
অপু দাস, রাজশাহী: গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করার দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকরা। একই সঙ্গে গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে রাজশাহী মহানগরীর অলোকার মোড় এলাকায় চেম্বার অব কমার্সের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এসব দাবি উঠে আসে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার’র উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের তদন্ত যদি কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ অভিযোগের সঙ্গে কোন বাহিনী বা কারা জড়িত ছিল, তা তদন্তের আগেই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সে কারণে অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন কোনো বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব দিলে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একটি বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে অন্য বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। তাই গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তের পরিবর্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা ও পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হলে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। পাশাপাশি তদন্তের ফলাফলও অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে।
মানববন্ধনে অধিকার’র পক্ষ থেকে সংগঠনটির একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন গুম থেকে ফিরে আসা আল আমিন হোসেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাধারণ নাগরিকদের গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়।
এদিকে বর্তমানে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া জাতীয় সংসদে উত্থাপনের বিষয়টিও মানববন্ধনে আলোচনায় আসে। অধিকার’র বিবৃতিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত আইনে কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না। তবে সরকার অন্য কোনো বাহিনী কিংবা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে সেই তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে।
সংগঠনটির মতে, এ ধরনের ব্যবস্থাতেও তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে। কারণ একটি শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিবর্তে অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী কাঠামোর মাধ্যমে তদন্ত পরিচালিত হলেও সেখানে বাহিনীগত প্রভাবের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয় না। তাই গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন বেসামরিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি আইনে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়, প্রস্তাবিত আইনে কোনো অভিযোগ তদন্তের পর মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বক্তারা মনে করেন, এ ধরনের শাস্তির বিধান থাকলে গুমের শিকার ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করতে ভয় পেতে পারেন। এতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বক্তারা বলেন, গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেন। নিখোঁজ ব্যক্তির কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তাঁদের সামাজিক ও আর্থিক জীবনও নানা সমস্যার মুখে পড়ে। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মানববন্ধনে আরও দাবি জানানো হয়, যেসব ব্যক্তি গুম হওয়ার পর এখনও ফিরে আসেননি, তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানরা যাতে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন, সে জন্য কার্যকর বিধান করতে হবে। বিশেষ করে নিখোঁজ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের জন্য আইনি সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া গুমের পর ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়। বক্তারা বলেন, গুম থেকে ফিরে আসার পর কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা মামলা করা হয়ে থাকে, তাহলে তা দ্রুত প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে নির্যাতন, ভয়ভীতি, মিথ্যা সাক্ষ্য কিংবা জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে যেসব মামলা পরিচালিত হয়েছে এবং এসব মামলায় যেসব ব্যক্তিকে সাজা দেওয়া হয়েছে, সেসব মামলা ও সাজা পুনর্বিবেচনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনে অধিকার’র পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো— গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করতে হবে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
দ্বিতীয় দাবিতে বলা হয়, গুমের পর যেসব ব্যক্তি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে নিখোঁজ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন, সে জন্য উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয় দাবিতে গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নির্যাতন, মিথ্যা সাক্ষ্য অথবা জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে দায়ের হওয়া মামলা ও দেওয়া সাজা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন অধিকার’র রাজশাহী সমন্বয়ক ও রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি সাংবাদিক মঈন উদ্দিন। কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন শান্ত, দৈনিক নতুন প্রভাতের সম্পাদক ও কবি সোহেল মাহবুব, রাজশাহী রিপোর্টার্স ইউনিটির সহসভাপতি মাসুদ রানা রাব্বানী, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন, রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল ইসলাম, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক হুজাইফা, ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, মানবাধিকারকর্মী নুরুল আলমসহ রাজশাহী জেলা ও মহানগরীর শতাধিক সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী।
কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক এম শামিম আক্তার।
বক্তারা বলেন, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্তে ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং আইনগত অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তাঁরা আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের পরিবারের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে প্রয়োজনীয় তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। পাশাপাশি গুমের ঘটনায় প্রকৃত সত্য উদঘাটন, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে স্বাধীন তদন্ত কাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা গুমের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনগত সুরক্ষা এবং গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।

অপু দাস, রাজশাহী 



















