ঢাকা, বাংলাদেশ। , শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

যে বাহিনী ন্যায়ের প্রতীক, তাকে সন্দেহ নয়, সম্মান দিন

রাফায়েল আহমেদ শামীম
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:২৯:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫
  • / ২৫৪ বার পঠিত

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী নামটি উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে যায় এক অনমনীয় প্রতীকÑযে প্রতীকের ভেতরে লুকিয়ে আছে শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ আর এক অবিনাশী নৈতিকতার অঙ্গীকার। স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া এই বাহিনী কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এক জাতির সম্মিলিত আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। যে দেশ একাত্তরে আগুনে পুড়ে জন্ম নিয়েছিল, সেই আগুনের ভস্ম থেকে উঠে আসা এই সেনাবাহিনী জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। অথচ আজকাল মাঝে মাঝেই দেখা যায়, কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা ব্যক্তিগত অনিয়মের দায় পুরো সেনাবাহিনীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার এক অদ্ভুত প্রবণতা। এই মানসিকতা শুধু অজ্ঞতার নয়, এটি রাষ্ট্রবোধের দুর্বলতারও প্রকাশ।
রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপরÑবিচার, প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা। এদের মধ্যে সেনাবাহিনী এমন এক শক্তি, যা দৃশ্যত শৃঙ্খলার প্রতীক হলেও প্রকৃত অর্থে এটি রাষ্ট্রের ‘নৈতিক মেরুদণ্ড’। যখন প্রশাসনিক নৈরাজ্য, রাজনৈতিক দুর্নীতি বা সামাজিক অবক্ষয় নাগরিক আস্থাকে ভেঙে দেয়, তখন মানুষ শেষ আশ্রয় খোঁজে সেনাবাহিনীর দিকে। কারণ তাদের মনে গেঁথে আছে এক বিশ্বাসÑএই বাহিনী এখনো অক্ষত, এখনো তারা সততার শেষ দুর্গ।
কিন্তু এই বিশ্বাসও অনন্তকাল টিকে থাকে না যদি সমাজ তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সন্দেহ পোষণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাÑযেমন গুম, খুন, বা বিশেষ অভিযানে অপব্যবহারের অভিযোগÑগণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে প্রচারিত হয় যেন পুরো সেনাবাহিনীই কোনো অন্ধকার শক্তি। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। অপরাধ করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান নয়। একজন অফিসার বা সৈনিকের অনৈতিক আচরণ পুরো বাহিনীর প্রতীক হতে পারে না। যেমন কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যায় না, কিংবা কোনো চিকিৎসকের অনিয়মে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে কলুষিত বলা যায় না।
আমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা ক্রমেই জেঁকে বসছেÑ‘গুজবের ওপর বিশ্বাস’। কেউ একজন কোনো খবর শুনল, একটু ঘেঁটে না দেখেই সেটি প্রচার করল, আর মুহূর্তের মধ্যে সেটি রূপ নিল ‘সত্যে’। সেনাবাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান যখন এই গুজবের লক্ষ্যবস্তু হয়, তখন বিষয়টি কেবল একটি বাহিনীর ক্ষতি নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। কারণ জনগণের আস্থা হারানো মানে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা স্তম্ভ ভেঙে পড়া।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধুমাত্র অস্ত্রধারী বাহিনী নয়; তারা মানবিকতারও বাহক। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধস, মহামারিÑযখনই দেশ বিপদে পড়েছে, সৈনিকরা ছুটে গেছে মানুষের পাশে। তারা ঘর বানিয়েছে, রাস্তাঘাট মেরামত করেছে, খাদ্য বিতরণ করেছে। এই নিঃস্বার্থ মানবসেবাই তাদের মর্যাদাকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনারা আজ বিশ্বের সম্মানিত নাম। আফ্রিকার মরুপ্রান্ত থেকে হাইতির ধ্বংসস্তূপ পর্যন্ত তারা শান্তি, ন্যায় ও মানবতার বার্তা বহন করেছে। এই যে বৈশ্বিক স্বীকৃতিÑএটি এসেছে তাদের নৈতিকতা, পেশাদারিত্ব ও মানবিক সংবেদনশীলতার কারণে।
তবে এই সম্মান অর্জনের পথ সহজ ছিল না। ইতিহাসের প্রত্যেকটি যুদ্ধক্ষেত্র, প্রত্যেকটি শান্তিরক্ষা মিশন তাদের রক্তে রঞ্জিত। শতাধিক বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী আজও ঘরে ফেরেননি; তারা পতাকা বুকে জড়িয়ে নিঃশেষ হয়েছেন মানবতার সেবায়। এই আত্মত্যাগের বিপরীতে কোনো অপবাদ, কোনো গুজব, কোনো বিভ্রান্তিকর প্রচারণা কখনোই ন্যায্য হতে পারে না।
তবু, বাস্তবতা হলোÑপ্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই কিছু মানুষ থাকে, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ক্ষমতার প্রলোভনে আদর্শচ্যুত হয়। সেনাবাহিনীতেও এমন কিছু বিচ্যুতি ঘটতে পারে, এবং ঘটলে তার জন্য প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা নয়, বরং সেই ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করাÑএটাই ন্যায়বিচার। সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচারব্যবস্থা আছে, যেখানে কোর্ট মার্শাল, পদবনতি, বহিষ্কার বা কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু নৈতিকতা কেবল শাস্তির ভয় দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না। এটি গড়ে তুলতে হয় চেতনা, শিক্ষা এবং উদাহরণের মাধ্যমে।
সেনাবাহিনীর প্রতিটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে শেখানো হয়Ñঅস্ত্র তোমাকে শক্তি দেয়, কিন্তু নৈতিকতা তোমাকে সম্মান দেয়। এই বাক্যটি যেন বাহিনীর সাংবিধানিক সূত্রবাক্য। কারণ একটি সেনাবাহিনীর শক্তি তার ট্যাংক, রাইফেল বা বিমান নয়; তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার নৈতিক চরিত্রে। একবার সেই চরিত্র ক্ষয়ে গেলে বাহিনীর অস্তিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পাকিস্তান, মায়ানমার কিংবা আফ্রিকার বহু দেশের অভিজ্ঞতা তাই বলেÑরাজনীতিতে জড়িত সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত নিজের সম্মানও হারায়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাও নষ্ট করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেই ভুল পথে হাঁটেনি। তারা বুঝেছে, রাজনীতি হলো পরিবর্তনের, কিন্তু সেনাবাহিনী হলো স্থিতির প্রতীক। রাজনীতি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দেশপ্রেম স্থায়ী। তাই তারা নিজেকে রাজনীতির থেকে দূরে রেখে জনগণের সেবায় নিবেদিত থেকেছে। অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তা সমাজে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করেনÑএটি তাদের নাগরিক অধিকার। কিন্তু এদের বক্তব্য বা আচরণকে কখনোই পুরো বাহিনীর অফিসিয়াল অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় একটি স্পষ্ট যোগাযোগনীতি প্রয়োজনÑযেখানে ব্যক্তিগত মত ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের সীমারেখা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে।
আজকের বিশ্ব ‘তথ্যযুদ্ধের যুগ’। একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে এখন আর কামান বা মিসাইল লাগে না; লাগে শুধু একটি মিথ্যা প্রচারণা। একটি ভিডিও ক্লিপ, একটি বিকৃত ছবি বা একটি মনগড়া প্রতিবেদনÑমুহূর্তেই কোটি মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বপন করতে পারে। তাই সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় এখন প্রয়োজন তথ্য-নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল সচেতনতা। কারণ গুজবের প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সত্য। একটি জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন তার স্বাধীনতা, আর সেই স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হচ্ছে সেনাবাহিনী। এই বাহিনী যদি দুর্বল হয়, তাহলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। তাই যখন কেউ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়, তখন সে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো রাষ্ট্রের ভিত্তিকে আঘাত করে। সমালোচনা অবশ্যই করা যায়Ñকিন্তু তা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, যুক্তিসঙ্গত এবং ন্যায্যতার সীমায়। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর ভেতরেও দরকার অবিরাম আত্মশুদ্ধি। কারণ নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয় ভেতর থেকেই। বাহিনীর যে ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, সততা, নিঃস্বার্থতা যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অক্ষুণ্ন থাকে। নতুন প্রজন্মের অফিসারদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক বোধ ও পেশাদার নিরপেক্ষতা জাগ্রত রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ যুগে রাজনীতি ও অর্থনীতি এক অদ্ভুত জোটে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা মানেই এখন সম্পদ, আর সম্পদ মানেই প্রভাব। এই প্রলোভন যদি সেনাবাহিনীর ভেতরে ঢোকে, তাহলে সেটি হবে জাতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। তাই দরকার নৈতিক প্রতিরোধÑএকটি সাংস্কৃতিক নীতি, যেখানে বলা হবে, “আমরা রাজনীতির সৈনিক নই; আমরা জাতির সৈনিক।”
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা এই নৈতিক শক্তির প্রমাণ। এক যুগ নয়, প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপীড়িত দেশে শান্তির বার্তা ছড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত ৬০টিরও বেশি মিশনে দুই লাখের বেশি সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা যে শুধু পেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন তা নয়, তারা দেখিয়েছেন মানবিকতা, শিশুর চোখে আশা ফেরানো, যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামে বিদ্যালয় নির্মাণ, নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা, এসবই বাংলাদেশের নৈতিক পরিচয়ের আন্তর্জাতিক প্রতিফলন। বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বিশ্বের শীর্ষ তিন প্রেরণকারী দেশের একটি। এই সাফল্য কেবল সংখ্যায় নয়, মানে ও মর্যাদায়ও। নারী শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখেও। এই অর্জন কোনো সামরিক কৌশলের ফল নয়; এটি নৈতিক নেতৃত্বের বিজয়।
তবু এই অর্জন যত গৌরবেরই হোক, একটি ছোট ভুল, একটি অপরাধ, একটি অনৈতিক কর্মকাণ্ড মুহূর্তে সেই মর্যাদাকে ম্লান করে দিতে পারে। তাই ‘অপরাধীকে দায়ী করুন, সেনাবাহিনীকে নয়’Ñএই নীতি এখন শুধু আহ্বান নয়, এটি এক প্রাতিষ্ঠানিক দার্শনিকতা হওয়া উচিত। কারণ কোনো বাহিনী তখনই শক্তিশালী থাকে, যখন সে অন্যায়ের দায় স্বীকার করে কিন্তু সম্মিলিত নৈতিকতাকে কলঙ্কিত হতে দেয় না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক মৌলিক সূত্র হলোÑ‘নৈতিক শক্তি ব্যতীত সামরিক শক্তি অর্থহীন।’ যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় অস্ত্র দিয়ে, কিন্তু জাতিকে রক্ষা করা যায় কেবল নৈতিকতার দ্বারা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শক্তি এই নৈতিকতাতেই। তারা জানে, পতাকা শুধু কাপড় নয়Ñএটি এক জাতির আত্মা। আমরা যারা বেসামরিক নাগরিক, আমাদেরও দায়িত্ব কম নয়। সেনাবাহিনীকে সম্মান জানানো মানে কেবল স্যালুট করা নয়; মানে তাদের প্রতি ন্যায্যতা দেখানো, তাদের আত্মত্যাগের মূল্য দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণায় না জড়ানো। কারণ একটি বাহিনীর মর্যাদা রাষ্ট্রের মর্যাদা।
শেষমেশ বলা যায়, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এখন যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা কেবল প্রশিক্ষণ বা প্রযুক্তির কারণে নয়Ñএটি তাদের অভ্যন্তরীণ নৈতিক স্থিতির ফল। এই নৈতিকতাই তাদের পৃথিবীর মানচিত্রে আলাদা করেছে। তাই আসুন, আমরা একসঙ্গে বলি:

“সেনাবাহিনীকে নয়, দায়ী করুন অপরাধীকে।”
কারণ বাহিনী নয়, নৈতিকতাই জাতির প্রকৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

– লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কলাম লেখক, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

যে বাহিনী ন্যায়ের প্রতীক, তাকে সন্দেহ নয়, সম্মান দিন

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:২৯:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী নামটি উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে যায় এক অনমনীয় প্রতীকÑযে প্রতীকের ভেতরে লুকিয়ে আছে শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ আর এক অবিনাশী নৈতিকতার অঙ্গীকার। স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া এই বাহিনী কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এক জাতির সম্মিলিত আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। যে দেশ একাত্তরে আগুনে পুড়ে জন্ম নিয়েছিল, সেই আগুনের ভস্ম থেকে উঠে আসা এই সেনাবাহিনী জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। অথচ আজকাল মাঝে মাঝেই দেখা যায়, কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা ব্যক্তিগত অনিয়মের দায় পুরো সেনাবাহিনীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার এক অদ্ভুত প্রবণতা। এই মানসিকতা শুধু অজ্ঞতার নয়, এটি রাষ্ট্রবোধের দুর্বলতারও প্রকাশ।
রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপরÑবিচার, প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা। এদের মধ্যে সেনাবাহিনী এমন এক শক্তি, যা দৃশ্যত শৃঙ্খলার প্রতীক হলেও প্রকৃত অর্থে এটি রাষ্ট্রের ‘নৈতিক মেরুদণ্ড’। যখন প্রশাসনিক নৈরাজ্য, রাজনৈতিক দুর্নীতি বা সামাজিক অবক্ষয় নাগরিক আস্থাকে ভেঙে দেয়, তখন মানুষ শেষ আশ্রয় খোঁজে সেনাবাহিনীর দিকে। কারণ তাদের মনে গেঁথে আছে এক বিশ্বাসÑএই বাহিনী এখনো অক্ষত, এখনো তারা সততার শেষ দুর্গ।
কিন্তু এই বিশ্বাসও অনন্তকাল টিকে থাকে না যদি সমাজ তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সন্দেহ পোষণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাÑযেমন গুম, খুন, বা বিশেষ অভিযানে অপব্যবহারের অভিযোগÑগণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে প্রচারিত হয় যেন পুরো সেনাবাহিনীই কোনো অন্ধকার শক্তি। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। অপরাধ করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান নয়। একজন অফিসার বা সৈনিকের অনৈতিক আচরণ পুরো বাহিনীর প্রতীক হতে পারে না। যেমন কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যায় না, কিংবা কোনো চিকিৎসকের অনিয়মে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে কলুষিত বলা যায় না।
আমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা ক্রমেই জেঁকে বসছেÑ‘গুজবের ওপর বিশ্বাস’। কেউ একজন কোনো খবর শুনল, একটু ঘেঁটে না দেখেই সেটি প্রচার করল, আর মুহূর্তের মধ্যে সেটি রূপ নিল ‘সত্যে’। সেনাবাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান যখন এই গুজবের লক্ষ্যবস্তু হয়, তখন বিষয়টি কেবল একটি বাহিনীর ক্ষতি নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। কারণ জনগণের আস্থা হারানো মানে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা স্তম্ভ ভেঙে পড়া।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধুমাত্র অস্ত্রধারী বাহিনী নয়; তারা মানবিকতারও বাহক। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধস, মহামারিÑযখনই দেশ বিপদে পড়েছে, সৈনিকরা ছুটে গেছে মানুষের পাশে। তারা ঘর বানিয়েছে, রাস্তাঘাট মেরামত করেছে, খাদ্য বিতরণ করেছে। এই নিঃস্বার্থ মানবসেবাই তাদের মর্যাদাকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনারা আজ বিশ্বের সম্মানিত নাম। আফ্রিকার মরুপ্রান্ত থেকে হাইতির ধ্বংসস্তূপ পর্যন্ত তারা শান্তি, ন্যায় ও মানবতার বার্তা বহন করেছে। এই যে বৈশ্বিক স্বীকৃতিÑএটি এসেছে তাদের নৈতিকতা, পেশাদারিত্ব ও মানবিক সংবেদনশীলতার কারণে।
