ঢাকা , রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220
জুলে রিমে বনাম ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির ঐতিহাসিক রূপান্তর ও আধুনিক ফুটবল সাম্রাজ্যে

বিশ্বকাপের দুই স্বর্ণমুকুট

ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি বিশ্বসভ্যতার অন্যতম প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক অংশ। ভাষা, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা অতিক্রম করে যে কয়েকটি বিষয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে একত্রিত করতে পারে, ফুটবল তার অন্যতম। প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ সেই বৈশ্বিক ঐক্যের সর্বোচ্চ প্রতীক।
কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস কেবল মাঠের লড়াই, কিংবদন্তি খেলোয়াড় কিংবা অবিস্মরণীয় গোলের ইতিহাস নয়; এটি এমন এক প্রতীকী উত্তরাধিকারের ইতিহাস, যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি ট্রফি। এই ট্রফি বিজয়ীর হাতে কয়েক মুহূর্তের জন্য উঠলেও তার সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বমানবতার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুটি ট্রফি বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রথমটি জুলে রিমে ট্রফি, যা ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের গৌরবের প্রতীক ছিল। দ্বিতীয়টি বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি, যা ১৯৭৪ সাল থেকে আধুনিক ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই দুই ট্রফি কেবল নকশাগত বা শিল্পরীতির দিক থেকে আলাদা নয়; তারা দুই ভিন্ন যুগের ফুটবল দর্শন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং ক্রীড়া সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে।
জুলে রিমে ট্রফির ইতিহাস শুরু হয় ফুটবলকে একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় রূপ দেওয়ার স্বপ্ন থেকে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক ফুটবল জনপ্রিয় হলেও অলিম্পিকের বাইরে স্বাধীন বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এই পরিস্থিতিতে ফিফার সভাপতি জুলে রিমে একটি আন্তর্জাতিক বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, অর্থনৈতিক সংকট এবং ইউরোপীয় ফুটবল প্রশাসনের দ্বিধা অতিক্রম করে ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপের জন্য নির্মিত হয় একটি বিশেষ ট্রফি, যা প্রথমে “ভিক্টরি” নামে পরিচিত ছিল। পরে জুলে রিমের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৬ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “জুলে রিমে ট্রফি”।
ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্ল্যুর এই ট্রফির নকশা তৈরি করেন। এতে প্রাচীন গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইককে দুই হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দেবীর হাতে একটি অলংকৃত পাত্র, যা বিজয় ও সম্মানের প্রতীক। ট্রফিটি স্বর্ণের তৈরি হলেও সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ স্বর্ণ ছিল না; সোনার আবরণযুক্ত রৌপ্য নির্মাণের ওপর শিল্পসম্মত অলংকরণ করা হয়েছিল। উচ্চতা ছিল প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ছিল প্রায় ৩.৮ কিলোগ্রাম। ছোট আকারের হলেও এর প্রতীকী মূল্য ছিল অপরিসীম। এটি ছিল এমন এক যুগের প্রতীক, যখন ফুটবল বিশ্বায়নের পথে যাত্রা শুরু করছিল।
প্রথম বিশ্বকাপের পর থেকেই জুলে রিমে ট্রফি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন মর্যাদা লাভ করে। উরুগুয়ে, ইতালি এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের সাফল্যের সাথে ট্রফিটি বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে। কিন্তু এর ইতিহাস কখনোই নিরবচ্ছিন্ন ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ট্রফির নিরাপত্তা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে। নাৎসি বাহিনীর দখলদারিত্বের সময় ট্রফিটি রোমের একটি ব্যাংকে সংরক্ষিত ছিল।
ইতালীয় ফুটবল কর্মকর্তা অত্তোরিনো বারাসি আশঙ্কা করেন যে যুদ্ধের সময় এটি জার্মানদের হাতে চলে যেতে পারে। তাই তিনি গোপনে ট্রফিটি ব্যাংক থেকে বের করে নিজের বাড়ির একটি সাধারণ জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখেন। যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ট্রফিটি নিরাপদে ছিল। ইতিহাসে এটি ক্রীড়াসামগ্রী রক্ষার অন্যতম সাহসী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুদ্ধোত্তর বিশ্বে ফুটবল নতুন উদ্দীপনায় ফিরে আসে। বিশ্বকাপ আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ, ১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানির বিস্ময়কর সাফল্য, ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিলের উত্থান এবং ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের প্রথম শিরোপা অর্জনের মধ্য দিয়ে জুলে রিমে ট্রফি এক নতুন কিংবদন্তির মর্যাদা লাভ করে।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের আগে এই ট্রফিকে ঘিরে ঘটে ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলে একটি প্রদর্শনী চলাকালে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। গোটা ব্রিটেনে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েও সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত “পিকলস” নামের একটি পোষা কুকুর লন্ডনের একটি বাড়ির বাগানে মোড়ানো অবস্থায় ট্রফিটি খুঁজে পায়। এই ঘটনাটি শুধু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম নয়, বিশ্বজুড়েই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এমনকি কুকুরটিও জাতীয় বীরের মর্যাদা লাভ করে।
