
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহীর এয়ারপোর্ট থানা এলাকায় দোয়ার মাহফিলে অংশ নেওয়ার কথা বলে এক মাদরাসা শিক্ষককে ডেকে নিয়ে একটি বাড়িতে আটকে রেখে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ এবং সেই ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, প্রথম দফায় টাকা আদায়ের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর দীর্ঘদিন পর আবারও তাঁকে ফোন করে অর্থ দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিচার ও জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী মাদরাসা শিক্ষক মো. গোলাম মোস্তফা (৫২)। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। গোলাম মোস্তফা রাজশাহীর পবা উপজেলার পুঠিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে গোলাম মোস্তফা বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১৮ ও ১৯ তারিখে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীসহ কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে ফোন করেন। ফোনে তাঁরা তাঁদের বাড়িতে দোয়ার মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে জানিয়ে সেখানে উপস্থিত থাকার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ হওয়ায় তিনি বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ করেননি।
পরদিন ১৯ জানুয়ারি রাতে আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি এয়ারপোর্ট থানা এলাকার নির্দিষ্ট একটি স্থানে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর এক নারী ও এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাঁকে তাঁদের সঙ্গে একটি দোতলা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন গোলাম মোস্তফা।
তাঁর অভিযোগ, বাড়িটির ভেতরে প্রবেশের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন ব্যক্তি অবস্থান করছিলেন। একপর্যায়ে ৪ থেকে ৫ জন ব্যক্তি তাঁকে জোর করে আটকে রাখেন এবং তাঁর পোশাক খুলে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। বিষয়টি তিনি বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো শুরু করা হয়।
গোলাম মোস্তফা সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, তাঁর কাছ থেকে দুই লাখ টাকা আদায়ের জন্য ওই ভিডিওকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। টাকা না দিলে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এতে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক সম্মান নষ্ট হবে—এমন ভয় দেখিয়ে তাঁকে চাপের মধ্যে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি কৌশলে তাঁর ছেলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। ফোনে তিনি তাঁর অবস্থার কথা পরিবারের সদস্যদের জানান। বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য অভিযুক্তরা জানতে পারলে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন ওই শিক্ষক।
পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি রাজশাহী মহানগর পুলিশের এয়ারপোর্ট থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগ করার পরও দীর্ঘ সময় ধরে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ঘটনার কয়েক মাস পরও বিষয়টি নিয়ে তিনি আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। এর মধ্যে গত ২ সেপ্টেম্বর আবারও ওই চক্রের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। এবার ফোনে নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, বিশেষ করে ‘ডিবি পুলিশ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাঁকে ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গোলাম মোস্তফা বলেন, ফোনে আগের ধারণ করা ভিডিওর বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁর কাছে আবারও টাকা চাওয়া হয়। চপল, শাহীন সাগর ও রাজিব নামে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে বিভিন্ন সময় ফোন করে দেখা করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। টাকা না দিলে ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ তাঁর।
তিনি আরও দাবি করেন, শেষ পর্যন্ত দাবিকৃত টাকা না দেওয়ায় তাঁর সঙ্গে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় তিনি সামাজিকভাবে বিব্রত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান।
গোলাম মোস্তফার ভাষ্য, পুরো ঘটনাটি তাঁর কাছে পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে হয়েছে। দোয়ার মাহফিলের মতো একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কথা বলে তাঁকে নির্দিষ্ট স্থানে ডেকে নেওয়া, এরপর একটি বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখা, ভিডিও ধারণ এবং সেই ভিডিও ব্যবহার করে অর্থ দাবি—সবকিছু একটি পরিকল্পিত চক্রের কর্মকাণ্ড বলে তিনি মনে করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, শুধু অর্থ আদায় নয়, তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যেও ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তাঁর দাবি, প্রকাশিত ভিডিও ও ঘটনার অন্যান্য তথ্য তদন্ত করলে এর পেছনে কারা রয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে, তা বেরিয়ে আসবে।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম মোস্তফা প্রশাসনের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ দাবির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই তাঁর প্রত্যাশা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কাউকে এ ধরনের কৌশলে ফাঁদে ফেলে হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইল করা না যায়, সে জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগে উল্লেখ করা বিষয়গুলো যাচাই করে দেখা হচ্ছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ওসি আরও জানান, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হলে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতারণা, জালিয়াতি ও ব্ল্যাকমেইলের মতো অভিযোগের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানান তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী 



















