ঢাকা, বাংলাদেশ। , শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

প্রতিশ্রুতির প্রহসন, বাস্তবতার পতন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন প্রশ্নবিদ্ধ

এস এম হাসানুজ্জামান
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:৪৭:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫
  • / ৭৭ বার পঠিত

রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা ইমেজ, এই শব্দটি কেবল অলঙ্কার নয়, এটি একটি জাতির সামষ্টিক আত্মপরিচয়ের সূক্ষ্ম প্রতিফলন। কোনো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অর্জন, শিক্ষাগত উন্নতি বা অবকাঠামোগত আধুনিকতা যতই অগ্রসর হোক না কেন, যদি সেই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক নৈতিকতা, সুশাসন ও মানবিক দায়বোধ দুর্বল হয়, তবে তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা ভেঙে পড়ে নিঃশব্দে। বাংলাদেশ আজ যেন সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে এক গভীরতর পতনের সোপানে অবস্থান করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে দেশের ক্রমাবনতি, শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয়, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতার ধারাবাহিকতা মিলে বাংলাদেশের ইমেজ এখন এক অভূতপূর্ব ‘ক্রাইসিস’-এর মুখোমুখি।
এই ইমেজ ক্রাইসিস কোনো হঠাৎ সংঘটিত বিপর্যয় নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসংখ্য প্রশাসনিক ব্যর্থতা, পরিকল্পনাহীন সিদ্ধান্ত, অদূরদর্শী নীতি এবং রাজনৈতিক অসংবেদনশীলতার জটিল সমন্বয়ে গঠিত এক বাস্তবতা। আজ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের নাম আসে প্রধানত দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে। অথচ এ দেশ একসময় পরিচিত ছিল প্রবৃদ্ধির বিস্ময় হিসেবে। এই পার্থক্যই আসলে রাষ্ট্রীয় সংকটের মূলে নিহিতÑআমরা উন্নয়নের বাহ্যিক পরিসংখ্যান তৈরি করতে পেরেছি, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত।
সম্প্রতি বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সেই ইমেজ ক্রাইসিসের এক প্রতীকী প্রকাশ। এটি নাশকতা হোক বা দুর্ঘটনাÑতাতে খুব বেশি পার্থক্য নেই, কারণ ফলাফল একই: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্বলতা, অব্যবস্থা এবং অবহেলার নগ্ন প্রতিফলন। এই ঘটনায় কেবল একটি স্থাপনা পুড়ে যায়নি, পুড়েছে রাষ্ট্রীয় সুনামের পর্দা। কেপিআইভুক্ত স্থাপনায় এমন নিরাপত্তাহীনতা শুধু এক দুর্যোগ নয়, এটি আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোর ভঙ্গুরতার প্রকাশ্য ঘোষণা। বিশ্ব গণমাধ্যমে ঘটনাটি প্রচারিত হয়েছে এমনভাবে, যেন এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতীক।
এর আগে চট্টগ্রাম ইপিজেডে আগুন, পোশাক কারখানায় শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা কিংবা বন্দর অচলাবস্থাÑসবই যেন এক লাইনেই যুক্ত হয়ে গেছে: একটি রাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার শৃঙ্খলাবোধ হারিয়ে ফেলছে। যখন অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে অযৌক্তিক ট্যারিফ বৃদ্ধি বা পরিবহন ব্যাহত হয়, তখন সেটা কেবল স্থানীয় ব্যবসার সমস্যা নয়; বরং তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আস্থায় আঘাত হানে। বৈশ্বিক বাজারের চোখে চট্টগ্রাম এখন ক্রমে একটি ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতÑবিশেষত তৈরি পোশাক শিল্প, গুরুতর প্রতিযোগিতাগত সংকটে পড়ছে।