তবে এই সম্মান অর্জনের পথ সহজ ছিল না। ইতিহাসের প্রত্যেকটি যুদ্ধক্ষেত্র, প্রত্যেকটি শান্তিরক্ষা মিশন তাদের রক্তে রঞ্জিত। শতাধিক বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী আজও ঘরে ফেরেননি; তারা পতাকা বুকে জড়িয়ে নিঃশেষ হয়েছেন মানবতার সেবায়। এই আত্মত্যাগের বিপরীতে কোনো অপবাদ, কোনো গুজব, কোনো বিভ্রান্তিকর প্রচারণা কখনোই ন্যায্য হতে পারে না।
তবু, বাস্তবতা হলোÑপ্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই কিছু মানুষ থাকে, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ক্ষমতার প্রলোভনে আদর্শচ্যুত হয়। সেনাবাহিনীতেও এমন কিছু বিচ্যুতি ঘটতে পারে, এবং ঘটলে তার জন্য প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা নয়, বরং সেই ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করাÑএটাই ন্যায়বিচার। সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচারব্যবস্থা আছে, যেখানে কোর্ট মার্শাল, পদবনতি, বহিষ্কার বা কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু নৈতিকতা কেবল শাস্তির ভয় দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না। এটি গড়ে তুলতে হয় চেতনা, শিক্ষা এবং উদাহরণের মাধ্যমে।
সেনাবাহিনীর প্রতিটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে শেখানো হয়Ñঅস্ত্র তোমাকে শক্তি দেয়, কিন্তু নৈতিকতা তোমাকে সম্মান দেয়। এই বাক্যটি যেন বাহিনীর সাংবিধানিক সূত্রবাক্য। কারণ একটি সেনাবাহিনীর শক্তি তার ট্যাংক, রাইফেল বা বিমান নয়; তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার নৈতিক চরিত্রে। একবার সেই চরিত্র ক্ষয়ে গেলে বাহিনীর অস্তিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পাকিস্তান, মায়ানমার কিংবা আফ্রিকার বহু দেশের অভিজ্ঞতা তাই বলেÑরাজনীতিতে জড়িত সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত নিজের সম্মানও হারায়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাও নষ্ট করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেই ভুল পথে হাঁটেনি। তারা বুঝেছে, রাজনীতি হলো পরিবর্তনের, কিন্তু সেনাবাহিনী হলো স্থিতির প্রতীক। রাজনীতি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দেশপ্রেম স্থায়ী। তাই তারা নিজেকে রাজনীতির থেকে দূরে রেখে জনগণের সেবায় নিবেদিত থেকেছে। অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তা সমাজে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করেনÑএটি তাদের নাগরিক অধিকার। কিন্তু এদের বক্তব্য বা আচরণকে কখনোই পুরো বাহিনীর অফিসিয়াল অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় একটি স্পষ্ট যোগাযোগনীতি প্রয়োজনÑযেখানে ব্যক্তিগত মত ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের সীমারেখা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে।
আজকের বিশ্ব ‘তথ্যযুদ্ধের যুগ’। একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে এখন আর কামান বা মিসাইল লাগে না; লাগে শুধু একটি মিথ্যা প্রচারণা। একটি ভিডিও ক্লিপ, একটি বিকৃত ছবি বা একটি মনগড়া প্রতিবেদনÑমুহূর্তেই কোটি মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বপন করতে পারে। তাই সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় এখন প্রয়োজন তথ্য-নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল সচেতনতা। কারণ গুজবের প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সত্য। একটি জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন তার স্বাধীনতা, আর সেই স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হচ্ছে সেনাবাহিনী। এই বাহিনী যদি দুর্বল হয়, তাহলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। তাই যখন কেউ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়, তখন সে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো রাষ্ট্রের ভিত্তিকে আঘাত করে। সমালোচনা অবশ্যই করা যায়Ñকিন্তু তা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, যুক্তিসঙ্গত এবং ন্যায্যতার সীমায়। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর ভেতরেও দরকার অবিরাম আত্মশুদ্ধি। কারণ নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয় ভেতর থেকেই। বাহিনীর যে ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, সততা, নিঃস্বার্থতা যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অক্ষুণ্ন থাকে। নতুন প্রজন্মের অফিসারদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক বোধ ও পেশাদার নিরপেক্ষতা জাগ্রত রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ যুগে রাজনীতি ও অর্থনীতি এক অদ্ভুত জোটে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা মানেই এখন সম্পদ, আর সম্পদ মানেই প্রভাব। এই প্রলোভন যদি সেনাবাহিনীর ভেতরে ঢোকে, তাহলে সেটি হবে জাতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। তাই দরকার নৈতিক প্রতিরোধÑএকটি সাংস্কৃতিক নীতি, যেখানে বলা হবে, “আমরা রাজনীতির সৈনিক নই; আমরা জাতির সৈনিক।”
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা এই নৈতিক শক্তির প্রমাণ। এক যুগ নয়, প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপীড়িত দেশে শান্তির বার্তা ছড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত ৬০টিরও বেশি মিশনে দুই লাখের বেশি সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা যে শুধু পেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন তা নয়, তারা দেখিয়েছেন মানবিকতা, শিশুর চোখে আশা ফেরানো, যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামে বিদ্যালয় নির্মাণ, নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা, এসবই বাংলাদেশের নৈতিক পরিচয়ের আন্তর্জাতিক প্রতিফলন। বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বিশ্বের শীর্ষ তিন প্রেরণকারী দেশের একটি। এই সাফল্য কেবল সংখ্যায় নয়, মানে ও মর্যাদায়ও। নারী শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখেও। এই অর্জন কোনো সামরিক কৌশলের ফল নয়; এটি নৈতিক নেতৃত্বের বিজয়।
তবু এই অর্জন যত গৌরবেরই হোক, একটি ছোট ভুল, একটি অপরাধ, একটি অনৈতিক কর্মকাণ্ড মুহূর্তে সেই মর্যাদাকে ম্লান করে দিতে পারে। তাই ‘অপরাধীকে দায়ী করুন, সেনাবাহিনীকে নয়’Ñএই নীতি এখন শুধু আহ্বান নয়, এটি এক প্রাতিষ্ঠানিক দার্শনিকতা হওয়া উচিত। কারণ কোনো বাহিনী তখনই শক্তিশালী থাকে, যখন সে অন্যায়ের দায় স্বীকার করে কিন্তু সম্মিলিত নৈতিকতাকে কলঙ্কিত হতে দেয় না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক মৌলিক সূত্র হলোÑ‘নৈতিক শক্তি ব্যতীত সামরিক শক্তি অর্থহীন।’ যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় অস্ত্র দিয়ে, কিন্তু জাতিকে রক্ষা করা যায় কেবল নৈতিকতার দ্বারা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শক্তি এই নৈতিকতাতেই। তারা জানে, পতাকা শুধু কাপড় নয়Ñএটি এক জাতির আত্মা। আমরা যারা বেসামরিক নাগরিক, আমাদেরও দায়িত্ব কম নয়। সেনাবাহিনীকে সম্মান জানানো মানে কেবল স্যালুট করা নয়; মানে তাদের প্রতি ন্যায্যতা দেখানো, তাদের আত্মত্যাগের মূল্য দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণায় না জড়ানো। কারণ একটি বাহিনীর মর্যাদা রাষ্ট্রের মর্যাদা।
শেষমেশ বলা যায়, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এখন যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা কেবল প্রশিক্ষণ বা প্রযুক্তির কারণে নয়Ñএটি তাদের অভ্যন্তরীণ নৈতিক স্থিতির ফল। এই নৈতিকতাই তাদের পৃথিবীর মানচিত্রে আলাদা করেছে। তাই আসুন, আমরা একসঙ্গে বলি:

“সেনাবাহিনীকে নয়, দায়ী করুন অপরাধীকে।”
কারণ বাহিনী নয়, নৈতিকতাই জাতির প্রকৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

– লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কলাম লেখক, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা