ঢাকা, বাংলাদেশ। , বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
নর্থ বেঙ্গলের আখে নাটোর মিলের চিনি

দালালচক্রের দখলে আখ,বিপন্ন দুই মিলের প্রান্তিক কৃষক

জেলা প্রতিনিধি নাটোর
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৭:২৩:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ৩১ বার পঠিত
জেলা প্রতিনিধি নাটোর: সরকারি নীতিমালাকে উপেক্ষা করে সীমান্তবর্তী সুবিধাকে পুঁজি করে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আওতাধীন হাজার হাজার মেট্রিক টন আখ অবৈধভাবে সংগ্রহ করছে নাটোর সুগার মিল— এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। এতে বিপাকে পড়ছেন প্রান্তিক কৃষকরা, আর লাভবান হচ্ছে সংঘবদ্ধ দালালচক্র।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান
গত (৯/১০ জানুয়ারি-২৬) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আব্দুলপুর, সালামপুর ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্রে সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়— নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আখ নিচ্ছে নাটোর সুগার মিলের জয়ন্তীপুর, তামালতলা ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্র। যা নাটোর সুগার মিলের কৃষকের পুর্জি ব্যবহার করে সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতি গাড়ির আখের বিপরীতে দালালদের হাতে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে,কিছু অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে দালালরা পুর্জি পেয়ে থাকে এবং দালালরা নাটোর সুগার মিলের কৃষকদের নামে ইস্যুকৃত পুর্জি ব্যবহার করে নর্থ বেঙ্গল সুগারমিল এলাকার আখ ক্রয় করছে। ফলে কাগজে-কলমে আখ দেখানো হচ্ছে নাটোরের কৃষকের, বাস্তবে আখ আসছে অন্য মিল এলাকা থেকে। এই কৌশলে প্রতিনিয়ত হারাচ্ছেন দুই মিলেরই প্রকৃত কৃষকরা।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, “এবছর আমাদের আওতায় প্রায় দুই লক্ষ মেট্রিক টন আখ মাঠে আছে। মিল ১২০ দিন চলার কথা থাকলেও আখ মাড়াইয়ের সক্ষমতা কম থাকায় কৃষকদের পর্যাপ্ত পুর্জি দেওয়া যাচ্ছে না। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দালালরা আখ পাচার করছে।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে— মিলের নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, সরকারি ও ব্যাংক ঋণ অনাদায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে,
দুই মিল এলাকার কৃষকের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে অসন্তোষ।