রাষ্ট্রের ইমেজের অবনতি কেবল অর্থনৈতিক খাতেই নয়, এর পরিধি বিস্তৃত সমাজের প্রতিটি স্তরে। পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের পতন তারই আরেক দৃষ্টান্ত। ২০২৫ সালের হেনলি পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নেমে এসেছে ১০০তম স্থানে। এর মানেÑআমাদের নাগরিকরা এখন বিশ্বের মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারে। এটি এমন এক সূচক, যা কেবল ভ্রমণের নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি বৈশ্বিক আস্থার পরিমাপক। বাংলাদেশ এখন উত্তর কোরিয়ার সমমর্যাদায় অবস্থান করছেÑএকটি রাষ্ট্র যার উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ যেন বাংলাদেশের নাগরিক মর্যাদার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অপমানজনক প্রতিচ্ছবি।
যখন কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক বিদেশে গমন করে সন্দেহ, হয়রানি ও প্রশ্নবাণের মুখোমুখি হয়, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ইমেজের দেউলিয়াপনা। অথচ দুই দশক আগে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল অনেক উঁচুতে। ২০০৬ সালে আমরা ছিলাম ৬৮তম স্থানে। এর পর থেকে ধারাবাহিক পতনই আমাদের সঙ্গী। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, পাসপোর্ট নিরাপত্তা, ভিসা আলোচনায় দক্ষতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব, সব মিলিয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি।
এবার আসি শিক্ষার প্রসঙ্গেÑযা একটি জাতির নৈতিক ও মানসিক কঙ্কাল। সদ্যপ্রকাশিত এইচএসসি ফলাফল যেন এক সতর্কবার্তা, যে বার্তা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমাগত অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পরিণতি। এবারের পাসের হার মাত্র ৫৮.৮৩ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি। এটি কেবল সংখ্যার পরিসংখ্যান নয়; এটি শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, সিলেবাসের অগভীরতা এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষকের মনোবল ভাঙনের প্রতিফলন। অনেকে বলছেন, এবার প্রকৃত ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে, অতিরঞ্জিত মূল্যায়ন হয়নি। কিন্তু সেই ‘প্রকৃত’ ফলাফলও ভয়াবহ। এটি ইঙ্গিত করে, দেশের শিক্ষার্থীরা এখন জ্ঞানার্জনের চেয়ে পাস-নির্ভর প্রতিযোগিতায় হারিয়ে গেছে। শিক্ষা যখন আত্মগঠনের বদলে সার্টিফিকেট বাণিজ্যে পরিণত হয়, তখন তা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে।
শিক্ষার মান কমে যাওয়া, শিক্ষক আন্দোলনে রাস্তায় নেমে আসা, এবং শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, সবকিছু মিলিয়ে দেশের ইমেজে তৈরি হয়েছে এক ধূসর দাগ। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশ এখন ‘শিক্ষাগত অগ্রগতির’ উদাহরণ নয়, বরং ‘সিস্টেমিক ডিসঅর্ডারের’ প্রতীক।
রাষ্ট্রের ইমেজ সংকটের আরেক গভীর কারণ হলোÑনীতিনির্ধারণে নৈতিকতার অনুপস্থিতি। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, নীতিহীনতা, প্রশাসনিক অপচয়, সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ প্রশাসনিক জড়তা। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো হয়ে উঠছে অগভীর ও ক্ষণস্থায়ী। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কাগজে যতই চমকপ্রদ দেখাক, বাস্তবে তার প্রভাব ন্যূনতম।
প্রশাসনের এই অব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আজ বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে। কোনো রাষ্ট্র যখন বারবার নীতিগত পরিবর্তনে অস্থির হয়, তখন বিনিয়োগকারীরা সরে যায়। এই আস্থাহীনতাই বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। একইসঙ্গে সামাজিক কাঠামোয় বাড়ছে বিভাজন, ক্ষোভ ও অসহিষ্ণুতা। শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থানহীনতার যন্ত্রণায় ভুগছে। তাদের একাংশ বিদেশগামী, অন্যাংশ হতাশা ও অনিশ্চয়তায় নিঃশেষ। রাষ্ট্র যখন তরুণদের কাছে কোনো আশার বার্তা দিতে পারে না, তখন সেই রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ হারায়। তরুণ সমাজের এই অবক্ষয় ইমেজ ক্রাইসিসকে আরও গভীর করছে।বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিবেশেও বিদ্যমান এক ভয়ানক অরাজকতা। সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার, গুজব, তথ্যবিকৃতি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা রোধে রাষ্ট্রের কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো নিজেরাই তথ্য ব্যবস্থাপনায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়।সাইবার স্পেস এখন রাষ্ট্রের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেখানে কার্যকর উপস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আমাদের সাফল্যের খবর ছড়াতে পারে না কোনো কার্যকর কাঠামো। ফলে যখনই কোনো দুর্ঘটনা বা নেগেটিভ সংবাদ ঘটে, তা মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, আর সেই সঙ্গে নিমজ্জিত হয় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। রাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানও আজ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে। বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্যে নেই সেই আত্মবিশ্বাস বা কৌশলগত পরিশীলন। বিদেশে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অনেক সময় কেবল প্রোটোকল রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকেন, রাষ্ট্রীয় ইমেজ রক্ষার সক্রিয় কৌশলে নয়। কূটনীতি যখন পেশাদারিত্বের চেয়ে আমলাতন্ত্রে বন্দি হয়, তখন আন্তর্জাতিক আস্থার দরজা নিজেই বন্ধ হয়ে যায়।
এইসব কারণেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্রমে দুর্বল হচ্ছে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, ভিসা সহযোগিতা, এমনকি সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও অনীহা বাড়ছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নৈতিক বিশৃঙ্খলা যখন বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন সেটি একসময় “ইমেজ ক্রাইসিস” নয়, “ট্রাস্ট ক্রাইসিসে” রূপ নেয়। এখন প্রশ্নÑসমাধান কোথায়? এই সংকট কেবল প্রচারণায় দূর হবে না। প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সাহস, নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন। প্রথমত, রাষ্ট্রকে তার নৈতিক আর্কিটেকচার পুনর্নির্মাণ করতে হবে। দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অপচয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে দেখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনঃসংগঠিত করতে হবে মানবিকতা ও দক্ষতার মিশ্রণে। শিক্ষকদের মর্যাদা, প্রশিক্ষণ ও পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা হতে হবে চিন্তার মুক্তির উপকরণ, কেবল চাকরির সিঁড়ি নয়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বে প্রয়োজন দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী কূটনীতিক, যারা বাংলাদেশের ইতিবাচক বাস্তবতা তুলে ধরতে সক্ষম হবেন। বর্তমানে বাংলাদেশের বহু ইতিবাচক সাফল্য, যেমন নারীর অগ্রগতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিতে স্বনির্ভরতা, এইসব বিষয়ে বিশ্বকে জানাতে রাষ্ট্র ব্যর্থ।
চতুর্থত, প্রশাসনিক সংস্কারে দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামো। নিয়োগ, পদোন্নতি, নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে পেশাদারিত্বে ফিরতে হবে। বন্দর, বিমানবন্দর, ইপিজেড বা কেপিআইভুক্ত স্থাপনাগুলোয় নিরাপত্তা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায়। সবশেষে, রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকতে হবে আত্মসমালোচনাশীল সাহস। ভুল স্বীকার করার নৈতিক শক্তি একটি জাতির পরিপক্বতার পরিচায়ক। আমরা অনেক সময় সংকট আড়াল করতে গিয়ে সেটিকে আরো প্রকট করে তুলি। অথচ সংকট স্বীকার করে সমাধানের পথে যাওয়া, এটাই সভ্যতার অগ্রগতির মূল দর্শন। বাংলাদেশের ইমেজ ক্রাইসিস কোনো অবশ্যম্ভাবী নিয়তি নয়। এটি একটি পরিবর্তনযোগ্য বাস্তবতাÑযদি রাষ্ট্র চায়, এবং সমাজ প্রস্তুত হয়। এই দেশের সম্ভাবনা অপরিসীম। আমরা যে জাতি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র নির্মাণ করেছি, সেই জাতি চাইলে তার ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করতেও সক্ষম। প্রয়োজন কেবল দূরদৃষ্টি, নৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক সাহস। রাষ্ট্র যদি তার আত্মপরিচয় পুনর্নির্মাণে সত্যনিষ্ঠ হয়, তবে বিদেশে নয়, নিজস্ব নাগরিকের কাছেই তার ইমেজ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। কারণ একটি রাষ্ট্রের আসল মর্যাদা আন্তর্জাতিক সূচকে নয়, বরং তার নাগরিকের বিশ্বাসে নিহিত। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই বাংলাদেশের ইমেজ ক্রাইসিস থেকে মুক্তির পথ খুলতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখনো সময় আছে, এই পতনের ইতিহাস পাল্টানোর। কিন্তু সময় সীমিত। যদি এখনো আত্মসমালোচনা না হয়, তবে তলানিরও নিচে নামার আর কোনো জায়গা থাকবে না। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কেবল আন্তর্জাতিক মর্যাদার বিষয় নয়Ñএটি জাতির আত্মসম্মানের প্রশ্ন। আর আত্মসম্মান হারালে রাষ্ট্রের অস্তিত্বও হারায় তার অর্থবোধ। বাংলাদেশ তাই আজ এক সন্ধিক্ষণেÑযেখানে আত্মগঠনের সংকল্পই নির্ধারণ করবে তার ভবিষ্যৎ। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে নিজেদের পুনর্গঠনে সক্ষম হই, তবে এই ইমেজ ক্রাইসিসই একদিন রূপ নিতে পারে আত্মজাগরণের সূচনায়।

-লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কলাম লেখক, রংপুর সদর, রংপুর

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

প্রতিশ্রুতির প্রহসন, বাস্তবতার পতন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন প্রশ্নবিদ্ধ

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:৪৭:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫

রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা ইমেজ, এই শব্দটি কেবল অলঙ্কার নয়, এটি একটি জাতির সামষ্টিক আত্মপরিচয়ের সূক্ষ্ম প্রতিফলন। কোনো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অর্জন, শিক্ষাগত উন্নতি বা অবকাঠামোগত আধুনিকতা যতই অগ্রসর হোক না কেন, যদি সেই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক নৈতিকতা, সুশাসন ও মানবিক দায়বোধ দুর্বল হয়, তবে তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা ভেঙে পড়ে নিঃশব্দে। বাংলাদেশ আজ যেন সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে এক গভীরতর পতনের সোপানে অবস্থান করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে দেশের ক্রমাবনতি, শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয়, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতার ধারাবাহিকতা মিলে বাংলাদেশের ইমেজ এখন এক অভূতপূর্ব ‘ক্রাইসিস’-এর মুখোমুখি।
এই ইমেজ ক্রাইসিস কোনো হঠাৎ সংঘটিত বিপর্যয় নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসংখ্য প্রশাসনিক ব্যর্থতা, পরিকল্পনাহীন সিদ্ধান্ত, অদূরদর্শী নীতি এবং রাজনৈতিক অসংবেদনশীলতার জটিল সমন্বয়ে গঠিত এক বাস্তবতা। আজ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের নাম আসে প্রধানত দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে। অথচ এ দেশ একসময় পরিচিত ছিল প্রবৃদ্ধির বিস্ময় হিসেবে। এই পার্থক্যই আসলে রাষ্ট্রীয় সংকটের মূলে নিহিতÑআমরা উন্নয়নের বাহ্যিক পরিসংখ্যান তৈরি করতে পেরেছি, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত।
সম্প্রতি বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সেই ইমেজ ক্রাইসিসের এক প্রতীকী প্রকাশ। এটি নাশকতা হোক বা দুর্ঘটনাÑতাতে খুব বেশি পার্থক্য নেই, কারণ ফলাফল একই: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্বলতা, অব্যবস্থা এবং অবহেলার নগ্ন প্রতিফলন। এই ঘটনায় কেবল একটি স্থাপনা পুড়ে যায়নি, পুড়েছে রাষ্ট্রীয় সুনামের পর্দা। কেপিআইভুক্ত স্থাপনায় এমন নিরাপত্তাহীনতা শুধু এক দুর্যোগ নয়, এটি আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোর ভঙ্গুরতার প্রকাশ্য ঘোষণা। বিশ্ব গণমাধ্যমে ঘটনাটি প্রচারিত হয়েছে এমনভাবে, যেন এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতীক।
এর আগে চট্টগ্রাম ইপিজেডে আগুন, পোশাক কারখানায় শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা কিংবা বন্দর অচলাবস্থাÑসবই যেন এক লাইনেই যুক্ত হয়ে গেছে: একটি রাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার শৃঙ্খলাবোধ হারিয়ে ফেলছে। যখন অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে অযৌক্তিক ট্যারিফ বৃদ্ধি বা পরিবহন ব্যাহত হয়, তখন সেটা কেবল স্থানীয় ব্যবসার সমস্যা নয়; বরং তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আস্থায় আঘাত হানে। বৈশ্বিক বাজারের চোখে চট্টগ্রাম এখন ক্রমে একটি ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতÑবিশেষত তৈরি পোশাক শিল্প, গুরুতর প্রতিযোগিতাগত সংকটে পড়ছে।
রাষ্ট্রের ইমেজের অবনতি কেবল অর্থনৈতিক খাতেই নয়, এর পরিধি বিস্তৃত সমাজের প্রতিটি স্তরে। পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের পতন তারই আরেক দৃষ্টান্ত। ২০২৫ সালের হেনলি পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নেমে এসেছে ১০০তম স্থানে। এর মানেÑআমাদের নাগরিকরা এখন বিশ্বের মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারে। এটি এমন এক সূচক, যা কেবল ভ্রমণের নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি বৈশ্বিক আস্থার পরিমাপক। বাংলাদেশ এখন উত্তর কোরিয়ার সমমর্যাদায় অবস্থান করছেÑএকটি রাষ্ট্র যার উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ যেন বাংলাদেশের নাগরিক মর্যাদার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অপমানজনক প্রতিচ্ছবি।
যখন কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক বিদেশে গমন করে সন্দেহ, হয়রানি ও প্রশ্নবাণের মুখোমুখি হয়, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ইমেজের দেউলিয়াপনা। অথচ দুই দশক আগে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল অনেক উঁচুতে। ২০০৬ সালে আমরা ছিলাম ৬৮তম স্থানে। এর পর থেকে ধারাবাহিক পতনই আমাদের সঙ্গী। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, পাসপোর্ট নিরাপত্তা, ভিসা আলোচনায় দক্ষতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব, সব মিলিয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি।
এবার আসি শিক্ষার প্রসঙ্গেÑযা একটি জাতির নৈতিক ও মানসিক কঙ্কাল। সদ্যপ্রকাশিত এইচএসসি ফলাফল যেন এক সতর্কবার্তা, যে বার্তা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমাগত অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পরিণতি। এবারের পাসের হার মাত্র ৫৮.৮৩ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি। এটি কেবল সংখ্যার পরিসংখ্যান নয়; এটি শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, সিলেবাসের অগভীরতা এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষকের মনোবল ভাঙনের প্রতিফলন। অনেকে বলছেন, এবার প্রকৃত ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে, অতিরঞ্জিত মূল্যায়ন হয়নি। কিন্তু সেই ‘প্রকৃত’ ফলাফলও ভয়াবহ। এটি ইঙ্গিত করে, দেশের শিক্ষার্থীরা এখন জ্ঞানার্জনের চেয়ে পাস-নির্ভর প্রতিযোগিতায় হারিয়ে গেছে। শিক্ষা যখন আত্মগঠনের বদলে সার্টিফিকেট বাণিজ্যে পরিণত হয়, তখন তা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে।
