ঢাকা, বাংলাদেশ || শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220

আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন দেখাতে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব মানচিত্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:   বিশ্ব মানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন সঠিকভাবে তুলে ধরতে প্রচলিত মানচিত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ বা ‘মানচিত্র সংশোধন’ প্রস্তাবটি ১৬৪ দেশের সমর্থনে পাস হয়েছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) সদস্য দেশগুলো প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ হিসেবে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

প্রস্তাবটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। তবে এর ফলে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ব্যবহৃত মানচিত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য জানা যায়।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত মানচিত্রগুলোর একটি হলো ‘মারকেটর প্রজেকশন’। ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর এই মানচিত্র তৈরি করেন। মূলত সমুদ্রপথে নৌযান পরিচালনা ও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নেভিগেশনের সুবিধার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল।

তবে পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে দ্বিমাত্রিক কাগজে তুলে ধরার কারণে মারকেটর মানচিত্রে বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তনে বড় ধরনের বিকৃতি দেখা যায়। বিশেষ করে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো তুলনামূলক ছোট এবং মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলো বড় দেখায়।

এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ড। প্রচলিত মারকেটর মানচিত্রে দুটিকে প্রায় কাছাকাছি আয়তনের মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ বড়।

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক বাস্তবতাকেই বিকৃত করে না, বরং আফ্রিকা ও বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোর উন্নয়ন-সম্ভাবনা, সম্পদ ও গুরুত্ব সম্পর্কেও মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এই বিকৃতি দূর করার লক্ষ্যেই ২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ ‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন’ তৈরি করেন। এটি বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশের প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৪ সদস্যরাষ্ট্র এই মানচিত্র গ্রহণ করে। তারা জানায়, বিশেষ করে আফ্রিকার আয়তনসহ সব মহাদেশের আকার এটি আরও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করে।

‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলো বলছে, আফ্রিকার আয়তন এতটাই বড় যে এর ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো এবং ইউরোপের একটি বড় অংশও জায়গা পেতে পারে; তারপরও কিছু জমি অবশিষ্ট থাকবে।

জাতিসংঘের ভোটের আগে টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘একটি ন্যায্য বিশ্ব শুরু হয় একটি ন্যায্য মানচিত্র দিয়ে।’

এর আগে জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, মানচিত্র কখনোই নিরপেক্ষ নয়। এটি মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও মহাদেশের অবস্থান কীভাবে বোঝা হবে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারোরও এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন। তিনি জানান, ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মারকেটর মানচিত্র ব্যবহার বন্ধ করবে। তার ভাষায়, মানচিত্র পরিবর্তন করলেই পৃথিবী বদলে যাবে না, তবে বাস্তবতাকে বিকৃত করে এমন একটি উপস্থাপনাকে সংশোধন করা সত্যকে স্বীকার করার একটি পদক্ষেপ।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছে। জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ না করে সাধারণ পরিষদ ষোড়শ শতাব্দীর একটি মানচিত্র এবং সেটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করছে।

আফ্রিকা বিষয়ক প্রচারণা সংগঠন ‘আফ্রিকা নো ফিল্টার’-এর লেরাতো মোগোয়াতলে বলেন, বিশ্ব মানচিত্রে আফ্রিকার ভুল উপস্থাপন শুধু মানচিত্র তৈরির ভুল নয়, এটি আফ্রিকা সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরির বিষয়ও। তার মতে, মহাদেশটির বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভুল তথ্য ও ধারণা দূর করার অংশ হিসেবেই মারকেটর মানচিত্র থেকে সরে আসা প্রয়োজন।

কেনিয়ার ভূগোলবিদ কিওকো মুয়েন্দোর মতে, মারকেটর মানচিত্র পরোক্ষভাবে আফ্রিকার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, জনসংখ্যা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে ছোট করে দেখিয়েছে। তার ভাষায়, মানচিত্র শুধু ভ্রমণ বা দিকনির্দেশনার উপকরণ নয়; এগুলো কোনো অঞ্চলকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কীভাবে দেখা হবে, সেই ধারণাও তৈরি করে।

ফলে জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত শুধু মানচিত্রের নকশা পরিবর্তনের উদ্যোগ নয়; আফ্রিকা সম্পর্কে বিশ্ববাসীর দীর্ঘদিনের ধারণা ও উপস্থাপনা বদলের একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

