অপু দাস, রাজশাহী: রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া বিরোধের জেরে রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন রুটে আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে একাংশ শ্রমিক নেতাদের মতপার্থক্য চরমে পৌঁছালে সোমবার রাত ৮টা থেকে ধর্মঘট শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সকাল থেকে সব আন্তঃজেলা রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শ্রমিকদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন যে, ইউনিয়নের সাধারণ সভার মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করতে হবে। তাদের মতে, সাধারণ সভার মাধ্যমে গঠিত কমিটিই একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে।
তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ সভা আয়োজন করা বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম প্রশাসন, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব শ্রমিকদের একাংশ প্রত্যাখ্যান করে বৈঠক থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয়।
জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়ে কয়েক মাস ধরেই বিরোধ চলমান রয়েছে। এর আগে গত ২৩ এপ্রিল নির্বাচন দাবিকারী শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। পরে রফিকুল ইসলাম পাখিকে সভাপতি করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হলে সেটিও প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনরত শ্রমিকদের একটি অংশ। এরপর তারা একাধিকবার ধর্মঘট ও কর্মসূচি পালন করে। সে সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঈদের পর নির্বাচন আয়োজনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
সোমবার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলালসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
বৈঠক শেষে নগরীর শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় নজরুল ইসলাম হেলালের ব্যক্তিগত চেম্বারে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শ্রমিক নেতা মোমিনুল ইসলাম মোমিন অভিযোগ করেন, জেলা প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে একটি পক্ষের অবস্থান নিয়েছে। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের সাধারণ সভার মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে নজরুল ইসলাম হেলালের নির্বাচনি কমিটিতে থাকা উচিত নয়।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাধারণ সভা আয়োজন করলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তাই বিকল্প পদ্ধতিতে নির্বাচন পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, দ্রুত বিরোধ নিরসন এবং স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করছে।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, বৈঠকে মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক হলেও বাস চলাচল বন্ধ রাখা কিংবা ব্যক্তিগত চেম্বারে হামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, মালিকপক্ষ সব সময় যাত্রীসেবা সচল রাখতে চায় এবং আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত।
বাস চলাচল বন্ধ থাকায় রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেকেই বাস টার্মিনালে এসে পরিবহন না পেয়ে বিকল্প যানবাহনের খোঁজ করছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, প্রশাসন, মালিক ও শ্রমিক নেতাদের আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান বের হলে আন্তঃজেলা বাস চলাচল আবারও স্বাভাবিক হবে।

অপু দাস, রাজশাহী 

