শিক্ষার মান কমে যাওয়া, শিক্ষক আন্দোলনে রাস্তায় নেমে আসা, এবং শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, সবকিছু মিলিয়ে দেশের ইমেজে তৈরি হয়েছে এক ধূসর দাগ। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশ এখন ‘শিক্ষাগত অগ্রগতির’ উদাহরণ নয়, বরং ‘সিস্টেমিক ডিসঅর্ডারের’ প্রতীক।
রাষ্ট্রের ইমেজ সংকটের আরেক গভীর কারণ হলোÑনীতিনির্ধারণে নৈতিকতার অনুপস্থিতি। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, নীতিহীনতা, প্রশাসনিক অপচয়, সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ প্রশাসনিক জড়তা। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো হয়ে উঠছে অগভীর ও ক্ষণস্থায়ী। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কাগজে যতই চমকপ্রদ দেখাক, বাস্তবে তার প্রভাব ন্যূনতম।
প্রশাসনের এই অব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আজ বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে। কোনো রাষ্ট্র যখন বারবার নীতিগত পরিবর্তনে অস্থির হয়, তখন বিনিয়োগকারীরা সরে যায়। এই আস্থাহীনতাই বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। একইসঙ্গে সামাজিক কাঠামোয় বাড়ছে বিভাজন, ক্ষোভ ও অসহিষ্ণুতা। শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থানহীনতার যন্ত্রণায় ভুগছে। তাদের একাংশ বিদেশগামী, অন্যাংশ হতাশা ও অনিশ্চয়তায় নিঃশেষ। রাষ্ট্র যখন তরুণদের কাছে কোনো আশার বার্তা দিতে পারে না, তখন সেই রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ হারায়। তরুণ সমাজের এই অবক্ষয় ইমেজ ক্রাইসিসকে আরও গভীর করছে।বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিবেশেও বিদ্যমান এক ভয়ানক অরাজকতা। সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার, গুজব, তথ্যবিকৃতি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা রোধে রাষ্ট্রের কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো নিজেরাই তথ্য ব্যবস্থাপনায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়।সাইবার স্পেস এখন রাষ্ট্রের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেখানে কার্যকর উপস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আমাদের সাফল্যের খবর ছড়াতে পারে না কোনো কার্যকর কাঠামো। ফলে যখনই কোনো দুর্ঘটনা বা নেগেটিভ সংবাদ ঘটে, তা মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, আর সেই সঙ্গে নিমজ্জিত হয় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। রাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানও আজ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে। বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্যে নেই সেই আত্মবিশ্বাস বা কৌশলগত পরিশীলন। বিদেশে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অনেক সময় কেবল প্রোটোকল রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকেন, রাষ্ট্রীয় ইমেজ রক্ষার সক্রিয় কৌশলে নয়। কূটনীতি যখন পেশাদারিত্বের চেয়ে আমলাতন্ত্রে বন্দি হয়, তখন আন্তর্জাতিক আস্থার দরজা নিজেই বন্ধ হয়ে যায়।
এইসব কারণেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্রমে দুর্বল হচ্ছে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, ভিসা সহযোগিতা, এমনকি সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও অনীহা বাড়ছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নৈতিক বিশৃঙ্খলা যখন বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন সেটি একসময় “ইমেজ ক্রাইসিস” নয়, “ট্রাস্ট ক্রাইসিসে” রূপ নেয়। এখন প্রশ্নÑসমাধান কোথায়? এই সংকট কেবল প্রচারণায় দূর হবে না। প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সাহস, নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন। প্রথমত, রাষ্ট্রকে তার নৈতিক আর্কিটেকচার পুনর্নির্মাণ করতে হবে। দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অপচয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে দেখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনঃসংগঠিত করতে হবে মানবিকতা ও দক্ষতার মিশ্রণে। শিক্ষকদের মর্যাদা, প্রশিক্ষণ ও পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা হতে হবে চিন্তার মুক্তির উপকরণ, কেবল চাকরির সিঁড়ি নয়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বে প্রয়োজন দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী কূটনীতিক, যারা বাংলাদেশের ইতিবাচক বাস্তবতা তুলে ধরতে সক্ষম হবেন। বর্তমানে বাংলাদেশের বহু ইতিবাচক সাফল্য, যেমন নারীর অগ্রগতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিতে স্বনির্ভরতা, এইসব বিষয়ে বিশ্বকে জানাতে রাষ্ট্র ব্যর্থ।
চতুর্থত, প্রশাসনিক সংস্কারে দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামো। নিয়োগ, পদোন্নতি, নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে পেশাদারিত্বে ফিরতে হবে। বন্দর, বিমানবন্দর, ইপিজেড বা কেপিআইভুক্ত স্থাপনাগুলোয় নিরাপত্তা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায়। সবশেষে, রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকতে হবে আত্মসমালোচনাশীল সাহস। ভুল স্বীকার করার নৈতিক শক্তি একটি জাতির পরিপক্বতার পরিচায়ক। আমরা অনেক সময় সংকট আড়াল করতে গিয়ে সেটিকে আরো প্রকট করে তুলি। অথচ সংকট স্বীকার করে সমাধানের পথে যাওয়া, এটাই সভ্যতার অগ্রগতির মূল দর্শন। বাংলাদেশের ইমেজ ক্রাইসিস কোনো অবশ্যম্ভাবী নিয়তি নয়। এটি একটি পরিবর্তনযোগ্য বাস্তবতাÑযদি রাষ্ট্র চায়, এবং সমাজ প্রস্তুত হয়। এই দেশের সম্ভাবনা অপরিসীম। আমরা যে জাতি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র নির্মাণ করেছি, সেই জাতি চাইলে তার ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করতেও সক্ষম। প্রয়োজন কেবল দূরদৃষ্টি, নৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক সাহস। রাষ্ট্র যদি তার আত্মপরিচয় পুনর্নির্মাণে সত্যনিষ্ঠ হয়, তবে বিদেশে নয়, নিজস্ব নাগরিকের কাছেই তার ইমেজ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। কারণ একটি রাষ্ট্রের আসল মর্যাদা আন্তর্জাতিক সূচকে নয়, বরং তার নাগরিকের বিশ্বাসে নিহিত। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই বাংলাদেশের ইমেজ ক্রাইসিস থেকে মুক্তির পথ খুলতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখনো সময় আছে, এই পতনের ইতিহাস পাল্টানোর। কিন্তু সময় সীমিত। যদি এখনো আত্মসমালোচনা না হয়, তবে তলানিরও নিচে নামার আর কোনো জায়গা থাকবে না। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কেবল আন্তর্জাতিক মর্যাদার বিষয় নয়Ñএটি জাতির আত্মসম্মানের প্রশ্ন। আর আত্মসম্মান হারালে রাষ্ট্রের অস্তিত্বও হারায় তার অর্থবোধ। বাংলাদেশ তাই আজ এক সন্ধিক্ষণেÑযেখানে আত্মগঠনের সংকল্পই নির্ধারণ করবে তার ভবিষ্যৎ। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে নিজেদের পুনর্গঠনে সক্ষম হই, তবে এই ইমেজ ক্রাইসিসই একদিন রূপ নিতে পারে আত্মজাগরণের সূচনায়।

-লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কলাম লেখক, রংপুর সদর, রংপুর