রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি : ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কুলিক নদীর তীরে প্রায় ১০ একর জায়গাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী রাজা টংকনাথ চৌধুরীর রাজবাড়ি। উপজেলার কেন্দ্র থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার পূর্বে বাচোর ইউনিয়নে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সহজেই ভ্যানযোগে পৌঁছানো যায়। রাজবাড়ির প্রবেশমুখে রয়েছে রাজকীয় সিংহদরজা। ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে মার্বেল পাথরের মেঝে, দৃষ্টিনন্দন কারুকাজখচিত দেয়াল, পূর্ব পাশে অন্দরমহল, পশ্চিমে আরেকটি সিংহদরজা এবং অপর প্রান্তে জোড়া দীঘি। সময়ের নির্মম আঘাতে ভবনটির অনেক অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও এর স্থাপত্যশৈলী আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রাজা টংকনাথের পিতা বুদ্ধিনাথ চৌধুরী রাজবাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেন রাজা টংকনাথ। সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সম্মাননা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে দিনাজপুরের মহারাজার কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি অর্জন করেন। তাঁর স্ত্রীর নামানুসারেই ‘মালদুয়ার স্টেট’-এর নতুন নামকরণ হয় রাণীশংকৈল। দেশভাগের সময় তিনি ভারতে চলে গেলে জমিদারি পরম্পরারও অবসান ঘটে। রাজবাড়ি থেকে প্রায় ২০০ মিটার দক্ষিণে কুলিক নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক জয়কালী মন্দির, যা রাজবাড়ির চেয়েও প্রাচীন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমানে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় এটি সংস্কার করে পূজার্চনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৯ সালে রাজবাড়িটি সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হয়। ২০২৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পরিদর্শনের পর সংস্কারের আশ্বাস দেন। প্রথম ধাপে প্রায় ১০ লাখ টাকার সংস্কারকাজ শুরু হলেও অজ্ঞাত কারণে পরবর্তীতে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভবনটির বিভিন্ন অংশ ধীরে ধীরে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ। ২০২৫ সালে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-এর চিত্রায়ণের পর স্থানটির পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পায়। এছাড়া স্থানীয় আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান শুভ হাইকোর্টে রিটের মাধ্যমে রাজবাড়িটির সংরক্ষণের বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরে আনেন। স্থানীয়দের দাবি, রাজবাড়ি ও জয়কালী মন্দিরকে ঘিরে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার ও পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলা হলে এটি শুধু রাণীশংকৈল নয়, পুরো ঠাকুরগাঁও জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। শতবর্ষী এই স্থাপনাটি সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।
রংপুর আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, “রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি সংস্কারের জন্য আমাদের দপ্তর থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও সিদ্ধান্তের পরই সংস্কারকাজ শুরুর সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।”

নাগরিক ডেস্ক রিপোর্ট 





