১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে ফিফার পূর্বঘোষিত নিয়ম অনুযায়ী জুলে রিমে ট্রফির স্থায়ী মালিকানা অর্জন করে। পেলে, জাইরজিনহো, তোস্তাও, কার্লোস আলবার্তোদের অসাধারণ ফুটবল কেবল একটি বিশ্বকাপ জয়ই এনে দেয়নি; তারা ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ট্রফিটির স্থায়ী আবাসও নির্ধারণ করে দেয়। এরপর ফিফাকে নতুন একটি বিশ্বকাপ ট্রফি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তবে জুলে রিমে ট্রফির ইতিহাস এখানেই শেষ হয়নি। ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে এটি আবার চুরি হয়ে যায়। এবার আর সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ গবেষকের ধারণা, ট্রফিটি গলিয়ে ফেলা হয়েছিল। ফলে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি আজ কার্যত হারিয়ে গেছে। বর্তমানে জাদুঘরে যে ট্রফি প্রদর্শিত হয়, তা মূল ট্রফির একটি অনুমোদিত প্রতিরূপ।
নতুন ট্রফি নির্মাণের জন্য ফিফা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা শতাধিক নকশা জমা দেন। শেষ পর্যন্ত ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার নকশা নির্বাচিত হয়। তাঁর নকশায় দুইজন শক্তিশালী মানবাকৃতি পৃথিবীকে মাথার ওপরে তুলে ধরেছে। এতে মানব প্রচেষ্টা, বৈশ্বিক ঐক্য এবং খেলাধুলার সর্বজনীন চেতনা একই সাথে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো এই নতুন ট্রফি প্রদান করা হয়।
বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৬.১৭৫ কিলোগ্রাম। এটি ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত এবং এর নিচের অংশে দুটি সবুজ ম্যালাকাইট পাথরের বৃত্ত রয়েছে। নান্দনিকতা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সমন্বয়ে এটি আধুনিক ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। ট্রফিটির গায়ে বিজয়ী দেশগুলোর নাম খোদাই করা হয় নিচের অংশে, যাতে ভবিষ্যতেও নতুন বিজয়ীদের নাম যুক্ত করা সম্ভব হয়।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশ স্থায়ীভাবে এই ট্রফির মালিক হতে পারে না। বিজয়ী দল আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপনের পর আসল ট্রফি ফিফার কাছে ফেরত দেয় এবং পরবর্তীতে স্বর্ণের পরিবর্তে স্বর্ণমণ্ডিত একটি প্রতিরূপ ট্রফি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য পায়। এই ব্যবস্থা গ্রহণের অন্যতম কারণ হলো জুলে রিমে ট্রফির হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক পরিবহন প্রোটোকল এবং বিশেষ সংরক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্তমান ট্রফিকে সর্বোচ্চ সুরক্ষায় রাখা হয়।
দুটি ট্রফির শিল্পরীতিতেও সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। জুলে রিমে ট্রফিতে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার পৌরাণিক প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে, যা ইউরোপীয় শাস্ত্রীয় শিল্পধারার প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে বর্তমান ট্রফিতে মানবজাতির সম্মিলিত শক্তি, বৈশ্বিক সংহতি এবং আধুনিক ক্রীড়া দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে। প্রথম ট্রফি বিজয়ের দেবীকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও দ্বিতীয় ট্রফিতে মানুষের অর্জনকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফুটবলের অর্থনৈতিক বিবর্তনের সাথেও এই পরিবর্তনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জুলে রিমে ট্রফির যুগে বিশ্বকাপ ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত আয়োজনের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। কিন্তু বর্তমান ট্রফির যুগে বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর অন্যতম। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বৈশ্বিক বিপণনের ফলে বিশ্বকাপ আজ বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও বর্তমান ট্রফিকে দেখা যায়।
একই সাথে ট্রফি দুটি ফুটবলের সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে ধারণ করে। জুলে রিমে ট্রফি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফুটবলের শৈশব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সূচনা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে শান্তির আকাঙ্ক্ষার কথা। অন্যদিকে বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি প্রতিনিধিত্ব করে প্রযুক্তিনির্ভর, বিশ্বায়িত এবং বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধ আধুনিক ফুটবলকে। একটি অতীতের ঐতিহ্য, অন্যটি বর্তমানের বিশ্বমঞ্চ।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে জুলে রিমে ট্রফি এবং বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং তারা একই ধারাবাহিকতার দুই অনন্য অধ্যায়। প্রথমটি বিশ্বকাপের জন্ম ও বিকাশের প্রতীক, দ্বিতীয়টি তার পরিপক্বতা ও বৈশ্বিক আধিপত্যের প্রতীক। ফুটবলের প্রতিটি যুগ তার নিজস্ব ভাষায় বিজয়ের সংজ্ঞা লিখেছে, আর সেই ইতিহাসের দৃশ্যমান রূপ হয়ে উঠেছে এই দুই স্বর্ণমুকুট। তাই বিশ্বকাপের ট্রফির ইতিহাস কেবল একটি পুরস্কারের ইতিহাস নয়; এটি মানবস্বপ্ন, প্রতিযোগিতা, ঐক্য, শিল্প, সংস্কৃতি এবং বিশ্ব ফুটবলের অবিনাশী উত্তরাধিকারের ইতিহাস।
ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Share this news as a Photo Card

