ঢাকা, বাংলাদেশ , রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220

নেপালের পঙ্গু দম্পতির অবিশ্বাস্য মানবিক গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:   নেপালের ডাবিলে পাহাড়ের ঢালে একলা দাঁড়িয়ে থাকা ঢেউটিনের ছোট্ট ঘরটি। চারপাশে আর কোনো বাড়ি নেই। নিচে তাকালেই চোখ পড়ে ভোঁটেকোশী নদীর ধ্বংসলীলায়- ডুবে যাওয়া পাকা বাড়ি, থমকে যাওয়া সময়। অথচ এই ঘরটিই এখন এক আশ্রয়স্থল।

গত ১৬ অগাস্ট ভোঁটেকোশীর ভয়াবহ বন্যায় যখন সবকিছু ভেসে গেল, তখন এই বাড়িটাই হয়ে উঠল উদ্ধারকাজের কেন্দ্রবিন্দু। সেই প্রথম রাতে ৩১ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এখানে রাত কাটান। তারপর প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জন মানুষ আসছেন- নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে, অথবা শুধু একটু বিশ্রামের জন্য। এ পর্যন্ত দুই শতাধিক মানুষ এই বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছেন।

বাড়ির মালিক প্রেমবাহাদুর তামাং ও তার স্ত্রী মাইয়া- দুজনই প্রতিবন্ধী। প্রেমবাহাদুরের মেরুদণ্ডে আঘাত, লাঠি ছাড়া তিনি হাঁটতে পারেন না। মাইয়ার বাঁ পা নড়ে না। অথচ শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তাদের থামাতে পারেনি। যিনি আসেন, তাকে ফিরিয়ে দেন না তারা।

ক্ষুধার্ত কাউকে খালি হাতে ফেরানো হয় না। অথচ তাদের সংসার চলে মাসে প্রেমবাহাদুরের বার্ধক্যভাতা ৩ হাজার রুপি ও মাইয়ার ২ হাজার রুপিতে। সন্তানেরা সময়ে-অসময়ে কিছু পাঠায়। পাহাড়ি জমিতে যা চাষ হয়, তা সারা বছর ধরে না; বানরের দল এসে ফসল নষ্ট করে দেয়।

বন্যার দিন প্রেমবাহাদুর ঘরের বারান্দায় বসেছিলেন। ভোঁটেকোশী যখন গর্জে উঠল, তিনি লাঠি ভর করে নদীর দিকে এগোলেন। চোখের সামনে সব ভেসে যাচ্ছে দেখে তিনি মাইয়াকে ডাকলেন। বললেন, ‘দেখো, বন্যা সব ধ্বংস করে দিচ্ছে।’

মানুষ ভেসে যাচ্ছে, বাড়ি চাপা পড়ছে- আর তারা শুধু দেখেছেন। সাহায্য করতে তাদের শারীরিক সক্ষমতা ছিল না। প্রেমবাহাদুর বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে বেত্রাবতী বাজার নদীতে পরিণত হলো। স্কুল ডুবে গেল, স্কুলবাস চাপা পড়ে গেল।’

চার প্রজন্ম ধরে এই এলাকায় থাকা প্রেমবাহাদুরের চোখে এত বড় বিপর্যয় আগে কখনো দেখেননি তিনি। তিনি বলেন, ‘ওটা বন্যার মতোও লাগছিল না। মনে হচ্ছিল যেন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছে।’

মাইয়া বলেন, ‘আমরা যা পারি, তাই করছি।’ তাদের চাল-ডাল ফুরিয়ে আসছে। তবু রোজ নতুন মুখ আসছে। কেউ নিজে রান্না করে খায়, কেউ মাইয়ার হাতে তৈরি খাবার খায়। ‘অন্য সময় কেউ এই বাড়ি খুঁজতে আসবে না। কিন্তু বিপদের সময় তো সবাইকে পাশে দাঁড়াতে হয়,’ বলছিলেন মাইয়া।

ভোঁটেকোশী তাদের ছোট ছেলের অটোরিকশাও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কাজের রাস্তাও মুছে দিয়েছে। ছেলে বুদ্ধ এখন বেকার। তার দুই সন্তান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কী করব এখন? বাবা-মা দুজনই প্রতিবন্ধী। কোনো কাজ পেলে রাজি আছি।’

রাষ্ট্রীয় ত্রাণ এখনো যথেষ্ট পৌঁছায়নি। নদীতে ভাসমান লাশ পচে যাচ্ছে। ঘরের ভেতর আটকে পড়া মানুষের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। কিন্তু ধ্বংসের মাঝেও দাঁড়িয়ে আছে তামাং দম্পতির এই ঘরটি- এখনও অটুট, এখনও আশ্রয় দিয়ে চলেছে।

প্রেমবাহাদুর বলেন, ‘আমরা সুস্থ না, কিন্তু যারা কষ্ট পেয়েছে, তাদের সাহায্য না করে পারি না।’

সূত্র: কাঠমুণ্ডু পোস্ট

Share this news as a Photo Card

সম্পর্কিত খবর :
জনপ্রিয়

রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়কে নিষিদ্ধ হচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা

৫০/এফ, ইনার সার্কুলার ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০ | ফোন: ০৯৬৪৯২৩০২২০, ০১৯১৫৭০৮১৮৭, ই-মেইল: info.nagorikvabna@gmail.com

30 August 2026

গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয় ৩ কারণে

বিস্তারিত পড়তে কমেন্টে লিংক ... |
nagorikbhabna.com

নেপালের পঙ্গু দম্পতির অবিশ্বাস্য মানবিক গল্প

সর্বশেষ পরিমার্জন : ০৫:৩১:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:   নেপালের ডাবিলে পাহাড়ের ঢালে একলা দাঁড়িয়ে থাকা ঢেউটিনের ছোট্ট ঘরটি। চারপাশে আর কোনো বাড়ি নেই। নিচে তাকালেই চোখ পড়ে ভোঁটেকোশী নদীর ধ্বংসলীলায়- ডুবে যাওয়া পাকা বাড়ি, থমকে যাওয়া সময়। অথচ এই ঘরটিই এখন এক আশ্রয়স্থল।

গত ১৬ অগাস্ট ভোঁটেকোশীর ভয়াবহ বন্যায় যখন সবকিছু ভেসে গেল, তখন এই বাড়িটাই হয়ে উঠল উদ্ধারকাজের কেন্দ্রবিন্দু। সেই প্রথম রাতে ৩১ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এখানে রাত কাটান। তারপর প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জন মানুষ আসছেন- নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে, অথবা শুধু একটু বিশ্রামের জন্য। এ পর্যন্ত দুই শতাধিক মানুষ এই বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছেন।

বাড়ির মালিক প্রেমবাহাদুর তামাং ও তার স্ত্রী মাইয়া- দুজনই প্রতিবন্ধী। প্রেমবাহাদুরের মেরুদণ্ডে আঘাত, লাঠি ছাড়া তিনি হাঁটতে পারেন না। মাইয়ার বাঁ পা নড়ে না। অথচ শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তাদের থামাতে পারেনি। যিনি আসেন, তাকে ফিরিয়ে দেন না তারা।

ক্ষুধার্ত কাউকে খালি হাতে ফেরানো হয় না। অথচ তাদের সংসার চলে মাসে প্রেমবাহাদুরের বার্ধক্যভাতা ৩ হাজার রুপি ও মাইয়ার ২ হাজার রুপিতে। সন্তানেরা সময়ে-অসময়ে কিছু পাঠায়। পাহাড়ি জমিতে যা চাষ হয়, তা সারা বছর ধরে না; বানরের দল এসে ফসল নষ্ট করে দেয়।

বন্যার দিন প্রেমবাহাদুর ঘরের বারান্দায় বসেছিলেন। ভোঁটেকোশী যখন গর্জে উঠল, তিনি লাঠি ভর করে নদীর দিকে এগোলেন। চোখের সামনে সব ভেসে যাচ্ছে দেখে তিনি মাইয়াকে ডাকলেন। বললেন, ‘দেখো, বন্যা সব ধ্বংস করে দিচ্ছে।’

মানুষ ভেসে যাচ্ছে, বাড়ি চাপা পড়ছে- আর তারা শুধু দেখেছেন। সাহায্য করতে তাদের শারীরিক সক্ষমতা ছিল না। প্রেমবাহাদুর বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে বেত্রাবতী বাজার নদীতে পরিণত হলো। স্কুল ডুবে গেল, স্কুলবাস চাপা পড়ে গেল।’

চার প্রজন্ম ধরে এই এলাকায় থাকা প্রেমবাহাদুরের চোখে এত বড় বিপর্যয় আগে কখনো দেখেননি তিনি। তিনি বলেন, ‘ওটা বন্যার মতোও লাগছিল না। মনে হচ্ছিল যেন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছে।’

মাইয়া বলেন, ‘আমরা যা পারি, তাই করছি।’ তাদের চাল-ডাল ফুরিয়ে আসছে। তবু রোজ নতুন মুখ আসছে। কেউ নিজে রান্না করে খায়, কেউ মাইয়ার হাতে তৈরি খাবার খায়। ‘অন্য সময় কেউ এই বাড়ি খুঁজতে আসবে না। কিন্তু বিপদের সময় তো সবাইকে পাশে দাঁড়াতে হয়,’ বলছিলেন মাইয়া।

ভোঁটেকোশী তাদের ছোট ছেলের অটোরিকশাও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কাজের রাস্তাও মুছে দিয়েছে। ছেলে বুদ্ধ এখন বেকার। তার দুই সন্তান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কী করব এখন? বাবা-মা দুজনই প্রতিবন্ধী। কোনো কাজ পেলে রাজি আছি।’

রাষ্ট্রীয় ত্রাণ এখনো যথেষ্ট পৌঁছায়নি। নদীতে ভাসমান লাশ পচে যাচ্ছে। ঘরের ভেতর আটকে পড়া মানুষের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। কিন্তু ধ্বংসের মাঝেও দাঁড়িয়ে আছে তামাং দম্পতির এই ঘরটি- এখনও অটুট, এখনও আশ্রয় দিয়ে চলেছে।

প্রেমবাহাদুর বলেন, ‘আমরা সুস্থ না, কিন্তু যারা কষ্ট পেয়েছে, তাদের সাহায্য না করে পারি না।’

সূত্র: কাঠমুণ্ডু পোস্ট

Share this news as a Photo Card