মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি: পিরোজপুরের প্রথম শ্রেণির মঠবাড়িয়া পৌরসভায় নাগরিকদের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত পানি সরবরাহ প্রকল্প নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন পৌরবাসী। অনিয়মিত পানি সরবরাহ, বিভিন্ন স্থানে পাইপ ফেটে যাওয়া এবং কোথাও কোথাও দুর্গন্ধ ও কর্দমাক্ত পানি সরবরাহের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
পৌরবাসীর অভিযোগ, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়মিত ও নিরাপদ পানি দিতে পারছে না। ফলে কখন পানি আসবে, সেই অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের। আবার পানি এলেও অনেক সময় তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এতে প্রকল্পের কাজের মান, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সিটি করপোরেশন অ্যান্ড পৌরসভা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট (সিটি.ই.আই.পি.)-এর আওতায় ৫৩ কোটি ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৮৬ টাকা ব্যয়ে পানি সরবরাহ প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় পৌর শহরে প্রায় ৫৪ কিলোমিটার পানির পাইপলাইন স্থাপন করা হয়।
প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করে সিনোকোনোস্ট-এমটি অ্যান্ড এসএস কনসোর্টিয়াম নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পাইপলাইনের মাধ্যমে পৌর এলাকার বাসাবাড়িতে সুপেয় পানি সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থায়ী সমাধান না আসায় এখন প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০১৪ সালে প্রকল্পের কাজ শুরুর সময় থেকেই নির্মাণকাজে নিম্নমানের পাইপ, লোহা, পাথর ও সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। পাম্প হাউজ, বেজ ঢালাইসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণেও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, সে সময় বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করা হলেও তৎকালীন পৌর কর্তৃপক্ষ যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। বরং অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রকল্পের নকশা, কার্যাদেশ, নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষার প্রতিবেদন, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
বিভিন্ন স্থানে পাইপ ফেটে ভোগান্তি
পৌরবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে পানির পাইপ ফেটে পানি বের হতে শুরু করে। বর্তমানে পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইনের লিকেজ ও ফাটলের কারণে পানি অপচয়ের পাশাপাশি সড়ক ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতারও সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে পানি সরবরাহের সময় নিয়েও রয়েছে ভোগান্তি। নির্ধারিত সময়ে পানি না আসায় গ্রাহকদের দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় পানির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার পানি এলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্গন্ধ ও কর্দমাক্ত পানির অভিযোগ রয়েছে।
পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের গৃহিণী মাহমুদা আক্তার বলেন, “সময়মতো আমরা পানি পাই না। যে কারণে বাসাবাড়ির কাজ করতে সমস্যা হয়। পানির জন্য অপেক্ষা করতে হয় কখন পানি আসবে। বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে গেলে এসে আর পানি পাওয়া যায় না। আমরা খুব সমস্যার মধ্যে আছি।”
তার মতো অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, পানি সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঠিকভাবে অনুসরণ না হওয়ায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ
নিউমার্কেট এলাকার বাসিন্দা আবির জামান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে পৌরসভার পানি প্রকল্প নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জনগুরুত্বপূর্ণ এ খাতে বরাদ্দের অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হলে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি অভিযোগের তদন্ত দাবি করেন।
তার বক্তব্যের মূল সুর—কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি পৌরবাসী নিয়মিত ও নিরাপদ পানি না পান, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের যথাযথ ব্যবহার, কাজের মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান কাওসার বলেন, প্রকল্পটি প্রায় পাঁচ বছর আগে শেষ হয়েছে এবং তিনি পরে পৌরসভায় যোগ দিয়েছেন। বিভিন্ন স্থান থেকে পানির লাইনের পাইপ ফেটে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। নিম্নমানের পাইপগুলো মেরামতের চেষ্টা করা হচ্ছে।
পানি সরবরাহের অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, লো-ভোল্টেজের কারণে সবসময় সঠিক সময়ে পানি উত্তোলন করা সম্ভব হয় না। এ কারণে পৌরবাসীকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা অমল কৃষ্ণ সাহা বলেন, বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে গ্রাহকেরা সময়মতো পানি পাচ্ছেন না। পাশাপাশি পূর্বে নিম্নমানের কাজ হওয়ার কারণে বিভিন্ন সময়ে পাইপ ফেটে যাচ্ছে এবং সেগুলো সংস্কার করতে হচ্ছে।
প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রায় ৫৩ কোটি টাকার মতো বড় একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুফল যদি প্রত্যাশিতভাবে জনগণের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে শুধু সংস্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজের মান, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, তৎকালীন পৌর কর্তৃপক্ষের তদারকি এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কারিগরি সক্ষমতা ও পাইপলাইনের অবস্থা পরীক্ষা করাও প্রয়োজন।
পৌরবাসীর দাবি, প্রকল্পে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে লিকেজ ও নিম্নমানের পাইপের স্থায়ী সমাধান, নির্ধারিত সময়ে পানি সরবরাহ এবং নিরাপদ ও দুর্গন্ধমুক্ত পানি নিশ্চিত করতে হবে।
কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প যদি নাগরিকদের নিয়মিত ও নিরাপদ পানি দিতে না পারে, তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার মঠবাড়িয়া পৌরবাসীর রয়েছে।

মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি 


