সম্পর্কিত খবর :

দুপচাঁচিয়ায় বিয়ে বাড়ি থেকে R15M চুরি যাওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার, আটক-২

26 July 2026

নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকা থেকে মতি নামের এক ব্যক্তির অর্ধ গলিত লাশ উদ্ধার! 

বিস্তারিত পড়তে কমেন্টে লিংক ... |
nagorikbhabna.com

জুলে রিমে বনাম ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির ঐতিহাসিক রূপান্তর ও আধুনিক ফুটবল সাম্রাজ্যে

বিশ্বকাপের দুই স্বর্ণমুকুট

সর্বশেষ পরিমার্জন : ১১:২৬:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি বিশ্বসভ্যতার অন্যতম প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক অংশ। ভাষা, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা অতিক্রম করে যে কয়েকটি বিষয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে একত্রিত করতে পারে, ফুটবল তার অন্যতম। প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ সেই বৈশ্বিক ঐক্যের সর্বোচ্চ প্রতীক।
কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস কেবল মাঠের লড়াই, কিংবদন্তি খেলোয়াড় কিংবা অবিস্মরণীয় গোলের ইতিহাস নয়; এটি এমন এক প্রতীকী উত্তরাধিকারের ইতিহাস, যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি ট্রফি। এই ট্রফি বিজয়ীর হাতে কয়েক মুহূর্তের জন্য উঠলেও তার সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বমানবতার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুটি ট্রফি বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রথমটি জুলে রিমে ট্রফি, যা ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের গৌরবের প্রতীক ছিল। দ্বিতীয়টি বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি, যা ১৯৭৪ সাল থেকে আধুনিক ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই দুই ট্রফি কেবল নকশাগত বা শিল্পরীতির দিক থেকে আলাদা নয়; তারা দুই ভিন্ন যুগের ফুটবল দর্শন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং ক্রীড়া সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে।
জুলে রিমে ট্রফির ইতিহাস শুরু হয় ফুটবলকে একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় রূপ দেওয়ার স্বপ্ন থেকে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক ফুটবল জনপ্রিয় হলেও অলিম্পিকের বাইরে স্বাধীন বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এই পরিস্থিতিতে ফিফার সভাপতি জুলে রিমে একটি আন্তর্জাতিক বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, অর্থনৈতিক সংকট এবং ইউরোপীয় ফুটবল প্রশাসনের দ্বিধা অতিক্রম করে ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপের জন্য নির্মিত হয় একটি বিশেষ ট্রফি, যা প্রথমে “ভিক্টরি” নামে পরিচিত ছিল। পরে জুলে রিমের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৬ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “জুলে রিমে ট্রফি”।
ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্ল্যুর এই ট্রফির নকশা তৈরি করেন। এতে প্রাচীন গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইককে দুই হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দেবীর হাতে একটি অলংকৃত পাত্র, যা বিজয় ও সম্মানের প্রতীক। ট্রফিটি স্বর্ণের তৈরি হলেও সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ স্বর্ণ ছিল না; সোনার আবরণযুক্ত রৌপ্য নির্মাণের ওপর শিল্পসম্মত অলংকরণ করা হয়েছিল। উচ্চতা ছিল প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ছিল প্রায় ৩.৮ কিলোগ্রাম। ছোট আকারের হলেও এর প্রতীকী মূল্য ছিল অপরিসীম। এটি ছিল এমন এক যুগের প্রতীক, যখন ফুটবল বিশ্বায়নের পথে যাত্রা শুরু করছিল।
