ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
তাজা খবর
যশোরে কৃত্রিম তেল সংকটে দিশেহারা চালক ও সাধারণ মানুষ
জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার তেল শোধনাগারে ভয়াবহ আগুন
ফুয়েল পাস নিতে নিবন্ধনের নিয়ম
গ্রামীণ আবহ আর কারুপণ্যের সম্ভার নিয়ে চলছে বৈশাখী মেলা
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে মারা গেছেন
বরেণ্য গীতিকবি,সুরকার,লেখক ও সংগীত গুরু ইউনুস আলী মোল্লার
স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে মাদারীপুরে ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ
গণধর্ষেণের শিকার ৬-বছরের শিশু ও ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী: গ্রেফতার-১
জাল টাকার কারখানায় অভিযান, আটক-১
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
''যুদ্ধের ছায়ায় জ্বালানি সংকট''
রেশনিং ও কঠোর বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি

জেমস আব্দুর রহিম রানা
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:০৬:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
- / ১০৩ বার পঠিত

।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।। বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; এর সরাসরি প্রতিফলন পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়া-কমার এই অস্থিরতার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। কারণ জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশই বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক পরিস্থিতির সামান্য পরিবর্তনও দেশের জ্বালানি বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
যদি বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বৃদ্ধি পায়, তবে তার বহুমাত্রিক প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়বে—এটি সহজেই অনুমেয়। জ্বালানি তেল শুধু পরিবহন বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপাদান নয়; এটি মূলত দেশের উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তি। কৃষি, শিল্প, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য—সবকিছুই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তাই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানে কেবল পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে অস্থিতিশীলতা।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, কৃষি উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়, শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে শেষ পর্যন্ত এর বোঝা গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি, অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধি—এসব প্রবণতা তখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাস্তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যতটা প্রভাব পড়ে, তার চেয়েও বেশি প্রভাব স্থানীয় বাজারে তৈরি করা হয়। এর ফলে কৃষক থেকে শুরু করে দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক—সবাই আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে।
কৃষিখাত বিশেষভাবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্প, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং পরিবহন খরচ—সবকিছুই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, অথচ অনেক সময় সেই অনুপাতে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য তারা পায় না। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শিল্প ও ব্যবসা খাতেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়। কারখানায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকে না। এতে বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থনীতির চাকা তখন ধীরে ধীরে চাপের মধ্যে পড়তে শুরু করে।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। সংকট মোকাবিলায় শুধু বাজারের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। সরকারকে সময়োপযোগী ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে জ্বালানি তেলের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হতে পারে। রেশনিং পদ্ধতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট খাত ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিতভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে অযৌক্তিক ব্যবহার কমবে এবং সংকটকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো সচল রাখা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে কৃষি, গণপরিবহন, খাদ্য পরিবহন এবং জরুরি সেবাখাতে জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খাতগুলো সচল থাকলে দেশের অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকেও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমানো যায়।
রেশনিং ব্যবস্থার পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণেও কঠোরতা প্রয়োজন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। বাজার তদারকি জোরদার করা, মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা—এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না করলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংস্থা, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত বাজার তদারকি, জরিমানা এবং প্রয়োজনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে বাজারে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে।
তবে ইতোমধ্যে সরকার জ্বালানি তেল সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এই উদ্যোগগুলো দেশের জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি, যাতে সম্ভাব্য সংকটের সময়েও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত না হয়।
বিশেষ করে তৃণমূল বা নুকতা পর্যায়ে জ্বালানি তেল বিক্রির বিষয়টি আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পেট্রোল পাম্পের বাইরে কিছু খুচরা বিক্রেতা অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করে বেশি দামে বিক্রি করে থাকে। এতে একদিকে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত দামের চাপে পড়ে। এই অনিয়ম রোধে প্রশাসনকে কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত করার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি ও প্রশাসনিক তৎপরতা। সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সকল পক্ষ যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও দেশের জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশ অতীতে বহু বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করেছে। করোনা মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা কিংবা জ্বালানি বাজারের ওঠানামা—প্রতিটি পরিস্থিতিতেই পরিকল্পিত নীতিনির্ধারণ ও জনসম্পৃক্ত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশ এগিয়ে গেছে। বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে এই সম্ভাব্য সংকটও মোকাবিলা করা সম্ভব।
সুতরাং এখনই প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে রেশনিং ব্যবস্থার মতো বাস্তবমুখী উদ্যোগ। কৃষক, শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষসহ সকল শ্রেণীর মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকবে এবং সম্ভাব্য সংকটের ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে আসবে।
আরও পড়ুন:
জেমস আব্দুর রহিম রানা




















