মফিজুল ইসলাম, নীলফামারী: নীলফামারীতে মাদক সেবনের অভিযোগে এক নারী ও এক পুরুষকে আটকের পর পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের থানায় না নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের জিম্মায় রেখে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর পরদিন ওই পুরুষের মোটরসাইকেল ও নগদ টাকা নেওয়া এবং পরে তাদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে পুরো ঘটনা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন। ঘটনাটির একটি ভিডিওচিত্র, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে পুলিশের ভূমিকা ও স্থানীয় কয়েকজনের কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে।
‘যমুনা সংবাদ’ এর অনুসন্ধানী টিমের কাছে পাওয়া ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, নীলফামারী পৌরসভার বাড়াইপাড়া এলাকার একটি পাকা ঘরের ভেতরে একজন নারী, কয়েকজন পুরুষ ও পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। সেখানে আটক নারী-পুরুষকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ভিডিওতে আটক ব্যক্তি নিজেকে আফতাবুজ্জামান বিপ্লব পরিচয় দিয়ে বলেন, তারা খেলা দেখতে এসেছেন এবং ইয়াবা সেবন করেছেন। ওই নারীও মাদকদ্রব্য সেবনের কথা বলতে শোনা যায়। দুজন নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেও নারীটি স্বামীর বাড়ির সঠিক ঠিকানা ও শাশুড়ির নাম বলতে না পারায় উপস্থিতদের মধ্যে তাদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
ভিডিওতে মোস্তাক আহমেদ নামে একজন নিজেকে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে তাদের আইনের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেন। অন্যদিকে জহুরুল ইসলাম, পিতা মৃত রহিম বক্স, বাড়াইপাড়া, নীলফামারী পৌরসভা—আটক দুজনকে সকাল পর্যন্ত নিজেদের জিম্মায় রাখার কথা বলেন।
ভিডিওতে নীলফামারী থানার এসআই মো. মিজানুর রহমানকে স্থানীয়দের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা আটক দুজনকে রাখবেন কি না। জবাবে জহুরুল তাদের রাখার কথা বলেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দায়দায়িত্ব তাদের নিতে হবে—পুলিশ কর্মকর্তার এমন সতর্কতার জবাবে জহুরুলও দায়দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেন।
ঘটনাস্থলের বাড়ির মালিক তাওহীদ সুমন জানান, তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকেন। তার দাবি, রাত আনুমানিক একটা থেকে দেড়টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও বিপ্লব ও ওই নারীকে থানায় না নিয়ে যারা তাদের আটক করেছিল, তাদের জিম্মায় রেখে চলে যায়। পরে জহুরুল ও তার লোকজন তার স্ত্রী-সন্তানসহ ওই নারী ও বিপ্লবকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যায় বলেও দাবি করেন তিনি।
আটক নারীর পরিচয় যাচাই করেছে অনুসন্ধানী টিম। তার ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী নাম রাবিয়া বিনা, পিতা ফুলচান শেখ। তিনি দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী পৌরসভার পূর্ব রামচন্দ্রপুর এলাকার বাসিন্দা। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে তার নাম, পিতার নাম ও ঠিকানার মিল পাওয়া গেছে।
ঘটনার পরের অংশ নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। তাওহীদ সুমনের স্ত্রী মোছা. রুবি ইসলাম অভিযোগ করেন, জহুরুল ও তার লোকজন বিপ্লবের মোটরসাইকেলটি বিক্রি করে দেন। তার দাবি, আফতাবুজ্জামান বিপ্লবের বাড়ি থেকে তার ভাইয়ের মাধ্যমে মোটরসাইকেলের কাগজপত্র ও নগদ টাকা আনা হয়। পরে মোটরসাইকেলটি নীলফামারী পৌরসভার মানিকের মোড় এলাকার এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর ছেলে মোহাম্মদ মুসার কাছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।
তবে মোটরসাইকেলটির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ও অর্থ লেনদেনের কোনো লিখিত দলিল বা রসিদ অনুসন্ধানী টিম স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
অভিযোগের বিষয়ে জহুরুল ইসলাম দাবি করেন, বিপ্লব নিজেই স্বেচ্ছায় মোটরসাইকেল বিক্রি করেছেন এবং এ সংক্রান্ত ভিডিও তার কাছে রয়েছে।
বিপ্লবের স্ত্রী মিরা শারমিন মৌরি জানান, ঘটনার পর বিপ্লব তাকে ফোন করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একটি শিশু মারা যাওয়ার কথা বলেন এবং চিকিৎসার জন্য মোটরসাইকেল বিক্রি করা হয়েছে বলে জানান। বিপ্লবের ভাই বকুল মুহুরী বলেন, বিপ্লবের কথামতো তিনি মোটরসাইকেলের কাগজপত্র ও নগদ ৬০ হাজার টাকা নিয়ে যান। পরে জহুরুলের লোকজন টাকা ও কাগজপত্র নিয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
আফতাবুজ্জামান বিপ্লবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দেন। ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি ৫০টা বিয়ে করি, আপনার তাতে কী?” মোটরসাইকেল বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন করলে জহুরুলকে ফোনে এনে কথা বলিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এদিকে ভিডিওতে উপস্থিত এসআই মো. মিজানুর রহমান বলেন, স্থানীয়রা আটক দুজনকে রেখে যাওয়ার অনুরোধ করছিলেন এবং বিপ্লব ও নারীটি পুলিশের সঙ্গে যেতে রাজি ছিলেন না। এ কারণে তাদের সেখানে রেখে আসা হয়। তবে ভিডিওতে তাদের মাদক সেবনের কথা স্বীকার করতে শোনা যাওয়ার পরও কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এ প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি।
অনুসন্ধানে জহুরুল ইসলামকে ঘিরে আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি একাধিক বিয়ে করেছেন এবং অতীতে একটি চাঁদাবাজির মামলায় কারাভোগ করেছেন। এর আগে তিনি নীলফামারীর বাংলা মদের দোকানের ম্যানেজার হিসেবেও কাজ করেছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে নীলফামারী কেন্দ্রীয় শ্মশানের পাশে তার ভাঙারি ব্যবসা রয়েছে। তবে এসব তথ্যের মধ্যে মামলা ও কারাভোগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথির মাধ্যমে আরও যাচাই করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মো. আফতাবুজ্জামান বিপ্লব নীলফামারী জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য এবং পেশায় আইনজীবী। তার বাড়ি সৈয়দপুর থানাধীন ঢেলাপির পুলপাড়া এলাকায়।
ঘটনার বিষয়ে নীলফামারীর পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ হোসেন খাঁন-এর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “প্রথম ঘটনায় পুলিশ নিয়ে আসলে আর দ্বিতীয় ঘটনাটি হতো না। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুলিশ সুপারের বক্তব্যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
মূল প্রশ্ন—মাদক সেবনের অভিযোগে আটক দুজনকে পুলিশ থানায় না নিয়ে স্থানীয়দের জিম্মায় কেন দিল? এরপর কীভাবে বিপ্লবের মোটরসাইকেল ও নগদ টাকা অন্যদের হাতে গেল? এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও স্থানীয়দের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন প্রয়োজন। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের ভিডিওচিত্র ও স্থানীয়দের বক্তব্যও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

মফিজুল ইসলাম, নীলফামারী 


















