজাতিক কর্পোরেট বা বিদেশি কূটনীতিক প্রভাব ঢোকে বেড়াতে পারে, অথবা প্রবাসী সংগঠনগুলো যদি অপরীক্ষিতভাবে আর্থিকভাবে প্রভাবিত হয়, তবে তা রাজনৈতিক দুর্নীতির পথ সুগম করতে পারে। সে কারণে একটি নৈতিক নীতি (পড়ফব ড়ভ পড়হফঁপঃ) প্রনয়ন আবশ্যক, যেখানে ডিজিটাল প্রচারণার নিয়ম, প্রবাসীদের উদ্দেশ্যভিত্তিক টার্গেটিং বন্ধ করা, এবং বিদেশি তহবিল থেকে রাজনৈতিক প্রচারণায় আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
আরও একটি বিবেচ্য বিষয় হলো তথ্যের বিভ্রান্তি। বিদেশে থাকা প্রবাসীরা অনেক সময় তথ্যের সূত্র হিসেবে সামাজিক মিডিয়ার ওপর নির্ভরশীল। সেখানে গুজব, ম্যাসেজিং গ্রুপ, এবং বট সম্প্রচার দ্বারা সহজেই ভুল তথ্য ছড়ানো যায়। যদি ভোটাররা বিভ্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে নির্বাচনের সংবেদনশীলতা বাড়বে। নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই প্রবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট তথ্য প্রচারণা, ফ্যাক্ট-চেক ইউনিট, এবং দ্বিভাষিক (বাংলা ও ইংরেজি) গাইডলাইন সরবরাহ করতে হবে, যা তাদেরকে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি ব্যবহারকারী-শিক্ষা চালানো অত্যাবশ্যক, কোনভাবে অ্যাপটি ডাউনলোড এবং ব্যবহারের পদ্ধতি, নিরাপত্তা টিপস, নম্বর-ভেরিফিকেশন, এগুলো স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
প্রশাসনিক দিক থেকে দেখা গেলে, একটি সফল বাস্তবায়নের জন্য তিনটি স্তম্ভ থাকা দরকার, প্রযুক্তিতে শক্ততা, আইনগত সমর্থন, এবং জনসচেতনতা। প্রযুক্তিগত স্তম্ভে দরকার হবে স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট, উন্মুক্ত সোর্স বা নিয়মিত কোড রিভিউ (যেখানে সম্ভব), এবং সার্ভার আর্কিটেকচারে এমন ব্যবস্থা যাতে একক লাইনে আক্রমণ হলে সিস্টেম ভেঙে না যায়। আইনি স্তম্ভে দরকার হবে পরিষ্কার নিয়মাবলী, কীভাবে প্রবাসীর ভোট গোনা হবে, কাকে পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকার থাকবে, কিভাবে পুনর্গণনা করা হবে ইত্যাদি। জনসচেতনতার স্তম্ভে দরকার হবে প্রশিক্ষণ, ভাষ্য, এবং প্রচারণা, বিশেষ করে যেখানে প্রবীণ প্রবাসীরা প্রযুক্তিগতভাবে অনভিজ্ঞ, তাদের জন্য সাহায্য সেন্টার ও দূতাবাসের সহযোগিতার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
আরেকটি দিক যা মানুষ প্রায়শই উপেক্ষা করে তা হলো বহুজাতিক আইনগত জটিলতা। প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব নেয়া/নেওয়ার পরিস্থিতিতে থাকতে পারেন; কখনো কখনো দ্বৈত নাগরিকত্ব সমস্যা তারা পড়তে পারে। আইনীভাবে কোথায় কী গ্রহণযোগ্য হবে, অধিবাসী দেশের আইন কেমন, এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। কিছু দেশে অনলাইন ভোটিং বা নির্দিষ্ট ডিজিটাল পদ্ধতি আইনত অনুমোদনযোগ্য নাও হতে পারে; সেখানে প্রবাসী ভোটাররা অংশগ্রহণ করতে গেলে দেশের নীতিনির্ধারক ও ঐ দেশের আইনগত বাধ্যবাধকতা-সহ কাজ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়গুলো নিয়ে কৌশলগত আলোচনায় ব্যস্ত হতে হবে, দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে দেশগুলোর সাথে সমঝোতা গড়ে তোলা, সেখানকার আইনি বিধানগুলো অনুসরণ করা শেখানো ইত্যাদি।
অবশেষে, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কিভাবে রূপান্তরিত করতে পারে, এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে প্রবাসীদের সংযুক্তিকরণ কেবল সংখ্যাগত নয়; এটি মানসিক ও নৈতিক সংযুক্তি হবে। প্রবাসী নেতারা যে বিষয়ে আগ্রহী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ-নীতি, এসব নীতির ওপর তাদের প্রভাব পড়বে। তারা কেবল অর্থ পাঠানোই নয়, দেশের নীতিনির্ধারণেও অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু সফলতার জন্য দরকার নিরবচ্ছিন্ন প্রতিশ্রুতি, নিরাপত্তায় বিনিয়োগ, আইনি সুরক্ষা, এবং স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি। আর যদি আমরা এই পথ বেছে নেই এবং তাড়াহুড়ো করে অসম্পূর্ণভাবে খুলে দিই, তাহলে ফলাফল হবে আস্থা-ভঙ্গ; এবং আস্থা পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে না।
নির্বাচন কমিশনকে উচিত, অ্যাপ মুক্তির আগেই অন্তত একটি পাইলট-রান সম্পন্ন করা, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট দেশের প্রবাসীরা অংশ নিয়ে পদ্ধতির স্বচ্ছতা যাচাই করবে; পাশাপাশি স্বাধীন সাইবার সিকিউরিটি ফার্মের অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। আইনি বিভাগকে নির্বাচন-আইন সংশোধনের প্রস্তাব দ্রুততম সময়ে উপস্থাপন করতে হবে; যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় স্পষ্ট দিশা থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোকে উত্সাহিত করা উচিত যে তারা প্রবাসীদের সাথে নৈতিকভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে, অর্থাৎ বিদেশি তহবিল গ্রহণ না করা, লক্ষ্যভিত্তিক ডিজিটাল প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকা, এবং ফ্যাক্ট-চেক মেকানিজম মেনে চলা। প্রবাসী সংগঠনগুলোকেও সচেতন হতে হবে যে তাদের প্রদেশেই নয়, দেশীয় রাজনীতিতেও তাদের প্রতিনিধি-হিসেবে নৈতিক আচরণ বজায় রাখতে হবে।
এই কয়েকটি নীতি যদি মেনে চলা যায়, তাহলে চড়ংঃধষ ঠড়ঃব ইউ হতে পারে কেবল একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এটি হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও গভীর, বিস্তৃত ও নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার একভাবে দিশাহীন আগমন। আর যদি এসব ব্যর্থ হয়, তাহলে ডিজিটাল ভোটিং হয়ে উঠবে ক্ষমতার দখলে নতুন এক মাধ্যম, যা গণতান্ত্রিক নৈতিকতাকে ক্ষুন্ন করবে। কাজেই এ সিদ্ধান্তকে উত্সবের সঙ্গে গ্রহণ করার আগে আমাদের দায়িত্ব হলো সচেতন হওয়া, প্রশ্ন করা, এবং জানালে সম্মতি দেওয়া, কারণ গণতন্ত্র টিকে আছে আস্থায়, এবং সেই আস্থা যদি প্রযুক্তির আড়ালে হারায়, তবে সব হারিয়ে যাবে। ১৬ নভেম্বর শুধু একটি তারিখ নয়; এটি একটি পরীক্ষার তারিখ, যেখানে আমরা দেখব প্রযুক্তি কি আমাদের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের সঙ্গী হতে পারবে, নাকি কেবল একটি তাত্ক্ষণিক প্রদর্শনী হয়ে থেকে যাবে।

– লেখক: সিনিয়র শিক্ষক ও কলাম, গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা