ঢাকা, বাংলাদেশ। , শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

প্রোস্টেট ক্যান্সার একটি প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধ করতে প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা ও সতর্কতা

প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:২১:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ জুন ২০২৫
  • / ১৯৯ বার পঠিত
ক্যান্সার মানেই আতঙ্ক, ক্যান্সার মানেই মৃত্যু’ এটিই অনেকের ধারণা। শুধু তাই নয়  এই ক্যান্সারের বিভিন্ন ধরনও আছে ব্লাড ক্যান্সার, ফুসফুসে ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, এই গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হল প্রস্টেট ক্যান্সার।
পুরুষদের প্রস্টেট গ্রন্থির ক্যান্সারকেই প্রস্টেট ক্যান্সার বলে। পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়স হলে পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। পুরুষদের মধ্যে এই মরণঘাতি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি। কিছু সাবধানতা ও সচেতন হলেই এই ক্যান্সার থেকে মুক্ত থাকা যায়।
> প্রোস্টেট কি ?
শুধুমাত্র পুরুষদেরই প্রস্টেট গ্রন্থি রয়েছে। এর আকার অনেকটা কাজুবাদামের সমান। মুত্রথলির নিচ থেকে যেখানে মুত্রনালী বের হয়েছে সেটির চারপাশ জুড়ে এই গ্রন্থিটি বিদ্যমান। এর মধ্য দিয়েই মূত্র এবং বীর্য প্রবাহিত হয়। এই গ্রন্থির মূল কাজ হচ্ছে বীর্যের জন্য কিছুটা তরল পদার্থ তৈরি করা। যৌনকর্মের সময় যে বীর্য স্খলিত হয় সেটি আসলে শুক্রাণু এবং এই তরল পদার্থের মিশ্রণ।
> প্রোস্টেট ক্যান্সারের কারণঃ
পুরুষদের মধ্যে প্রস্টেট ক্যান্সার খুবই সাধারন। প্রস্টেট গ্রন্থির মধ্যে কোষগুলো যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে তখনই ক্যান্সার হতে পারে। সাধারণত ৫০ বছরের পর পুরুষদের প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এর চাইতে কম বয়সেও প্রস্টেট ক্যান্সার হতে পারে, কিন্তু সেটা সচরাচর দেখা যায় না। বয়স যতো বাড়তে থাকে, প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ততোই বেড়ে যায়। পরিবারের কারো যদি (ভাই কিংবা বাবার) প্রস্টেট ক্যান্সার থাকে তাহলেও ঝুঁকির সম্ভাবনা বেড়ে যায় অনেকখানি।প্রোস্টেট ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় এখনো সম্ভব হয়নি, তবে কতগুলো বিষয় লক্ষ করা গেছে যেগুলো প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এগুলোকে বিপদের কারণ হিসেবে মনে করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-
*বয়স যত বেশি প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি তত বেশি।
*প্রোস্টেট ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস৷
*প্রোস্টেট ক্যান্সারের কিছু জেনেটিক কারণও আজকাল আলোচিত হচ্ছে।
*প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ ও এ রোগের যথাযথ চিকিৎসা না করা।
*খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত চর্বি ও আমিষ খাবারের সংযোজন। সিগারেট, তামাক সেবন।
*পুরুষ হরমোন (টেস্টোস্টেরনের) উপস্থিতি প্রোস্টেট ক্যান্সার দ্রুত বৃদ্ধি ও বিস্তারে সাহায্য করে থাকে।
> প্রস্টেট ক্যান্সার হলে আগে যেসব লক্ষণ বলা হয়েছে সেগুলোর সাথে আরো যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
    * পিঠের নিচের দিকে ব্যাথা।
    * লিঙ্গোত্থানে সমস্যা।
    * নিতম্ব বা তার আশেপাশে নতুন করে ব্যাথা দেখা দেয়া।
    * বীর্য কিংবা প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া – কিন্তু এটা খুবই কম দেখা যায়।
ক্যান্সার পরীক্ষার জন্য সবগুলো উপসর্গের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। কারণ বেশিরভাগ সময়েই প্রস্টেট ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। প্রস্টেট খুব ছোট একটা অঙ্গ হওয়ায় খুব বড় কোন ধরেনর লক্ষণ বুঝতে পারা যায় না। তাই উপরের উপসর্গগুলোর এক বা একাধিক যদি দেখা যায় তাহলে দেরি না করে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
> প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণঃ
কোনো কারণে যদি প্রস্টেট বড় হয়ে যায় তাহলে মুত্রনালীর মুখ সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে মুত্র বের হতে সমস্যা হয়। সাধারণত প্রস্টেটর তিন ধরনের সমস্যা দেখা যায়: সাধারণ প্রসারন (BPH), প্রস্টেটের প্রদাহ (একে প্রস্টাইটিস-ও বলে) এবং প্রস্টেট ক্যান্সার। এই সবগুলোর ক্ষেত্রেই সাধারণত একইরকম লক্ষণ দেখা যায়:
* ঘনঘন প্রস্রাব করার প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে রাতের বেলায়।
* প্রস্রাবের প্রচন্ড বেগ পাওয়া, এমনকি মাঝেমাঝে বাথরুমে যাওয়ার আগেই প্রস্রাব করে ফেলা।
* প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া।
* প্রস্রাব করতে প্রচুর সময় লাগে।
* প্রস্রাবে বেগ থাকে না।
* প্রস্রাব করার পরো মুত্রথলিতে প্রস্রাব রয়েছে এমন অনুভব হওয়া।
এছাড়াও আরো কিছু লক্ষণ মাঝে মাঝে দেখা যায়:
* প্রস্রাব করার সময় যন্ত্রণা হওয়া।
* বীর্যপাতের সময় যন্ত্রণা হওয়া।
* অন্ডকোষে ব্যাথা।
এই লক্ষণ বা উপসর্গগুলোর এক বা একাধিকটি যদি আপনার মধ্যে দেখা যায় তাহলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে যাতে করে কি কারণে এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে সেটা নির্ধারন করা যায়।
> প্রোস্টেট ক্যানসার নির্ণয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা
রক্তে PSA পরীক্ষা প্রোস্টেট ক্যানসার নির্ণয়ে সাহায্য করে। এর মাত্রা ৪–এর নিচে থাকলে চিন্তার কিছু নেই। সাধারণত ক্যানসার হলে এর মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। TRUS নামক একটি পরীক্ষা দ্বারা একধরনের ultra sonography-এর মাধ্যমে প্রোস্টেটের ভালো ছবি দেখা যায়। ওই ছবিতে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেলে BIOPSY করা হয়। BIOPSY-এর মাধ্যমে ক্যানসার আছে কি না এবং থাকলে ক্যানসারটি কী ধরনের, তা–ও জানা যায়।
 > প্রোস্টেট ক্যান্সারের প্রকারগুলি:-
প্রোস্টেট ক্যান্সার শুরু হওয়া কোষটি প্রস্টেট ক্যান্সারের ধরণ হিসাবে পরিচিত যা রোগীর মধ্যে হতে পারে।  এখানে প্রোস্টেট ক্যান্সার বিভিন্ন ধরণের রয়েছে:
* অ্যাসিনার অ্যাডেনোকার্সিনোমা:
অ্যাডেনোকার্সিনোমাস ক্যান্সারগুলি প্রোস্টেট গ্রন্থির আস্তরণের মধ্যে উপস্থিত থাকে।  এই ধরণের প্রস্টেট ক্যান্সার হ’ল পুরুষদের মধ্যে সর্বাধিক প্রস্টেট ক্যান্সার।
* ডিউটাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা:
এই ধরণের প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রস্টেটের আস্তরণ থেকে শুরু হয়, তবে তারা অ্যাসিনার অ্যাডেনোকার্সিনোমাস ক্যান্সারের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ।
* ট্রানজিশনাল সেল (বা ইউরোথেলিয়াল) ক্যান্সার:
এই ধরণের প্রস্টেট ক্যান্সার টিউবটির আস্তরণে শুরু হয় যার মাধ্যমে মূত্র, মূত্রনালী বের হওয়ার জন্য ভ্রমণ করে।  কোষগুলি তাই মূত্রাশয়টিতে উপস্থিত থাকে, যা পরে প্রস্টেটের অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
* স্কোয়ামাস সেল ক্যান্সার:
স্কোয়ামাস সেল ক্যান্সারগুলি প্রোস্টেট এ থাকা সমতল কোষ থেকে উৎপন্ন হয়ে টিউমার গঠন করে।  এগুলিও দ্রুত বাড়তে থাকে।
* ক্ষুদ্র কোষ প্রস্টেট ক্যান্সার:
ছোট কোষের প্রোস্টেট ক্যান্সারের নামটি ছোট গোল কোষ দ্বারা দেওয়া হয়েছিল, যা নিউরোএন্ডোক্রাইন ক্যান্সারের জন্ম দেয়।
> প্রস্টেট ক্যান্সারের হোমিও সমাধান :-
প্রস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথি একটি সর্ব-উৎকৃষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা। ক্যান্সারের স্টেজ, রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা ও লক্ষণের উপর ভিত্তি করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকগন প্রাথমিকভাবে  যে-সব ঔষধ নির্বাচন করে থাকে,Sulphur,Thuja Occidentalis, Conium Mac, Berberis Vulguris, Lycopodium, Phosphorus, Clemetis, Solidago, Terebinthina, Acid Phos, Equisetum Hypo, Acid Nit, Stromonium, Opium,nux vomiea   সহ আরো অনেক মেডিসিন লক্ষণের উপর আসতে পারে।তাই পাঠক নিজে নিজে ব্যবহার না করে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।আর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে অনেক রোগী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার উপরে আস্থা রাখছেন। কোন ধরনের অপারেশন ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই হোমিওপ্যাথিতে প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীরা পুরোপুরি আরোগ্য লাভ করে থাকে এবং এডভান্সড স্টেজের রোগীরা হায়াত থাকা পর্যন্ত ভালো থাকে।