Share this news as a Photo Card

সম্পর্কিত খবর :
জনপ্রিয়
12 September 2026

১৫০-পিস ইয়াবাসহ মির্জাপুরে সাবেক ইউপি সদস্য আটক

বিস্তারিত পড়তে কমেন্টে লিংক ... |
nagorikbhabna.com

আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন দেখাতে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব মানচিত্র

সর্বশেষ পরিমার্জন : ০৫:৩৩:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:   বিশ্ব মানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন সঠিকভাবে তুলে ধরতে প্রচলিত মানচিত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ বা ‘মানচিত্র সংশোধন’ প্রস্তাবটি ১৬৪ দেশের সমর্থনে পাস হয়েছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) সদস্য দেশগুলো প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ হিসেবে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

প্রস্তাবটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। তবে এর ফলে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ব্যবহৃত মানচিত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য জানা যায়।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত মানচিত্রগুলোর একটি হলো ‘মারকেটর প্রজেকশন’। ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর এই মানচিত্র তৈরি করেন। মূলত সমুদ্রপথে নৌযান পরিচালনা ও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নেভিগেশনের সুবিধার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল।

তবে পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে দ্বিমাত্রিক কাগজে তুলে ধরার কারণে মারকেটর মানচিত্রে বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তনে বড় ধরনের বিকৃতি দেখা যায়। বিশেষ করে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো তুলনামূলক ছোট এবং মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলো বড় দেখায়।

এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ড। প্রচলিত মারকেটর মানচিত্রে দুটিকে প্রায় কাছাকাছি আয়তনের মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ বড়।

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক বাস্তবতাকেই বিকৃত করে না, বরং আফ্রিকা ও বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোর উন্নয়ন-সম্ভাবনা, সম্পদ ও গুরুত্ব সম্পর্কেও মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এই বিকৃতি দূর করার লক্ষ্যেই ২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ ‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন’ তৈরি করেন। এটি বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশের প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৪ সদস্যরাষ্ট্র এই মানচিত্র গ্রহণ করে। তারা জানায়, বিশেষ করে আফ্রিকার আয়তনসহ সব মহাদেশের আকার এটি আরও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করে।

‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলো বলছে, আফ্রিকার আয়তন এতটাই বড় যে এর ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো এবং ইউরোপের একটি বড় অংশও জায়গা পেতে পারে; তারপরও কিছু জমি অবশিষ্ট থাকবে।

জাতিসংঘের ভোটের আগে টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘একটি ন্যায্য বিশ্ব শুরু হয় একটি ন্যায্য মানচিত্র দিয়ে।’

এর আগে জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, মানচিত্র কখনোই নিরপেক্ষ নয়। এটি মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও মহাদেশের অবস্থান কীভাবে বোঝা হবে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারোরও এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন। তিনি জানান, ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মারকেটর মানচিত্র ব্যবহার বন্ধ করবে। তার ভাষায়, মানচিত্র পরিবর্তন করলেই পৃথিবী বদলে যাবে না, তবে বাস্তবতাকে বিকৃত করে এমন একটি উপস্থাপনাকে সংশোধন করা সত্যকে স্বীকার করার একটি পদক্ষেপ।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছে। জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ না করে সাধারণ পরিষদ ষোড়শ শতাব্দীর একটি মানচিত্র এবং সেটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করছে।

আফ্রিকা বিষয়ক প্রচারণা সংগঠন ‘আফ্রিকা নো ফিল্টার’-এর লেরাতো মোগোয়াতলে বলেন, বিশ্ব মানচিত্রে আফ্রিকার ভুল উপস্থাপন শুধু মানচিত্র তৈরির ভুল নয়, এটি আফ্রিকা সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরির বিষয়ও। তার মতে, মহাদেশটির বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভুল তথ্য ও ধারণা দূর করার অংশ হিসেবেই মারকেটর মানচিত্র থেকে সরে আসা প্রয়োজন।

কেনিয়ার ভূগোলবিদ কিওকো মুয়েন্দোর মতে, মারকেটর মানচিত্র পরোক্ষভাবে আফ্রিকার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, জনসংখ্যা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে ছোট করে দেখিয়েছে। তার ভাষায়, মানচিত্র শুধু ভ্রমণ বা দিকনির্দেশনার উপকরণ নয়; এগুলো কোনো অঞ্চলকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কীভাবে দেখা হবে, সেই ধারণাও তৈরি করে।

ফলে জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত শুধু মানচিত্রের নকশা পরিবর্তনের উদ্যোগ নয়; আফ্রিকা সম্পর্কে বিশ্ববাসীর দীর্ঘদিনের ধারণা ও উপস্থাপনা বদলের একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

Share this news as a Photo Card