ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
তাজা খবর
যশোরে কৃত্রিম তেল সংকটে দিশেহারা চালক ও সাধারণ মানুষ
জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার তেল শোধনাগারে ভয়াবহ আগুন
ফুয়েল পাস নিতে নিবন্ধনের নিয়ম
গ্রামীণ আবহ আর কারুপণ্যের সম্ভার নিয়ে চলছে বৈশাখী মেলা
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে মারা গেছেন
বরেণ্য গীতিকবি,সুরকার,লেখক ও সংগীত গুরু ইউনুস আলী মোল্লার
স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে মাদারীপুরে ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ
গণধর্ষেণের শিকার ৬-বছরের শিশু ও ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী: গ্রেফতার-১
জাল টাকার কারখানায় অভিযান, আটক-১
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক অগ্নিকাণ্ড—নিরাপত্তা নাকি নাশকতা?

জেমস আব্দুর রহিম রানা :
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:২১:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৫
- / ৭৩ বার পঠিত

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, যা এখন কেবল উদ্বেগ নয়—একটি জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্কুল, গার্মেন্টস কারখানা, বিমানবন্দর—সব ক্ষেত্রেই আগুনের লেলিহান শিখা কেবল জীবন আর সম্পদের ক্ষতি করছে না, বরং নাগরিক মনে জন্ম দিচ্ছে গভীর ভয় ও অনিশ্চয়তা।
প্রশ্ন উঠছে—এসব কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কাজ করছে একটি পরিকল্পিত নাশকতার ছায়া?
২০২৫ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নের মাত্র ১২ মিনিটের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্কুল ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই ভবনের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আগুন ও ধ্বংসস্তূপের ভয়াল দৃশ্য। প্রাণ হারান ৩৬ জন, যার মধ্যে ২৭ জনই শিক্ষার্থী। বিমানবাহিনী প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটিকে দায়ী করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “যান্ত্রিক ত্রুটি না ষড়যন্ত্র—তা নির্ধারণে ব্ল্যাক বক্স, রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড এবং নিরাপত্তা তথ্য বিশ্লেষণ অপরিহার্য।” এই দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, সমগ্র জাতির নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
এর অল্প কিছুদিন পর চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকার একটি গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে কারখানার বিশাল অংশ, কাঁচামাল ও উৎপাদন সরঞ্জাম ভস্মীভূত হয়। আহত হন কয়েকজন শ্রমিক। শ্রমিক সংগঠনগুলো অভিযোগ তুলেছে—নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল, জরুরি প্রস্থানপথগুলো কার্যকর ছিল না। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত নাশকতার অংশও হতে পারে। শিল্পাঞ্চলে এমন ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড এক গভীর প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছি?
এরপর ১৮ অক্টোবর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো সেকশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ৩৬টি ইউনিট ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হয় এবং বহু ফ্লাইট বিকল্প রুটে পাঠানো হয়। এই ঘটনায় কার্গো মালামাল ও গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এটি দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্থানের একটি—এখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলোর মধ্যে সময়, ধরন ও ক্ষয়ক্ষতির ধরণে অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। কোনো একক কারণে এসব ব্যাখ্যা করা যায় না। বৈদ্যুতিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতি, মানবিক অবহেলা এবং সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র—সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তবে জনগণের প্রত্যাশা কেবল তদন্ত নয়—বাস্তব পরিবর্তন।
অগ্নি নিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, ভবন ও কারখানার নিয়মিত অগ্নি পরিদর্শন, এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি “দুর্যোগ প্রতিরোধ মানচিত্র” তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পাঞ্চল ও বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আতঙ্ক নয়, তথ্যনির্ভর সচেতনতা গড়ে তোলা—এটাই সাংবাদিকতার দায়িত্ব। জনগণের মধ্যে ভয় নয়, প্রস্তুতি ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি প্রতিবেদনে সত্য ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখাই সাংবাদিকতার নৈতিক কর্তব্য।
আজ সময় এসেছে আমাদের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তোলার। প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি পরিবার রাষ্ট্রের সম্পদ—এদের সুরক্ষাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব।
স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা, অগ্নি নিরাপত্তা সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুললে তবেই এ ধরনের দুর্ঘটনা বা সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধ সম্ভব হবে।
জনগণের আস্থা ফেরানো এখন রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড যেন আরেকটি শোকগাথা না হয়ে ওঠে—এই অঙ্গীকারই হোক সরকারের, প্রশাসনের এবং আমাদের সবার।
লেখক:
জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট
আরও পড়ুন:




