প্রথম বিশ্বকাপের পর থেকেই জুলে রিমে ট্রফি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন মর্যাদা লাভ করে। উরুগুয়ে, ইতালি এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের সাফল্যের সাথে ট্রফিটি বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে। কিন্তু এর ইতিহাস কখনোই নিরবচ্ছিন্ন ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ট্রফির নিরাপত্তা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে। নাৎসি বাহিনীর দখলদারিত্বের সময় ট্রফিটি রোমের একটি ব্যাংকে সংরক্ষিত ছিল।
ইতালীয় ফুটবল কর্মকর্তা অত্তোরিনো বারাসি আশঙ্কা করেন যে যুদ্ধের সময় এটি জার্মানদের হাতে চলে যেতে পারে। তাই তিনি গোপনে ট্রফিটি ব্যাংক থেকে বের করে নিজের বাড়ির একটি সাধারণ জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখেন। যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ট্রফিটি নিরাপদে ছিল। ইতিহাসে এটি ক্রীড়াসামগ্রী রক্ষার অন্যতম সাহসী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুদ্ধোত্তর বিশ্বে ফুটবল নতুন উদ্দীপনায় ফিরে আসে। বিশ্বকাপ আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ, ১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানির বিস্ময়কর সাফল্য, ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিলের উত্থান এবং ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের প্রথম শিরোপা অর্জনের মধ্য দিয়ে জুলে রিমে ট্রফি এক নতুন কিংবদন্তির মর্যাদা লাভ করে।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের আগে এই ট্রফিকে ঘিরে ঘটে ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলে একটি প্রদর্শনী চলাকালে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। গোটা ব্রিটেনে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েও সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত “পিকলস” নামের একটি পোষা কুকুর লন্ডনের একটি বাড়ির বাগানে মোড়ানো অবস্থায় ট্রফিটি খুঁজে পায়। এই ঘটনাটি শুধু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম নয়, বিশ্বজুড়েই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এমনকি কুকুরটিও জাতীয় বীরের মর্যাদা লাভ করে।
১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে ফিফার পূর্বঘোষিত নিয়ম অনুযায়ী জুলে রিমে ট্রফির স্থায়ী মালিকানা অর্জন করে। পেলে, জাইরজিনহো, তোস্তাও, কার্লোস আলবার্তোদের অসাধারণ ফুটবল কেবল একটি বিশ্বকাপ জয়ই এনে দেয়নি; তারা ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ট্রফিটির স্থায়ী আবাসও নির্ধারণ করে দেয়। এরপর ফিফাকে নতুন একটি বিশ্বকাপ ট্রফি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তবে জুলে রিমে ট্রফির ইতিহাস এখানেই শেষ হয়নি। ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে এটি আবার চুরি হয়ে যায়। এবার আর সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ গবেষকের ধারণা, ট্রফিটি গলিয়ে ফেলা হয়েছিল। ফলে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি আজ কার্যত হারিয়ে গেছে। বর্তমানে জাদুঘরে যে ট্রফি প্রদর্শিত হয়, তা মূল ট্রফির একটি অনুমোদিত প্রতিরূপ।
নতুন ট্রফি নির্মাণের জন্য ফিফা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা শতাধিক নকশা জমা দেন। শেষ পর্যন্ত ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার নকশা নির্বাচিত হয়। তাঁর নকশায় দুইজন শক্তিশালী মানবাকৃতি পৃথিবীকে মাথার ওপরে তুলে ধরেছে। এতে মানব প্রচেষ্টা, বৈশ্বিক ঐক্য এবং খেলাধুলার সর্বজনীন চেতনা একই সাথে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো এই নতুন ট্রফি প্রদান করা হয়।
বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৬.১৭৫ কিলোগ্রাম। এটি ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত এবং এর নিচের অংশে দুটি সবুজ ম্যালাকাইট পাথরের বৃত্ত রয়েছে। নান্দনিকতা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সমন্বয়ে এটি আধুনিক ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। ট্রফিটির গায়ে বিজয়ী দেশগুলোর নাম খোদাই করা হয় নিচের অংশে, যাতে ভবিষ্যতেও নতুন বিজয়ীদের নাম যুক্ত করা সম্ভব হয়।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশ স্থায়ীভাবে এই ট্রফির মালিক হতে পারে না। বিজয়ী দল আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপনের পর আসল ট্রফি ফিফার কাছে ফেরত দেয় এবং পরবর্তীতে স্বর্ণের পরিবর্তে স্বর্ণমণ্ডিত একটি প্রতিরূপ ট্রফি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য পায়। এই ব্যবস্থা গ্রহণের অন্যতম কারণ হলো জুলে রিমে ট্রফির হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক পরিবহন প্রোটোকল এবং বিশেষ সংরক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্তমান ট্রফিকে সর্বোচ্চ সুরক্ষায় রাখা হয়।
দুটি ট্রফির শিল্পরীতিতেও সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। জুলে রিমে ট্রফিতে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার পৌরাণিক প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে, যা ইউরোপীয় শাস্ত্রীয় শিল্পধারার প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে বর্তমান ট্রফিতে মানবজাতির সম্মিলিত শক্তি, বৈশ্বিক সংহতি এবং আধুনিক ক্রীড়া দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে। প্রথম ট্রফি বিজয়ের দেবীকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও দ্বিতীয় ট্রফিতে মানুষের অর্জনকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফুটবলের অর্থনৈতিক বিবর্তনের সাথেও এই পরিবর্তনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জুলে রিমে ট্রফির যুগে বিশ্বকাপ ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত আয়োজনের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। কিন্তু বর্তমান ট্রফির যুগে বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর অন্যতম। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বৈশ্বিক বিপণনের ফলে বিশ্বকাপ আজ বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও বর্তমান ট্রফিকে দেখা যায়।
একই সাথে ট্রফি দুটি ফুটবলের সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে ধারণ করে। জুলে রিমে ট্রফি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফুটবলের শৈশব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সূচনা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে শান্তির আকাঙ্ক্ষার কথা। অন্যদিকে বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি প্রতিনিধিত্ব করে প্রযুক্তিনির্ভর, বিশ্বায়িত এবং বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধ আধুনিক ফুটবলকে। একটি অতীতের ঐতিহ্য, অন্যটি বর্তমানের বিশ্বমঞ্চ।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে জুলে রিমে ট্রফি এবং বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং তারা একই ধারাবাহিকতার দুই অনন্য অধ্যায়। প্রথমটি বিশ্বকাপের জন্ম ও বিকাশের প্রতীক, দ্বিতীয়টি তার পরিপক্বতা ও বৈশ্বিক আধিপত্যের প্রতীক। ফুটবলের প্রতিটি যুগ তার নিজস্ব ভাষায় বিজয়ের সংজ্ঞা লিখেছে, আর সেই ইতিহাসের দৃশ্যমান রূপ হয়ে উঠেছে এই দুই স্বর্ণমুকুট। তাই বিশ্বকাপের ট্রফির ইতিহাস কেবল একটি পুরস্কারের ইতিহাস নয়; এটি মানবস্বপ্ন, প্রতিযোগিতা, ঐক্য, শিল্প, সংস্কৃতি এবং বিশ্ব ফুটবলের অবিনাশী উত্তরাধিকারের ইতিহাস।
ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Share this news as a Photo Card