
এম.জে.এ মামুন:
কুমিল্লার দেবিদ্বারে ধারালো অস্ত্রের হামলায় মা ও আট মাস বয়সী ভাতিজি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের সদস্য ইমন (২৫) নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন ইমনের ভাবি রাবেয়া বেগম (৩৫)।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর ইউনিয়নের বড়শালঘর গ্রামের দক্ষিণপাড়ার মোস্তফা মাস্টারের বাড়িতে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, ওই বাড়ির মৃত ফরিদ মিয়ার স্ত্রী পেয়ারা বেগম (৬৫) এবং তাঁর আট মাস বয়সী নাতনি ইসরাত জাহান। আহত রাবেয়া বেগমকে প্রথমে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আটক ইমন মৃত ফরিদ মিয়া ও পেয়ারা বেগমের ছেলে। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ইমন দীর্ঘদিন ধরে পায়ের সমস্যায় ভুগছিলেন। গত ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁর পায়ে সর্বশেষ অস্ত্রোপচার করা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকেই তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা কাজী হাবিব বলেন, ছোটবেলা থেকেই ইমনকে তাঁরা চেনেন। তিনি স্বাভাবিক ও মিশুক স্বভাবের ছিলেন। দুই বছর আগে ফুটবল খেলতে গিয়ে তাঁর পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। এরপর কয়েক দফা অস্ত্রোপচার হয়।
কাজী হাবিবের ভাষ্য, সর্বশেষ অস্ত্রোপচারের পর বাড়িতে ফিরে ইমন এলোমেলো কথা বলছিলেন। সোমবার সকালে তিনি পরিবারের সদস্যদের বলেন, ‘তোমরা আমাকে মেরে ফেলো।’ এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তিনি ঘর থেকে দা নিয়ে মায়ের ওপর হামলা চালান বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন তিনি।
এরপর চিৎকার শুনে রাবেয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁর কোলে থাকা শিশুটির ওপরও ইমন হামলা করেন বলে স্থানীয়রা জানান। পরে রাবেয়া বেগমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জানান, পায়ের প্রচণ্ড ব্যথার কারণে ইমন গত রাতেও কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। তবে এসব তথ্যের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
ঘটনার পর স্থানীয়রা ইমনকে আটক করে একটি ঘরে তালাবদ্ধ করে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে হেফাজতে নেয়।
স্থানীয়দের সামনে ইমন নিজের বক্তব্যে বলেন, পায়ের অসহ্য ব্যথায় তিনি অস্থির ছিলেন। তাঁর পায়ে কয়েকবার অস্ত্রোপচার হলেও ব্যথা কমেনি। তিনি পরিবারের সদস্যদের নিজের পা কেটে দিতে অথবা তাঁকে মেরে ফেলতে বলেছিলেন বলে দাবি করেন।
ইমনের ভাষ্য, এরপর কী ঘটেছে, তা তিনি ঠিকভাবে বলতে পারছেন না। তিনি বারবার বলেন, ‘আমার মাথা ঠিক নাই।’
তবে তাঁর এই বক্তব্যের সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ইমন দীর্ঘদিন ধরে পায়ের সমস্যায় ভুগছিলেন এবং ব্যথায় প্রায়ই ছটফট করতেন। তিনি মাঝেমধ্যে নিজের কষ্টের কথা বলতেন এবং মৃত্যুর কথা বলতেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নিহত পেয়ারা বেগমের ভাই ফারুক মেম্বার বলেন, খবর পেয়ে পাশের ইউসুফপুর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রাম থেকে ছুটে এসে তিনি তাঁর বোনের মরদেহ দেখতে পান। এমন দৃশ্য দেখে তিনি কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।
অন্যদিকে প্রতিবেশী সোহাগ মিয়া বলেন, হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি ইমনকে চেনেন। একসঙ্গে খেলাধুলা ও আড্ডা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ইমনকে সবসময় হাসিখুশি ও মিশুক হিসেবেই দেখেছেন। তাই এমন ভয়াবহ ঘটনায় তিনি হতবাক।
দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসআই বাঁধনসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পুলিশ গিয়ে ইমনকে আটক করে। পরে তিনিও ঘটনাস্থলে যান।
ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে ইমন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন এবং পায়ের ব্যথায় ভুগছিলেন। তিনি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন এবং পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বাধা দেওয়ায় তাদের ওপর হামলা চালানোর কথা ইমন নিজেই জানিয়েছেন। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ শেষ হয়েছে। সিআইডির ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থলের প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা শেষ করার পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে মা পেয়ারা বেগম ও শিশু ইসরাত জাহানের মরদেহ পাওয়া গেছে।
ভয়াবহ এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সকাল থেকেই দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর গ্রামের ওই বাড়িতে ভিড় করেন আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। মা ও নিষ্পাপ শিশুকে হারিয়ে পরিবারটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পুরো গ্রামজুড়ে বিরাজ করছে শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ।

নাগরিক ডেস্ক রিপোর্ট 



















