নিরাপদ শিশু খাদ্য চাই

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৪:০৪:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫
- / ৪৯ বার পঠিত

একটি শিশুর জন্ম কেবল একটি পরিবারে নয়, গোটা জাতির হৃদয়ে আনন্দের সঞ্চার ঘটায়। শিশুর হাসি, শিশুর কণ্ঠ, শিশুর প্রাণচাঞ্চল্যে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা। কিন্তু সেই শিশুই যখন জন্মের পর থেকেই অনিরাপদ খাদ্য, বিষমিশ্রিত দুধ বা ভেজাল পুষ্টির শিকার হয়, তখন এই আনন্দ এক ভয়াবহ উদ্বেগে রূপ নেয়। আজকের পৃথিবীতে শিশুদের খাদ্য নিয়ে যে সংকট, তা কেবল দরিদ্র দেশের নয়, ধনী রাষ্ট্রেও রয়েছে—কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে তা এখন এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট। “নিরাপদ শিশু খাদ্য চাই”—এই দাবি এখন সময়ের সবচেয়ে মানবিক ও জরুরি উচ্চারণ। কারণ, একটি শিশুর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা মানে শুধু তার পুষ্টি নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশু হচ্ছে জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেই ভবিষ্যৎকে কতটা নিরাপদ রাখছি? বাংলাদেশের বাজার ঘুরে দেখলে বোঝা যায়, শিশুর খাবারের নামে এক অন্ধকার বাণিজ্যজগত তৈরি হয়েছে। দুধ, সিরিয়াল, চকলেট, জুস, স্ন্যাকস, এমনকি শিশুদের জন্য নির্ধারিত স্যুপ—সবখানেই চলছে অনিয়ম, ভেজাল ও প্রতারণা। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য নতুন প্যাকেটে বিক্রি হচ্ছে, রাসায়নিক সংরক্ষণকারীর মাত্রা অতিক্রম করছে আন্তর্জাতিক মান, আর শিশুরা সেইসব পণ্য খেয়ে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের পরিপাকতন্ত্র দুর্বল হয়ে যায়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে, এবং এক সময় নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এই দৃশ্যের মধ্যে আমরা একটিও ভাবি না—একটি শিশুর শরীরে প্রবেশ করা এই বিষই একদিন পুরো জাতির রক্তে ছড়িয়ে পড়বে।
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন রয়েছে, আছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (ইঋঝঅ), বিএসটিআই, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতা, জনবল সংকট, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং দুর্নীতি—সব মিলিয়ে শিশু খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সুপারশপে এখনো এমন অনেক ব্র্যান্ড বিক্রি হচ্ছে যেগুলোর কোনো মান নিয়ন্ত্রণ সনদ নেই। গ্রামীণ বাজারে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। নাম না জানা চীনা বা ভারতীয় ব্র্যান্ডের শিশু খাদ্য, আমদানিকারকের নাম ছাড়াই, এমনকি স্থানীয়ভাবে তৈরি অজানা পাউডারও “বেবি মিল্ক” নামে বিক্রি হচ্ছে। কেউ জানতে চায় না এগুলো কোথায় তৈরি, কীভাবে সংরক্ষিত, আর কোন উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় শিশুর খাদ্য নিরাপত্তা এখন একটি নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। একটি শিশুর খাদ্য যতটা বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়, ততটাই মানবিক দায়িত্বের ক্ষেত্র। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (ঈজঈ)-এ বলা হয়েছে, প্রতিটি শিশুর পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই অধিকার এখনো কাগজে সীমাবদ্ধ। শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে কার্যকর কোনো জাতীয় নীতি বা বার্ষিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে—এই অনিরাপত্তার দায় কার? কেবল উৎপাদক না সরকারও? উত্তর হলো—দায় সবার। উৎপাদকদের দায়িত্ব হচ্ছে মান বজায় রেখে খাদ্য তৈরি করা, সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা, এবং ভোক্তার দায়িত্ব হচ্ছে সচেতন থাকা। কিন্তু তিন পক্ষের কেউই তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। খাদ্য কোম্পানিগুলো লাভের লোভে শর্টকাট পথ নেয়, সরকার কখনো নিয়ম করে কিন্তু বাস্তবায়ন করে না, আর অভিভাবকেরা বাজারের চটকদার বিজ্ঞাপন ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়ে যায়।
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ঢাকার একটি নামী প্রতিষ্ঠানের “বেবি সিরিয়াল” পণ্যের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে এতে ব্যবহৃত চিনির মাত্রা শিশুর সহনক্ষমতার তিনগুণ বেশি। অন্যদিকে, কিছু বিদেশি আমদানিকৃত দুধে পাওয়া গেছে ক্ষতিকর ধাতব উপাদান যেমন সীসা ও আর্সেনিকের উপস্থিতি। এসব উপাদান সরাসরি শিশুর স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি ও লিভারের ওপর আঘাত হানে। দীর্ঘমেয়াদে শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, মস্তিষ্কের বিকাশ থেমে যায়, এবং অনেক ক্ষেত্রে অটিজম বা লার্নিং ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি বাড়ে।
অথচ এসবের বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিবাদ বা আন্দোলন চোখে পড়ে না। আমরা ভেজাল তেলের বিরুদ্ধে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, কিন্তু শিশু খাদ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে আমাদের নীরবতা বিস্ময়কর। সম্ভবত এর কারণ হলো শিশু নিজের কণ্ঠে বলতে পারে না সে অসুস্থ। শিশুর কান্না অভিভাবক ভাবেন সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর, কিন্তু সেই কান্না হয়তো ভেতরের বিষক্রিয়ার প্রতিধ্বনি।
বাংলাদেশে এখন প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে প্রায় ৮ হাজার শিশু। এদের অর্ধেকের বেশি জন্মের প্রথম এক বছরেই নানা পুষ্টিহীনতা, অ্যালার্জি বা হজমজনিত সমস্যায় ভোগে। এর বড় অংশই অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফল। শিশুদের জন্য নির্ধারিত পুষ্টির ঘাটতি এখন এক প্রকার জাতীয় সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু স্টান্টিংয়ে ভুগছে, অর্থাৎ বয়স অনুযায়ী তাদের বৃদ্ধি থেমে গেছে। এটি কেবল দারিদ্র্েযর কারণে নয়, বরং খাদ্যের মান ও নিরাপত্তাহীনতার ফলাফল।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার যদি সত্যিই “স্মার্ট বাংলাদেশ” বা “সুস্থ বাংলাদেশ” গড়তে চায়, তবে প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে শিশু খাদ্য নিরাপত্তায় বিপ্লব ঘটানো। শিশু খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও সংরক্ষণের ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রক নীতি প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি ব্র্যান্ডের উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়মিত পরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। শিশু খাদ্যকে সাধারণ ভোক্তা পণ্যের বদলে “জরুরি স্বাস্থ্যপণ্য” হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে, যাতে এটি বিশেষ সুরক্ষা ও নজরদারির আওতায় আসে।
এছাড়া জনসচেতনতা তৈরি করাও জরুরি। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, শিশুর স্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনো আপস করা যায় না। শিশুর খাবারে যতটা সম্ভব ঘরোয়া ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করতে হবে। বাজারের প্রক্রিয়াজাত খাবারের চেয়ে মায়ের হাতে রান্না করা এক বাটি খিচুড়ি বা দুধ-ভাত অনেক বেশি নিরাপদ ও পুষ্টিকর। বিশেষ করে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধই শিশুর জন্য যথেষ্ট—এই বিষয়টি সবাইকে জানতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে এখনো অনেক মা ভুল ধারণায় ভোগেন যে, শিশুর দ্রুত বৃদ্ধি ঘটাতে হলে ফর্মুলা দুধ প্রয়োজন। এই অজ্ঞতার সুযোগ নেয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যারা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে “মাতৃত্বের বিকল্প” বানিয়ে তুলছে নিজেদের পণ্য।
এখানে গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব বিশাল। শিশু খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সচেতনতা ক্যাম্পেইন এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা—সবকিছুতেই সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন “সকালের বাণী” বা অনুরূপ সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ পত্রিকাগুলো নিয়মিতভাবে শিশুস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক কলাম প্রকাশ করলে তা জনমত তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলোকেও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ভাবতে হবে। তারা চাইলে মাননিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখতে পারে, ল্যাব পরীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারে, এমনকি ভোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখার উদ্যোগ নিতে পারে। বিশ্বে অনেক দেশেই এখন “ইধনু ঋড়ড়ফ ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু ওহরঃরধঃরাব” চলছে—যেখানে প্রতিটি পণ্যের উপাদান, পরীক্ষা ও উৎপাদন তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিশু খাদ্য সচেতনতা শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবারে সচেতনতা পৌঁছানো সম্ভব। যেমন—“নিরাপদ খাবার খাই, শিশুকে সুস্থ রাখি”—এই বার্তাটি যদি প্রতিটি শিশুর কণ্ঠে ওঠে, তবে তা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলবে। আরও একটি দিক অনেকে এড়িয়ে যান, তা হলো অনলাইন বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে শিশু খাদ্য বিক্রির ঝুঁকি। অনেকে “রসঢ়ড়ৎঃবফ নধনু ভড়ড়ফ” লিখে এমনসব পণ্য বিক্রি করছে যেগুলোর কোনো আমদানিকারক লাইসেন্স নেই, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণও হতে পারে। তাই সরকারের উচিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিশু খাদ্যের বিক্রির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা।সবশেষে প্রশ্নটি খুব সহজ—আমরা কি চাই আমাদের শিশুরা সুস্থভাবে বেড়ে উঠুক, নাকি আমরা চাই বাজারের বিষাক্ত ব্যবসা আমাদের আগামী প্রজন্মকে ধ্বংস করুক? যদি প্রথমটি চাই, তাহলে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু আইন নয়, সচেতনতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে নিরাপদ শিশু খাদ্য সংস্কৃতি।
শিশুর নিরাপত্তা মানে কেবল দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা নয়; এটি তার প্রথম চুমুক, প্রথম আহার, প্রথম পুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি শিশুর শরীরে যে খাদ্য প্রবেশ করে, তার প্রতিটি কণা যেন জীবনের উৎস হয়, মৃত্যুর নয়—এই নিশ্চয়তাই আমাদের দিতে হবে। শিশুর নিরাপদ খাদ্য মানে নিরাপদ জাতি, নিরাপদ ভবিষ্যৎ, নিরাপদ মানবতা।
আমরা যদি সত্যিই আমাদের সন্তানদের ভালোবাসি, তবে আজই আমাদের এক কণ্ঠে বলতে হবে—নিরাপদ শিশু খাদ্য চাই, এখনই চাই। কারণ, শিশুর জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো সুযোগ নেই। একটি শিশুর কান্না শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের আর্তনাদ। তাই আজ আমাদের দায়িত্ব একটাই—প্রতিটি শিশুর হাতে তুলে দিতে হবে বিশুদ্ধ, নিরাপদ, ভালোবাসায় ভরা খাদ্য, যেন সে হাসতে পারে নির্ভয়ে, বড় হতে পারে সুস্থভাবে, আর আমাদের আগামী প্রজন্ম হয়ে ওঠে সত্যিকারের মানবিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ।
মোছাঃ শাকিলা খাতুন, লেখিকা, তেকানীচুকাইনগর, সোনাতলা, বগুড়া।
mostshakilakhatun2004@gmail.com




