> প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে এবং প্রতিরোধ করতে ঘরোয়া সমাধান :-
* স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:-ফল, সবজি, এবং শস্য জাতীয় খাবার বেশি করে খান। বিশেষ করে লাইকোপেন সমৃদ্ধ খাবার যেমন টমেটো, তরমুজ, এবং বিটরুট প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে। ফাস্ট ফুড এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
* নিয়মিত ব্যায়াম:- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিটের জন্য মাঝারি থেকে তীব্র ব্যায়াম করুন। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
* ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার:- ধূমপান ও মদ্যপান ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই এগুলো পরিহার করা উচিত।
* ওজন নিয়ন্ত্রণ:-অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
* নিয়মিত মেডিকেল চেক আপ:-বিশেষ করে যাদের পরিবারে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ইতিহাস আছে, তাদের নিয়মিত প্রোস্টেট-নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন (PSA) পরীক্ষা এবং ডিজিটাল রেকটাল পরীক্ষা (DRE) করানো উচিত।
* রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা:- প্রস্রাবে সমস্যা, যেমন ঘন ঘন প্রস্রাব, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা প্রস্রাব করতে অসুবিধা হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
* মানসিক চাপ কমানো:-মানসিক চাপ কমাতে যোগা, ধ্যান বা শখের প্রতি মনোযোগ দিন। এই সতর্কতাগুলো মেনে চললে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই,ত্বকের ক্যান্সারের পরে প্রোস্টেট ক্যান্সার পুরুষদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক সাধারণ ক্যান্সার এবং পুরুষদের মধ্যে ক্যান্সার মৃত্যুর পঞ্চম প্রধান কারণ. এটি অনুমান করা হয় যে 8 জনের মধ্যে ১ জন পুরুষ তাদের জীবদ্দশায় প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হবেন।আর প্রোস্টেট ক্যানসার একটি প্রাণঘাতী রোগ। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ নতুন করে প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। তার মধ্যে ৩০ হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু ঘটে। তবে রোগের শুরুতে ধরা পড়লে রোগীর প্রাণে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেকেই বুঝতে পারে না যে এই মারণরোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে।তাই প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এ রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। একেবারে শেষ পর্যায়ে এলেও রোগ বাড়তে না দিয়ে দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকা যায়।
আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

প্রোস্টেট ক্যান্সার একটি প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধ করতে প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা ও সতর্কতা

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:২১:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ জুন ২০২৫
ক্যান্সার মানেই আতঙ্ক, ক্যান্সার মানেই মৃত্যু’ এটিই অনেকের ধারণা। শুধু তাই নয়  এই ক্যান্সারের বিভিন্ন ধরনও আছে ব্লাড ক্যান্সার, ফুসফুসে ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, এই গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হল প্রস্টেট ক্যান্সার।
পুরুষদের প্রস্টেট গ্রন্থির ক্যান্সারকেই প্রস্টেট ক্যান্সার বলে। পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়স হলে পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। পুরুষদের মধ্যে এই মরণঘাতি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি। কিছু সাবধানতা ও সচেতন হলেই এই ক্যান্সার থেকে মুক্ত থাকা যায়।
> প্রোস্টেট কি ?
শুধুমাত্র পুরুষদেরই প্রস্টেট গ্রন্থি রয়েছে। এর আকার অনেকটা কাজুবাদামের সমান। মুত্রথলির নিচ থেকে যেখানে মুত্রনালী বের হয়েছে সেটির চারপাশ জুড়ে এই গ্রন্থিটি বিদ্যমান। এর মধ্য দিয়েই মূত্র এবং বীর্য প্রবাহিত হয়। এই গ্রন্থির মূল কাজ হচ্ছে বীর্যের জন্য কিছুটা তরল পদার্থ তৈরি করা। যৌনকর্মের সময় যে বীর্য স্খলিত হয় সেটি আসলে শুক্রাণু এবং এই তরল পদার্থের মিশ্রণ।
> প্রোস্টেট ক্যান্সারের কারণঃ
পুরুষদের মধ্যে প্রস্টেট ক্যান্সার খুবই সাধারন। প্রস্টেট গ্রন্থির মধ্যে কোষগুলো যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে তখনই ক্যান্সার হতে পারে। সাধারণত ৫০ বছরের পর পুরুষদের প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এর চাইতে কম বয়সেও প্রস্টেট ক্যান্সার হতে পারে, কিন্তু সেটা সচরাচর দেখা যায় না। বয়স যতো বাড়তে থাকে, প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ততোই বেড়ে যায়। পরিবারের কারো যদি (ভাই কিংবা বাবার) প্রস্টেট ক্যান্সার থাকে তাহলেও ঝুঁকির সম্ভাবনা বেড়ে যায় অনেকখানি।প্রোস্টেট ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় এখনো সম্ভব হয়নি, তবে কতগুলো বিষয় লক্ষ করা গেছে যেগুলো প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এগুলোকে বিপদের কারণ হিসেবে মনে করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-
*বয়স যত বেশি প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি তত বেশি।
*প্রোস্টেট ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস৷
*প্রোস্টেট ক্যান্সারের কিছু জেনেটিক কারণও আজকাল আলোচিত হচ্ছে।
*প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ ও এ রোগের যথাযথ চিকিৎসা না করা।
*খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত চর্বি ও আমিষ খাবারের সংযোজন। সিগারেট, তামাক সেবন।
*পুরুষ হরমোন (টেস্টোস্টেরনের) উপস্থিতি প্রোস্টেট ক্যান্সার দ্রুত বৃদ্ধি ও বিস্তারে সাহায্য করে থাকে।
> প্রস্টেট ক্যান্সার হলে আগে যেসব লক্ষণ বলা হয়েছে সেগুলোর সাথে আরো যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
    * পিঠের নিচের দিকে ব্যাথা।
    * লিঙ্গোত্থানে সমস্যা।
    * নিতম্ব বা তার আশেপাশে নতুন করে ব্যাথা দেখা দেয়া।
    * বীর্য কিংবা প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া – কিন্তু এটা খুবই কম দেখা যায়।
ক্যান্সার পরীক্ষার জন্য সবগুলো উপসর্গের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। কারণ বেশিরভাগ সময়েই প্রস্টেট ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। প্রস্টেট খুব ছোট একটা অঙ্গ হওয়ায় খুব বড় কোন ধরেনর লক্ষণ বুঝতে পারা যায় না। তাই উপরের উপসর্গগুলোর এক বা একাধিক যদি দেখা যায় তাহলে দেরি না করে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
> প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণঃ
কোনো কারণে যদি প্রস্টেট বড় হয়ে যায় তাহলে মুত্রনালীর মুখ সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে মুত্র বের হতে সমস্যা হয়। সাধারণত প্রস্টেটর তিন ধরনের সমস্যা দেখা যায়: সাধারণ প্রসারন (BPH), প্রস্টেটের প্রদাহ (একে প্রস্টাইটিস-ও বলে) এবং প্রস্টেট ক্যান্সার। এই সবগুলোর ক্ষেত্রেই সাধারণত একইরকম লক্ষণ দেখা যায়:
* ঘনঘন প্রস্রাব করার প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে রাতের বেলায়।
* প্রস্রাবের প্রচন্ড বেগ পাওয়া, এমনকি মাঝেমাঝে বাথরুমে যাওয়ার আগেই প্রস্রাব করে ফেলা।
* প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া।
* প্রস্রাব করতে প্রচুর সময় লাগে।
* প্রস্রাবে বেগ থাকে না।
* প্রস্রাব করার পরো মুত্রথলিতে প্রস্রাব রয়েছে এমন অনুভব হওয়া।
এছাড়াও আরো কিছু লক্ষণ মাঝে মাঝে দেখা যায়:
* প্রস্রাব করার সময় যন্ত্রণা হওয়া।
* বীর্যপাতের সময় যন্ত্রণা হওয়া।
* অন্ডকোষে ব্যাথা।
এই লক্ষণ বা উপসর্গগুলোর এক বা একাধিকটি যদি আপনার মধ্যে দেখা যায় তাহলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে যাতে করে কি কারণে এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে সেটা নির্ধারন করা যায়।
> প্রোস্টেট ক্যানসার নির্ণয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা
রক্তে PSA পরীক্ষা প্রোস্টেট ক্যানসার নির্ণয়ে সাহায্য করে। এর মাত্রা ৪–এর নিচে থাকলে চিন্তার কিছু নেই। সাধারণত ক্যানসার হলে এর মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। TRUS নামক একটি পরীক্ষা দ্বারা একধরনের ultra sonography-এর মাধ্যমে প্রোস্টেটের ভালো ছবি দেখা যায়। ওই ছবিতে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেলে BIOPSY করা হয়। BIOPSY-এর মাধ্যমে ক্যানসার আছে কি না এবং থাকলে ক্যানসারটি কী ধরনের, তা–ও জানা যায়।
 > প্রোস্টেট ক্যান্সারের প্রকারগুলি:-
প্রোস্টেট ক্যান্সার শুরু হওয়া কোষটি প্রস্টেট ক্যান্সারের ধরণ হিসাবে পরিচিত যা রোগীর মধ্যে হতে পারে।  এখানে প্রোস্টেট ক্যান্সার বিভিন্ন ধরণের রয়েছে:
* অ্যাসিনার অ্যাডেনোকার্সিনোমা:
অ্যাডেনোকার্সিনোমাস ক্যান্সারগুলি প্রোস্টেট গ্রন্থির আস্তরণের মধ্যে উপস্থিত থাকে।  এই ধরণের প্রস্টেট ক্যান্সার হ’ল পুরুষদের মধ্যে সর্বাধিক প্রস্টেট ক্যান্সার।
* ডিউটাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা:
এই ধরণের প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রস্টেটের আস্তরণ থেকে শুরু হয়, তবে তারা অ্যাসিনার অ্যাডেনোকার্সিনোমাস ক্যান্সারের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ।
* ট্রানজিশনাল সেল (বা ইউরোথেলিয়াল) ক্যান্সার:
এই ধরণের প্রস্টেট ক্যান্সার টিউবটির আস্তরণে শুরু হয় যার মাধ্যমে মূত্র, মূত্রনালী বের হওয়ার জন্য ভ্রমণ করে।  কোষগুলি তাই মূত্রাশয়টিতে উপস্থিত থাকে, যা পরে প্রস্টেটের অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
* স্কোয়ামাস সেল ক্যান্সার:
স্কোয়ামাস সেল ক্যান্সারগুলি প্রোস্টেট এ থাকা সমতল কোষ থেকে উৎপন্ন হয়ে টিউমার গঠন করে।  এগুলিও দ্রুত বাড়তে থাকে।
* ক্ষুদ্র কোষ প্রস্টেট ক্যান্সার:
ছোট কোষের প্রোস্টেট ক্যান্সারের নামটি ছোট গোল কোষ দ্বারা দেওয়া হয়েছিল, যা নিউরোএন্ডোক্রাইন ক্যান্সারের জন্ম দেয়।
> প্রস্টেট ক্যান্সারের হোমিও সমাধান :-
প্রস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথি একটি সর্ব-উৎকৃষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা। ক্যান্সারের স্টেজ, রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা ও লক্ষণের উপর ভিত্তি করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকগন প্রাথমিকভাবে  যে-সব ঔষধ নির্বাচন করে থাকে,Sulphur,Thuja Occidentalis, Conium Mac, Berberis Vulguris, Lycopodium, Phosphorus, Clemetis, Solidago, Terebinthina, Acid Phos, Equisetum Hypo, Acid Nit, Stromonium, Opium,nux vomiea   সহ আরো অনেক মেডিসিন লক্ষণের উপর আসতে পারে।তাই পাঠক নিজে নিজে ব্যবহার না করে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।আর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে অনেক রোগী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার উপরে আস্থা রাখছেন। কোন ধরনের অপারেশন ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই হোমিওপ্যাথিতে প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীরা পুরোপুরি আরোগ্য লাভ করে থাকে এবং এডভান্সড স্টেজের রোগীরা হায়াত থাকা পর্যন্ত ভালো থাকে।
> প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে এবং প্রতিরোধ করতে ঘরোয়া সমাধান :-
* স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:-ফল, সবজি, এবং শস্য জাতীয় খাবার বেশি করে খান। বিশেষ করে লাইকোপেন সমৃদ্ধ খাবার যেমন টমেটো, তরমুজ, এবং বিটরুট প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে। ফাস্ট ফুড এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
* নিয়মিত ব্যায়াম:- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিটের জন্য মাঝারি থেকে তীব্র ব্যায়াম করুন। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
* ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার:- ধূমপান ও মদ্যপান ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই এগুলো পরিহার করা উচিত।
* ওজন নিয়ন্ত্রণ:-অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
* নিয়মিত মেডিকেল চেক আপ:-বিশেষ করে যাদের পরিবারে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ইতিহাস আছে, তাদের নিয়মিত প্রোস্টেট-নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন (PSA) পরীক্ষা এবং ডিজিটাল রেকটাল পরীক্ষা (DRE) করানো উচিত।
* রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা:- প্রস্রাবে সমস্যা, যেমন ঘন ঘন প্রস্রাব, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা প্রস্রাব করতে অসুবিধা হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
* মানসিক চাপ কমানো:-মানসিক চাপ কমাতে যোগা, ধ্যান বা শখের প্রতি মনোযোগ দিন। এই সতর্কতাগুলো মেনে চললে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই,ত্বকের ক্যান্সারের পরে প্রোস্টেট ক্যান্সার পুরুষদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক সাধারণ ক্যান্সার এবং পুরুষদের মধ্যে ক্যান্সার মৃত্যুর পঞ্চম প্রধান কারণ. এটি অনুমান করা হয় যে 8 জনের মধ্যে ১ জন পুরুষ তাদের জীবদ্দশায় প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হবেন।আর প্রোস্টেট ক্যানসার একটি প্রাণঘাতী রোগ। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ নতুন করে প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। তার মধ্যে ৩০ হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু ঘটে। তবে রোগের শুরুতে ধরা পড়লে রোগীর প্রাণে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেকেই বুঝতে পারে না যে এই মারণরোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে।তাই প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এ রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। একেবারে শেষ পর্যায়ে এলেও রোগ বাড়তে না দিয়ে দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকা যায়।