নাটোর সুগার মিল এলাকার কৃষকদের মালঞ্চি সেন্টারের সভাপতি আব্দুল গনি, জয়ন্তীপুর সেন্টারের কৃষক আব্দুল হাদি সহ আরো অনে নাম না বলতে অনিচ্ছু কৃষক ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযোগ করেন, “আমাদের মাঠে এখনও আখ দাঁড়িয়ে আছে। অথচ আমাদের আখ না নিয়ে অন্য মিলের আখ কেনা হচ্ছে। এতে আমরা পুর্জি পাচ্ছি না, লোকসানে পড়ছি।”
তারা দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আব্দুলপুর সেন্টারের বড় চাষী জহুরুল ইসলাম বাদশাহ, আব্দুল আলিম
নর্থ বেঙ্গল এর পুর্জি অভাবের কারণে নাটোর সুগার মিলের জয়ন্তীপুর ও তামালতলা ইক্ষু কয় কেন্দ্রে প্রায় কয়েক হাজার হেক্টর আঁক দিয়েছি।
গাড়ির ড্রাইভার মাকিন ও আসাদুল বলেন, প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে দেড়শ গাড়ি করে নর্থ বেঙ্গলের আখ নাটোর সুগার মিলের নিয়ে যাইতাম।
জয়ন্তীপুর খামাসের সিআইসি মুনসুর বলেন, আমি নতুন সিআইসি আমি যতটুকু জানি নথ বেঙ্গলের যে আখ গুলো আসে সেগুলো আমাদের চাষীদের নামে আছে এগুলো তো বোঝা মুশকিল আমাদের সুগার মিল কোন নগদ টাকা লেনদেন করে না আমি টাকা দিয়ে কিনবো কেন আমি তো ব্যবসা করি না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে অসংগতির অভিযোগ প্রসঙ্গে নাটোর সুগার মিলের জিএম (কৃষি) ফেরদৌস আলম দাবি করেন, জয়ন্তীপুর ইক্ষু কয়কেন্দ্র টা নর্থ বেঙ্গলের বর্ডার এলাকায় হয় কিছু আঁক আছে। আমাদেরও অনেক আঁক নর্থ বেঙ্গল নিয়েছে নগদ টাকা দিয়ে আঁক নেওয়ার কোন সুযোগ নেই।
—এমডির মন্তব্য
সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন নাটোর সুগার মিলের এমডি আখলাসুর রহমান বলেন, এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত ও মিথ্যা ভিত্তিহীন আর যারা আঁক নিচে ও দিচ্ছে তাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে দিন।
তবে অনুসন্ধানী মহলের মতে, মিলভিত্তিক আখ সংগ্রহের নীতিমালা, পুর্জি ব্যবস্থা ও নির্ধারিত ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্র থাকাকালীন এই বক্তব্য নীতিগত শিথিলতারই ইঙ্গিত দেয়।
বড় প্রশ্ন
দালালরা কীভাবে পুর্জি জোগাড় করছে? এবং কার অনুমতিতে সীমান্তবর্তী ইক্ষু ক্রয় করছে। কেন্দ্র গুলোর কোন নজরদারি নেই?
সরকারি দুই মিলের মধ্যকার এই ‘অঘোষিত প্রতিযোগিতা’তে লাভবান হচ্ছে কারা?
দাবি
স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক সংগঠন ও সচেতন মহলের দাবি— অবিলম্বে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত, ডিজিটাল পুর্জি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নওয়া। না নিলে সরকারি মিল, কৃষক এবং রাষ্ট্র—তিন পক্ষই ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

নর্থ বেঙ্গলের আখে নাটোর মিলের চিনি

দালালচক্রের দখলে আখ,বিপন্ন দুই মিলের প্রান্তিক কৃষক

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৭:২৩:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
জেলা প্রতিনিধি নাটোর: সরকারি নীতিমালাকে উপেক্ষা করে সীমান্তবর্তী সুবিধাকে পুঁজি করে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আওতাধীন হাজার হাজার মেট্রিক টন আখ অবৈধভাবে সংগ্রহ করছে নাটোর সুগার মিল— এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। এতে বিপাকে পড়ছেন প্রান্তিক কৃষকরা, আর লাভবান হচ্ছে সংঘবদ্ধ দালালচক্র।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান
গত (৯/১০ জানুয়ারি-২৬) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আব্দুলপুর, সালামপুর ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্রে সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়— নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আখ নিচ্ছে নাটোর সুগার মিলের জয়ন্তীপুর, তামালতলা ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্র। যা নাটোর সুগার মিলের কৃষকের পুর্জি ব্যবহার করে সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতি গাড়ির আখের বিপরীতে দালালদের হাতে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে,কিছু অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে দালালরা পুর্জি পেয়ে থাকে এবং দালালরা নাটোর সুগার মিলের কৃষকদের নামে ইস্যুকৃত পুর্জি ব্যবহার করে নর্থ বেঙ্গল সুগারমিল এলাকার আখ ক্রয় করছে। ফলে কাগজে-কলমে আখ দেখানো হচ্ছে নাটোরের কৃষকের, বাস্তবে আখ আসছে অন্য মিল এলাকা থেকে। এই কৌশলে প্রতিনিয়ত হারাচ্ছেন দুই মিলেরই প্রকৃত কৃষকরা।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, “এবছর আমাদের আওতায় প্রায় দুই লক্ষ মেট্রিক টন আখ মাঠে আছে। মিল ১২০ দিন চলার কথা থাকলেও আখ মাড়াইয়ের সক্ষমতা কম থাকায় কৃষকদের পর্যাপ্ত পুর্জি দেওয়া যাচ্ছে না। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দালালরা আখ পাচার করছে।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে— মিলের নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, সরকারি ও ব্যাংক ঋণ অনাদায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে,
দুই মিল এলাকার কৃষকের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে অসন্তোষ।
নাটোর সুগার মিল এলাকার কৃষকদের মালঞ্চি সেন্টারের সভাপতি আব্দুল গনি, জয়ন্তীপুর সেন্টারের কৃষক আব্দুল হাদি সহ আরো অনে নাম না বলতে অনিচ্ছু কৃষক ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযোগ করেন, “আমাদের মাঠে এখনও আখ দাঁড়িয়ে আছে। অথচ আমাদের আখ না নিয়ে অন্য মিলের আখ কেনা হচ্ছে। এতে আমরা পুর্জি পাচ্ছি না, লোকসানে পড়ছি।”
তারা দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আব্দুলপুর সেন্টারের বড় চাষী জহুরুল ইসলাম বাদশাহ, আব্দুল আলিম
নর্থ বেঙ্গল এর পুর্জি অভাবের কারণে নাটোর সুগার মিলের জয়ন্তীপুর ও তামালতলা ইক্ষু কয় কেন্দ্রে প্রায় কয়েক হাজার হেক্টর আঁক দিয়েছি।
গাড়ির ড্রাইভার মাকিন ও আসাদুল বলেন, প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে দেড়শ গাড়ি করে নর্থ বেঙ্গলের আখ নাটোর সুগার মিলের নিয়ে যাইতাম।
জয়ন্তীপুর খামাসের সিআইসি মুনসুর বলেন, আমি নতুন সিআইসি আমি যতটুকু জানি নথ বেঙ্গলের যে আখ গুলো আসে সেগুলো আমাদের চাষীদের নামে আছে এগুলো তো বোঝা মুশকিল আমাদের সুগার মিল কোন নগদ টাকা লেনদেন করে না আমি টাকা দিয়ে কিনবো কেন আমি তো ব্যবসা করি না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে অসংগতির অভিযোগ প্রসঙ্গে নাটোর সুগার মিলের জিএম (কৃষি) ফেরদৌস আলম দাবি করেন, জয়ন্তীপুর ইক্ষু কয়কেন্দ্র টা নর্থ বেঙ্গলের বর্ডার এলাকায় হয় কিছু আঁক আছে। আমাদেরও অনেক আঁক নর্থ বেঙ্গল নিয়েছে নগদ টাকা দিয়ে আঁক নেওয়ার কোন সুযোগ নেই।
—এমডির মন্তব্য
সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন নাটোর সুগার মিলের এমডি আখলাসুর রহমান বলেন, এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত ও মিথ্যা ভিত্তিহীন আর যারা আঁক নিচে ও দিচ্ছে তাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে দিন।
তবে অনুসন্ধানী মহলের মতে, মিলভিত্তিক আখ সংগ্রহের নীতিমালা, পুর্জি ব্যবস্থা ও নির্ধারিত ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্র থাকাকালীন এই বক্তব্য নীতিগত শিথিলতারই ইঙ্গিত দেয়।
বড় প্রশ্ন
দালালরা কীভাবে পুর্জি জোগাড় করছে? এবং কার অনুমতিতে সীমান্তবর্তী ইক্ষু ক্রয় করছে। কেন্দ্র গুলোর কোন নজরদারি নেই?
সরকারি দুই মিলের মধ্যকার এই ‘অঘোষিত প্রতিযোগিতা’তে লাভবান হচ্ছে কারা?
দাবি
স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক সংগঠন ও সচেতন মহলের দাবি— অবিলম্বে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত, ডিজিটাল পুর্জি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নওয়া। না নিলে সরকারি মিল, কৃষক এবং রাষ্ট্র—তিন পক্ষই ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।